kalerkantho


উপকূলের পরিবর্তিত পরিবেশ

বিধান চন্দ্র দাস

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উপকূলের পরিবর্তিত পরিবেশ

ষাটের দশকের প্রথম দিকের কথা। আমি তখন সাতক্ষীরা মহকুমার প্রত্যন্ত এলাকায় প্রবল জোয়ার-ভাটা প্রবাহিত ইছামতী নদীর ধারের বাসিন্দা। গেওয়া, কেওড়া প্রভৃতি গাছের ঘন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা ইছামতীর জলে অবগাহন করে আমার দুরন্ত কৈশোর। শুশুক, ভেটকি, তপসেসহ হাজারো মাছ ও জলচর প্রাণীর প্রাচুর্য তখন চোখে পড়ত সেই ইছামতী ও তার শাখা নদীগুলোয়। শেষ গোধূলির আবছা আলোয় নানা রকম ছোট-বড় পাখি ঝাঁক বেঁধে ফিরে এসে বসত নদীর ধারের সেই গাছগুলোয়। সূর্যোদয়ের আগেই আবার তারা উড়ে যেত খাবারের সন্ধানে। কিছু বক ও বাটাংকে নদীর চরেই চরতে দেখা যেত। মাছরাঙারা থাকত নদীর ধারের গাছের ডালে। কিন্তু আজ সেসব শুধুই স্মৃতি। একদা প্রমত্তা সেই নদী এখন মৃতপ্রায়। ম্যানগ্রোভ গাছের সেই বন আজ অদৃশ্য। ইছামতীর ধার ঘেঁষে ষাটের দশকে প্রথম নির্মিত বেড়িবাঁধ দিয়ে এই পরিবর্তন শুরু। আর আশির দশকে বিপুলভাবে শুরু হওয়া চিংড়ি চাষের মাধ্যমে সেই পরিবর্তন এখন প্রকটরূপ ধারণ করেছে। বৃক্ষশূন্য ও বৈচিত্র্যময় প্রাণীর অনুপস্থিতিতে এখন সেই এলাকা বিরান এক জলাকাশ বলেই মনে হয়। লবণ আর জলদৈত্যের (জলাবদ্ধতার) আক্রমণে এখন সেখানে তৈরি হয়েছে মানববৈরী বাস্তুতন্ত্র।

যে ক্রুগ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ষাটের দশকে উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা মোকাবেলার জন্য নদী বরাবর বেড়িবাঁধ, অর্থাৎ পোল্ডার তৈরির কাজ শুরু হয়, সেই সুপারিশের মধ্যে সতর্কবার্তাও ছিল। কমিশনপ্রধান জুলিয়ার্স আলবার্ট ক্রুগ নিজে ছিলেন অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে। কমিশনের সুপারিশে বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে সাবধানে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শও ছিল। ১৯৫৯ সালে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। সেই কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। মূলত নেদারল্যান্ডসে সৃষ্ট পোল্ডারের অনুকরণে এই সুপারিশ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু নেদারল্যান্ডস এবং বঙ্গীয় বদ্বীপের চরিত্র ভিন্ন হওয়ায় পোল্ডার সৃষ্টির ব্যাপারে কারিগরি বিষয়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন ছিল। তা ছাড়া নেদারল্যান্ডস কয়েক শ বছর ধরে উত্তর সাগরের চরিত্রানুযায়ী একটার পর একটা পোল্ডার তৈরি করেছে। কাজেই এসব সতর্কবার্তা বিবেচনায় নিয়ে সেই মোতাবেক বাঁধ নির্মাণ করাই ছিল সমীচীন। বিশেষ করে একটি পোল্ডারের মধ্যে বড় বড় শাখা নদী বা খালগুলোর মুখে সংকীর্ণ স্লুইস গেট না বসিয়ে সেসব জায়গায় সেতু নির্মাণের প্রয়োজন ছিল। ওই সব সেতুর কাছ থেকে বড় বড় শাখা নদী বা খাল বরাবর সাব-পোল্ডার তৈরি করা হলে মূল নদীর প্রবাহ অনেকটাই বজায় থাকত। এসব চিন্তা না করে সেই সময়ের নীতিনির্ধারকরা হয়তো চেয়েছিলেন অল্প খরচে বন্যা সমস্যার দ্রুত সমাধান।

