kalerkantho


সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সুষ্ঠু রাজনীতি প্রয়োজন

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সুষ্ঠু রাজনীতি প্রয়োজন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো প্রায় এক বছর বাকি। তা সত্ত্বেও নির্বাচন-সংক্রান্ত খবরাখবর ও কথাবার্তা মিডিয়াসহ সর্বত্রই প্রাধান্য পাচ্ছে। কোনো কোনো পত্রিকা আবার সংসদীয় আসনভিত্তিক সম্ভাব্য প্রার্থীদের ছবিসহ কার কেমন অবস্থা তারও বর্ণনা ছাপাচ্ছে। তাই নির্বাচনী আমেজ পুরোপুরি শুরু না হলেও রাজনীতি এখন নির্বাচনমুখী, সে কথা বলা যায়। সবাই মনে করছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহতের নামে জ্বালাও-পোড়াও, মানুষ হত্যা ও ভাঙচুর করে বিএনপি যে ভুল করেছে, তা বোধ হয় আর করবে না। সম্প্রতি ছাত্রদলের সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেছেন, সরকার চেষ্টা করলেও বিএনপিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের বাইরে রাখতে পারবে না। তাতে বোঝা গেল বিএনপির পক্ষ থেকে এখন নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়ক সরকারের দাবিদাওয়া সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে, সেটি শুধুই সরকারকে চাপে রাখার কৌশল। এই চাপের মুখে সরকার কতটুকু কী করবে সেটি এক কথা, আর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিকল্প যে বিএনপির নেই, সেটি আবার অন্য কথা। আজকে ২০১৮ সালে এসে রাজনীতিতে বিএনপি যতটা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে এবং সব কিছু মিলিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, এ রকম লেজেগোবরে অবস্থা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে তাদের ছিল না। এতে বোঝা যায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক ঘোষণা শুনে বোঝা যায়, বিএনপি উপলব্ধি করেছে কত বড় ভুল সেদিন তারা করেছে। এই ভুলের দায় আগামী বহুদিন ধরে মরা লাশের মতো বিএনপিকে বহন করতে হবে। এর ওজন এত ভারী, যার চাপে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানো তাদের জন্য কষ্টকর হবে। রাজনীতি আর কূটনীতিতে বড় শত্রুর সঙ্গেও প্রকাশ্যে অসৌজন্যমূলক আচরণ পরাজয় ডেকে আনে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোন ও অপর প্রান্ত থেকে খালেদা জিয়ার সৌজন্যবোধ যারা দেখেছে তারা নিশ্চয়ই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়েছে। এ ধরনের আচরণ সুষ্ঠু রাজনীতির জন্য সহায়ক নয়। আর রাজনীতি সুষ্ঠু না হলে নির্বাচন কখনো সুষ্ঠু হবে না। পারস্পরিক সম্মানবোধ এবং বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা শূন্য হলে সুষ্ঠু রাজনীতি প্রত্যাশা করা যায় না। জাতির পিতার স্বঘোষিত খুনিদের বিচার বন্ধ করে দেওয়া হলো আইন করে।

