kalerkantho


পাবলিক পার্লামেন্ট ও তারুণ্যের ভবিষ্যৎ চিন্তা

হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পাবলিক পার্লামেন্ট ও তারুণ্যের ভবিষ্যৎ চিন্তা

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি ও এটিএন বাংলার যৌথ আয়োজনে আমরা শুরু করেছিলাম বিতর্ক প্রতিযোগিতার আরেক বৃহৎ আয়োজন ‘ইউসিবি পাবলিক পার্লামেন্ট’। আমাদের এই আয়োজনে দেশের ৩২টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকদল অংশগ্রহণ করে। বছরব্যাপী বিভিন্ন রাউন্ড পেরিয়ে অবশেষে ফাইনালে উঠে আসে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি। ১৩ জানুয়ারি শীতমগ্ন সকালে এ দুটি দল একে অপরের মুখোমুখি হয়। বিতর্কের নির্ধারিত বিষয় ছিল, ‘নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা বেড়েছে’। সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেই সময়োপযোগী এই বিষয়কে গ্র্যান্ড ফাইনালে টপিক হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে আসেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি। আমার সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় বিশেষ অতিথি হিসেবে  উপস্থিত থাকেন এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান ও ইউসিবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ সবুর।

গ্র্যান্ড ফাইনালের ছায়া সংসদে দুই পক্ষ অর্থাৎ সরকারি ও বিরোধী দলের বিতার্কিকই যেন জানপ্রাণ বাজি রেখে লড়াই শুরু করেন। ছায়া সংসদের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, মন্ত্রী, এমপি বিষয়ের পক্ষে-বিপক্ষে সরব হয়ে ওঠেন। যুক্তি, তথ্য, তত্ত্ব আর বাস্তব উদাহরণগুলো টেনে দুই পক্ষই  বোঝাতে চেষ্টা করে কেন তারা পক্ষে ও বিপক্ষে সমর্থন চায়। কেন তারা জোরালো সরব কণ্ঠে বলছে, বিষয়টি যেন কোনোভাবেই সংসদে গৃহীত না হয়। পক্ষের বক্তারা বলেন, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে তাদের সার্বিক কর্মকাণ্ডের প্রতি জনগণের আস্থা ক্রমেই বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশন গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম হবে। কিন্তু বিরোধী বা বিপক্ষের বক্তারাও কম নন। তাঁরাও সার্বিক অবস্থার বিভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করে বলেন, যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন এগোচ্ছে, তাতে আগামী জাতীয় নির্বাচন কোনোভাবেই সঠিক হবে না। নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করছে। সবার আগে তাই সহায়ক বা নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন। নইলে কোনোভাবেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব নয়। বিরোধীপক্ষ আরো জোরালো প্রশ্ন তুলে বলে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে সবার ভোট নিরাপত্তার সঙ্গে প্রয়োগের জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন, তা না পাওয়ার সেই শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেয়ে মানুষের আস্থা তৈরি করাটাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আমি বলব, আমাদের এই আয়োজনের প্রতিটি পর্বেই বিতার্কিকরা মন খুলে কথা বলতে পেরেছেন। বিতার্কিকরা দেশ, জনগণ, গণতন্ত্র, প্রশাসন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করেছেন।

এটা তো সত্য,  নির্বাচনে যারা জয়লাভ করে তাদের মধ্যে সব কিছুই নিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই প্রবণতায় বিজয়ীরা ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ সব কিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। অন্যদিকে পরাজিতরা হয়রানি ও জেল-জুলুমের শিকার হয়। এককথায়, উইনার টেকস অল। এ কারণে নির্বাচনে কেউ পরাজিত হতে চায় না। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। জাতীয় নির্বাচনকে নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে। এখনো দুই দলের মধ্যে কোনো আন্তরিক আলাপ ও সংলাপ হয়নি। এই অবস্থান থেকে দেশের মানুষ আসলেই পরিত্রাণ চায়। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যত দ্রুত সম্ভব প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনা হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। তা না হলে সংঘাত-সংঘর্ষ ও অস্থিতিশীলতার দায় রাজনৈতিক দলগুলোকেই বহন করতে হবে। গ্র্যান্ড ফাইনালে এ আলোচনাগুলোও উঠে এসেছিল।  