ফলে কয়েক বছরের মধ্যে নদীর প্রবাহ কমে নদীগুলোতে পলি জমতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে উজান থেকে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহও বাধা পেতে থাকে। ফলে নদী ও পোল্ডার এলাকায় বাড়তে থাকে লবণের পরিমাণ। কমতে থাকে নদীর তলের গভীরতা। বহু জায়গায় তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অভিঘাতও সৃষ্টি হয়।

এরপর আশির দশকে প্রবলভাবে শুরু হওয়া অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ পরিস্থিতিকে আরো বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। বেড়িবাঁধের মধ্যে যেখানে-সেখানে স্লুইস গেট বসিয়ে একেকটি পোল্ডারের মধ্যে অসংখ্য নোনা পানির ঘের তৈরি করা হয়। ফলে বৃদ্ধি পায় পোল্ডারের মধ্যে লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা। ১৯৮০-র দিকে বাংলাদেশে ২০ হাজার হেক্টরের মতো জমিতে চিংড়ি চাষ হতো। বর্তমানে তার পরিমাণ দুই লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর ছাড়িয়ে গেছে। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বিস্তীর্ণ এলাকার ম্যানগ্রোভ গাছ নির্মূল করে সেখানে চিংড়ি চাষ করা হয়েছে। একসময়ের আধা মিষ্টি পরিবেশে জন্ম নেওয়া গাছাপালা ধ্বংস হয়ে গেছে। নিদারুণভাবে পরিবর্তিত হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ। খাবার পানির সংকটসহ হুমকিতে পড়েছে এলাকার জনস্বাস্থ্য।

এ কথা সত্যি যে অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে এখন চিংড়ি চাষ বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যেখানে-সেখানে স্লুইস গেট বসিয়ে বেড়িবাঁধ দুর্বল করার কারণে ঘূর্ণিঝড়কেন্দ্রিক জলোচ্ছ্বাসে তা ভেঙে গিয়ে গোটা পোল্ডারের মধ্যে নদীর পানি ঢুকে প্লাবন ঘটায়। যেমনটি ঘটেছিল সিডর আর আইলার সময়। এখন সময় এসেছে, সমন্বিতভাবে স্লুইস গেটের জায়গায় সেতু নির্মাণপূর্বক একটি পোল্ডারের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে সাব-পোল্ডার তৈরি করে যত বেশি সম্ভব জায়গায় জোয়ারাধার সৃষ্টি করা। এর ফলে পোল্ডার অভ্যন্তরে পলিমাটির স্তর বৃদ্ধি পেয়ে তা একসময় নদীর তলদেশের লেভেলের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করবে। ফলে এলাকার জলাবদ্ধতার পরিমাণ হ্রাস পাবে। কিছু ক্ষেত্রে ড্রেজিংও উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ পুনরায় ফিরে আসতে সাহায্য করবে। বেড়িবাঁধগুলোর উচ্চতা বৃদ্ধি ও রক্ষণাবেক্ষণে আরো নজর দেওয়া এবং নদীর তীর ঘেঁষে ম্যানগ্রোভ বনায়নের চলমান প্রকল্পের এলাকা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিদেশে চিংড়ি ঘেরের মধ্যে ম্যানগ্রোভ গাছপালা লাগিয়ে দেখা গেছে, চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের দেশেও সেটি করা যেতে পারে। সত্যি কথা বলতে কী, লবণ ও জলদৈত্যের কবল থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রক্ষা করতে হলে বিগত ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের মাটি ও পানির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে সেভাবেই পোল্ডার উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য