খুনিদের সম্মানিত করা হলো দূতাবাসে মর্যাদাপূর্ণ চাকরি দিয়ে। এর সঙ্গে ১৯৭৫ সালে কারগারের অভ্যন্তরে জাতীয় নেতাদের হত্যা ও সর্বশেষ ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে যা ঘটেছে সেখান থেকে জাতি ও রাষ্ট্র যদি বের হতে না পারে, তাহলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আসবে কিভাবে। জাতির পিতা এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মতো অবিস্মরণীয় জাতীয় দলিলের প্রতি বড় রাজনৈতিক পক্ষের যদি আনুগত্য ও সম্মান না থাকে, তাহলে আমরা সুষ্ঠু রাজনীতি প্রত্যাশা করি কিভাবে। এ রকম আরো অনেক মৌলিক ও ভাইটাল প্রশ্ন আছে, যার যথার্থ উত্তর রাজনৈতিক দল ও জনমানুষকে খুঁজতে হবে। এসবের প্রতিকার করতে পারলেই শুধু সুষ্ঠু রাজনীতি প্রত্যাশা করা যেতে পারে, অন্যথায় নয়। তাই ১৯৭৫ সালের পরে যে রাজনীতি উল্লিখিত ঘটনাবলির জন্ম দিয়েছে এবং ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামের উজ্জ্বল ইতিহাস ও চেতনা উদ্রেককারী ঘটনাবলিকে যে রাজনীতি আড়াল করেছে তার থেকে বের হতে না পারলে রাজনীতিকে সুষ্ঠু পথে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। সুষ্ঠু রাজনীতির জন্য এগুলো একেবারে মৌলিক ও শিকড়ের প্রশ্ন। এই শিকড়ের জায়গায় সব ঠিক হয়ে গেলে বাকি যা আছে তা এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। শিকড়ের যত্ন না নিয়ে ডাল-পাতা নিয়ে নাড়াচাড়া করলে কাজ যে হয় না, তা তো আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি। এই উপলব্ধি বিএনপির মধ্যে না থাকার কারণেই তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালে বিএনপি ভার্সেস আওয়ামী লীগের সমীকরণে যার যে রকম অবস্থান ছিল তার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ না করেই বলা যায় ২০১৮ সালে এসে বিএনপি অনেক অনেক বেশি দুর্বল দলে পরিণত হয়েছে। সে সময়ে নির্বাচনে যোগ না দেওয়া ভুল ছিল, এই উপলব্ধির সঙ্গে আরো দুটি বিষয় বিএনপিকে উপলব্ধি করতে হবে। এক. নির্বাচন প্রতিহত করার নামে সেদিন বিএনপি ও জামায়াত মিলে নির্বাচন কর্মকর্তাসহ প্রায় দেড় শ নিরীহ মানুষকে হত্যা এবং পাঁচ শর বেশি নির্বাচনী কেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বিএনপির জন্য আত্মঘাতী হয়েছে। দুই. ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু করে প্রায় তিন মাস তথাকথিত অবরোধ কর্মসূচির নামে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডার বাহিনী ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দেশব্যাপী জ্বালাও-পোড়াও এবং তাতে দগ্ধ হয়ে গর্ভবতী নারী-শিশুসহ কয়েক শ নিরীহ মানুষের মৃত্যু বিএনপিকে কিছু দেয়নি, বরং দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কানাডার একটি আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের দলের একজনকে কানাডায় আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেছেন।

বিএনপির উল্লিখিত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় তারা সময়োপযোগী রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হয়ে তারা জঙ্গিবাদী ক্যাডার আশ্রিত জামায়াতের কবলে পড়ে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। উপরন্তু ২০১৪ সালে বিএনপির নির্বাচনে যোগ না দেওয়া সঠিক, নাকি ভুল ছিল, সে বিতর্ক না করেই বলা যায় তারা যদি নির্বাচন প্রতিহতের নামে জ্বালাও-পোড়াও এবং নিরীহ মানুষকে হত্যার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে না যেত, তাহলে আজকে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারত। কথায় আছে, সব মন্দের মধ্যেও কিছু না কিছু ভালো থাকে। বিএনপির ওই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যাঁরা প্রাণ দিলেন, তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানিয়ে, সহানুভূতি প্রকাশ করেই বলতে চাই তাঁদের জীবনের বিনিময়ে জ্বালাও-পোড়াও ও হরতালের রাজনীতি থেকে হয়তো চিরদিনের জন্য বাংলাদেশ মুক্ত হয়ে গেল। দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষ আর যোগ দেবে না। হরতাল-অবরোধের রাজনীতিতে মানুষের আগ্রহ নেই। খেটে খাওয়া মানুষের কাছে নিজেদের কাজকর্ম ও রুজি-রোজগার অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য তারা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ চায়।