সত্যি গ্র্যান্ড ফাইনালে দুই পক্ষের লড়াই যেন শীতের তীব্রতা ভেঙে এফডিসির পুরো হলরুমে অন্য রকম এক উত্তাপ ছড়িয়ে দেয়। প্রতিধ্বনিত হয় অনেক সত্য আর স্বপ্নের কথা। অবশেষে এক অন্য রকম লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন ও বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি রানার-আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। দুই দলের বক্তব্যই ধীরস্থির চিত্তে শোনার পর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তোফায়েল আহমেদ এমপি বিতার্কিকদের প্রশংসা করে বলেন, এত প্রাণবন্ত লড়াই তাঁকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে। তরুণদের উপস্থাপন, যুক্তিতর্ককে তিনি সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, পার্লামেন্টে এ রকম তরুণদের আগমন প্রয়োজন।

গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেছিলেন  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আকবর আলি খান। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ থেকে এ বছরের ১৩ জানুয়ারি, এই এক বছর সময়কালে নির্ধারিত সময়ে প্রতিটি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেগুলো ধারাবাহিকভাবে এটিএন বাংলায় প্রচারিত হয়েছে। প্রতিটি পর্বেই বিতর্কের বিষয়গুলো ছিল সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ। বিতর্কের বিষয়গুলো নির্বাচনে বরাবরই রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তাসহ জনগুরুত্বপূর্ণ যেসব খাত রয়েছে সেগুলোকেই বিতর্কের আলোচনায় আনা হয়েছে। আমরা বরাবরই চেয়েছি যে এসব বিষয় নিয়ে সংসদীয় স্টাইলে আলোচনা হোক। আমি বলব, হয়েছেও তাই। যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে বিতার্কিকরা পেছনে তাকাননি। সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে সব সময় নিজেদের যুক্তিকে তুলে ধরেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। আমি বলব, সমসাময়িক সময়ে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো বিতর্কের আয়োজন কেউ করেনি। আর এ কারণেই যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব-বিশ্লেষক বিভিন্ন পর্বে আলোচক বা অতিথি হয়ে এসেছেন, তাঁরা মুগ্ধ না হয়ে পারেননি। সংসদীয় ধারার বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন এবারই প্রথম নয়, ২০ বছর ধরে আমরা এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছি। আমাদের সেসব অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময় অতিথি হিসেবে এসেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান, সাবেক স্পিকার (বর্তমানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি) অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, স্যার ফজলে হাসান আবেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম, রাশেদা কে চৌধুরী, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতা যেমন ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, ড. আব্দুল মঈন খান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ অনেকেই বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিভিন্ন আয়োজনে অতিথি হয়েছেন। তরুণ বিতার্কিকদের সঙ্গে জাতীয় ব্যক্তিত্ব ও নেতাদের চিন্তার যে মেলবন্ধন আমরা তৈরি করেছি, সেটা আমাদের আত্মশক্তিকে আরো বলীয়ান করেছে।

পাবলিক পার্লামেন্ট তথা সংসদীয় ধারার বিতর্ক হচ্ছে সমাজের আয়না, যেখানে তরুণরাই ন্যায়-ন্যায্যতার সঠিক নিক্তিতে বিচার করে কোনটা সঠিক আর কোনটা সঠিক নয়। তরুণরাই ছায়া সংসদে দাঁড়িয়ে সত্যকে উন্মোচন করে মিথ্যাকে যুক্তির নিচে চাপা দিয়ে ফেলে। তরুণরাই স্বপ্নের কথা বলে, নতুন করে স্বপ্ন দেখায়। এ কারণেই সংসদীয় ধারার এই বিতর্ক ঢের জনপ্রিয়তা অর্জন করে চলেছে।  

আমাদের বাঁধা ছকে গড়ে ওঠা তরুণদের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বিষয়ে আরো অনুসন্ধিত্সু, আরো কৌতূহলী করে গড়ে তুলতে হলে বিতর্ক চর্চার বিকল্প নেই। বিতর্কই পারে এ দেশের তরুণদের চিন্তার দুয়ার আরো উন্মুক্ত ও অবারিত করতে। নিঃসন্দেহে তরুণরাই এ দেশের সম্পদ। এরাই বদলে দেবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। এই তরুণদের এগিয়ে নিতে আমাদের সবাইকে যত্নবান হতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, এই তরুণদের প্রতি সহায়তা যত বাড়ানো হবে ততই তারা আরো বেশি সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত হবে। পাবলিক পার্লামেন্ট আয়োজন আলোকিত তরুণ গড়ার এক নিরলস প্রচেষ্টা, যেখানে তারুণ্য ভবিষ্যতের কথা বলে। বলে সৃষ্টি ও নির্মাণের কথা।

 

লেখক : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

kirondebate@gmail.com



মন্তব্য