kalerkantho


রোহিঙ্গাদের নির্মূল করাই মিয়ানমার সরকারের লক্ষ্য

অনলাইন থেকে

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মিয়ানমার সরকারের—মূলত সেনাবাহিনীর দমনমূলক অভিযানের কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। চলমান এ সংকটের বিষয়ে গত ১৬ জানুয়ারি বার্মা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্কের পরিচালক কিয়াও উইনের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে বার্তা ও সম্প্রচার সংস্থা স্পুিনক। কালের কণ্ঠ’র পাঠকদের জন্য সেটি উপস্থাপন করা হলো।

স্পুিনক : মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, সেটি সত্যি কাজ করবে বলে মনে করেন কি?

কিয়াও উইন : গণহত্যার ঘটনা যতবার ঘটবে ততবারই জবাবদিহির প্রশ্ন উঠবে। তাই জবাবদিহির ব্যবস্থা করতেই হবে। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া খুবই দায়সারা গোছের। কিছু করার ব্যাপারে তাদের গাছাড়া ভাব। তাদের এই হাবভাব আমাকে উদ্বিগ্ন করে; এই প্রবণতার সুযোগে নতুন পর্যায়ে সহিংসতা দেখা দিতে পারে, যা এ অঞ্চলের জন্য অনেক ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

গণহত্যার জন্য, পাইকারি হত্যার জন্য বা পুরো জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য দায়ী যেকোনো সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। এই অবকাশে তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

এ কথাও ঠিক, বিরাজমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি মানুষের (মিয়ানমারের অন্যান্য অধিবাসী) মনে বিদ্বেষবোধ রয়েছে। বার্মার সর্বত্র এই বিদ্বেষবোধ খুব প্রবল। সরকারের উদ্দেশ্যও স্পষ্ট, তারা তাদের লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছে। তারা রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করছে এবং নিরঙ্কুশ ‘বৌদ্ধ গ্রাম’ তৈরি করছে। শুধু বৌদ্ধদের বসতিই গড়ছে না, এখন তারা বার্মার অন্যান্য অঞ্চল থেকেও গাদা গাদা লোক নিয়ে আসছে।

এর মানে হলো, রোহিঙ্গা নির্মূলের অভিযান থামবে না। বৌদ্ধ অধ্যুষিত বসতি নির্মাণের ফল কী? এর ফল হলো, এই লোকগুলো (রোহিঙ্গা) ফিরে এলেও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোতেই তাদের থাকতে হবে। ফলে এই সংকটের অবসান ঘটবে না।

স্পুিনক : গণহারে রোহিঙ্গা নিষ্ক্রমণ ঘটছে, তারা নিপীড়িত-নির্যাতিত হচ্ছে। কী কারণে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলো?

কিয়াও উইন : সরকারের, শুধু একটি সরকার নয়, ১৯৭৮ সাল থেকে সব সরকারের মনোভাব ও আচরণ এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তাদের সবার কাছে রোহিঙ্গারা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত, অবাঞ্ছিত জনগোষ্ঠী। তারা এই জনগোষ্ঠীকে এমন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেটিকে নীরব গণহত্যামূলক পরিস্থিতি বলা যেতে পারে। পর্যায়ক্রমে তাদের সব কিছুই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এটি খুবই পরিকল্পিত। এই নির্মূলীকরণ প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক করে ফেলা হয়েছে। তারা তাদের নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তাদের চলাচলের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে, তাদের অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে, তারা অপুষ্টিতে ভোগে, তাদের সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।

এসবই হচ্ছে কারণ, যা রোহিঙ্গাদের বার্মা ছেড়ে পালাতে বাধ্য করছে। এখন যে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার কারণ বার্মা মুখরক্ষা করতে চায়, আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনা এড়াতে চায়। বার্মা এসব (নিপীড়ন-নির্যাতন) করছে, এ অভিযোগও এড়াতে চায় সরকার। এগুলোই যে প্রত্যাবাসন উদ্যোগের কারণ, তা স্পষ্ট। তাহলে জবাবদিহির কী হবে? পাইকারি হত্যা বা গণহত্যার ঘটনাগুলোর বিষয়ে জবাবদিহি আসলে নেই। এই লোকগুলো তাহলে ফিরবে কী করে? কী করে আন্তর্জাতিক মহল এসব বিষয়ে চোখ বুজে থাকবে? তারা (মিয়ানমার সরকার) কনসেনট্রেশন ক্যাম্প তৈরি করছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের চোখের সামনে, সবার চোখের সামনে এসব ঘটে কী করে?

স্পুিনক : পাশ্চাত্যের সরকারগুলো, যেমন ইইউ প্রভৃতি—তারা কি অং সান সু চিকে সমর্থন দিয়ে ভুল করেছে?

কিয়াও উইন : অং সান সু চি আগের মতো নেই, তিনি বদলে গেছেন। তাঁর এই পরিবর্তন সবাইকে মর্মাহত করেছে। তাঁকে মানবাধিকারের চ্যাম্পিয়ন ভাবা হতো। কিন্তু গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পরই তিনি জানান দিলেন, তিনি আর অ্যাক্টিভিস্ট নন, তিনি এখন রাজনীতিক। সত্যি তা-ই, এখন আমরা তা বুঝতে পারছি।

বাস্তবতা হলো, এখন তিনি বেপরোয়া সব কর্মকাণ্ড করছেন। সব কিছু অস্বীকার করছেন। শুধু যে অস্বীকার করছেন তা নয়, তিনি গণহত্যাপ্রবণ সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছেন।

আমার মনে হয়, পশ্চিমা দেশগুলো রাজনৈতিক সংস্কার আশা করছে, তাতেই তারা সমর্থন জোগাতে চায়। তারা মনে করছে, এই সংস্কার কাজের বিশ্বস্ত সহযোগী হলেন অং সান সু চি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, তিনি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, নিজের জনগণের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।

 

সূত্র : স্পুিনক ইন্টারন্যাশনাল (অনলাইন)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক



মন্তব্য