গত কয়েক বছরে মানুষ বুঝতে পেরেছে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ কিভাবে দেশের ও মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্যকে পরিবর্তন করে দিতে পারে। সুতরাং নেই কাজ তো খই ভাজ—এ রকম মানুষ এখন আর পাওয়া যায় না। প্রত্যেকেই এখন নিজের কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। কিছু ভাড়া করা টোকাই আর সন্ত্রাসী জোগাড় করে রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর করে লাভ হবে না। ডিজিটাল যুগে অ্যানালগ চিন্তা-চেতনা দিয়ে কাজ হবে না। সংঘাত-সংঘর্ষের পথ বাদ দিয়ে আগামী দিনে রাজনীতি যদি বুদ্ধিভিত্তিক কৌশলী কর্মকাণ্ডে ফিরে আসে, তাহলে সেটা হবে রাজনীতির প্রাথমিক শুদ্ধিকরণ। টাকা ও ধর্মের অপব্যবহার রাজনীতি থেকে বিদায় হলে আমরা আরো এক ধাপ এগিয়ে যাব। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আমাদের উগ্র সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার থেকে মুক্ত হতে না পারলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো করুণ ভাগ্য বরণ করতে হবে বাংলাদেশকে। মনে রাখা দরকার, সময় গেলে সাধন সিদ্ধ হয় না। তাই ২০১৮ যেহেতু নির্বাচনের বছর, জনগণ যদি সচেতন হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি বাংলাদেশের জন্মলগ্নের প্রধান মৌলিক আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তার ওপর মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে রাজনীতি সুষ্ঠুকরণের পথে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে। তাই আগামী একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনটি সুষ্ঠু হওয়ার প্রয়োজনে নিম্নে বর্ণিত দু-তিনটি বিষয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে।

এক. নির্বাচন কমিশনের শক্তি, ক্ষমতা, মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য সব রকমের সহযোগিতা দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে নেতিবাচক ও অসম্মানজনক বক্তব্য প্রদান থেকে সব দলকে বিরত থাকতে হবে। দুই. সংবিধান ও আইন—এ দুটি হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের রক্ষাকবচ। সংবিধান ও আইন যে এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে, তার বাইরে তাদের টেনে আনার চেষ্টা সব কিছুকে ভণ্ডুল করে দেবে। তিন. নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার বন্ধ এবং ভোট বাণিজ্য ও গুণ্ডা-সন্ত্রাসীদের কবল থেকে নির্বাচনকে মুক্ত রাখার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য মনিটরিং ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনের থাকতে হবে। চার. প্রার্থী মনোনয়নে দলগুলো স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক হলে সমস্যা কমে যায়। ত্যাগী, পরীক্ষিত, সৎ ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলে অন্তর্দ্বন্দ্ব কমবে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্যও সেটি সহায়ক হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ভুঁইফোড় টাকাওয়ালাদের দৌরাত্ম্য ঠেকিয়ে রাখা দরকার। তবে রাজনীতি এখন আর স্বেচ্ছায় জনসেবা প্রদানের জায়গায় নেই, পরিণত হয়েছে টাকা বানানোর মেশিনে। সুতরাং ধর্মের কাহিনি ও কথা কেউ শুনতে চায় না। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক নিকোলা ম্যাকিয়াভেলি যথার্থই বলেছেন, ‘বাধ্য করা হলেই শুধু মানুষ সঠিক কাজটি করে। কারণ Men are generally ungrateful, vacillating, deceitful, cowardly and greedy.

ম্যাকিয়াভেলির কথার সূত্র ধরে বলা যায়, আমাদের রাজনীতি যেহেতু সুষ্ঠু জায়গায় নেই, তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে তার সাংবিধানিক ও আইনি ক্ষমতা প্রয়োগে কঠোর থেকে কঠোরতর হতে হবে।

 

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com



মন্তব্য