kalerkantho


শীত যাবে বসন্ত আসবে কষ্ট যাবে কবে?

মোফাজ্জল করিম

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শীত যাবে বসন্ত আসবে কষ্ট যাবে কবে?

হাঁড়কাপানো শীতে সেই কাকভোরে রিকশা নিয়ে বের হয়েছে সে। আজ শীতের সঙ্গে কুয়াশাও পড়েছে বেশ। বেশি দূরের জিনিস ভাল দেখা যায় না, আবছা আবছা লাগে। অন্য সময়ের তুলনায় রিকশা চালাতে হয় আরো সাবধানে। গায়ের চাদরটা দিয়ে মাথা ঢেকে নিয়েছে যত দূর পারা যায়, তারপর জোরসে প্যাডেল চালায় সে। আগাপাস্তলা শীতের কাপড়ে মোড়া আমি তার সওয়ারি। গন্তব্য কমলাপুর রেল স্টেশন। পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষটাকে বললাম, আস্তে যাও। ট্রেনের দেরি আছে। ‘জোরে চালাইলে গাটা গরম অয়। আমনে ডরাইয়েন না সাব, সাবধানে চালাইতাছি’, বলল সে। আমি আলাপ জমাতে চাইলাম, তাতে সময়টা কেটে যাবে, আর তার সুখ-দুঃখের কথাও শোনা যাবে।

‘কী নাম তোমার? দেশের বাড়ি কোথায়?’ আলাপের সূত্রপাত করি। ‘আমার নাম মফিজ, বাড়ি জামালপুর। সরিষাবাড়ী। তয় আজ দশ বছর ধইরা ঢাহা শহরে আছি। দেশের বাড়ি-টাড়ি হেই কবে বেইচ্যা-বুইচ্যা চইলা আইছি ঢাহায়।’ কথায় কথায় জানলাম, রায়ের বাজারের এক বস্তিতে বউ-পোলাপান নিয়ে থাকে মফিজ। ঘর ভাড়া দেয় মাসে চার হাজার টাকা। বউ অসুস্থ, প্যারালাইসিসের রোগী। একটা জোয়ান ছেলেকে বছরখানেক আগে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে হাজতে পুরে রেখেছে। স্কুলপড়ুয়া মেয়ে পাড়ার মাস্তানদের উৎপাতে স্কুলে যেতে পারে না। ছোট মেয়েটা ক’দিন ধরে জ্বরে পড়ে আছে ঘরে। এই শীতে মেয়েটার গায়ে একটা লেপ-কম্বল দিতে পারে না, টাকার অভাবে ডাক্তারের কাছেও নিতে পারে না। ‘চালের কেজি পঞ্চাশ টাহা, পিঁয়াজ নব্বই, মাইয়ারে আর তার মারে ডাক্তার দেহাই ক্যামনে কন? হারাদিন রিকশা চালাই, আর মনটা পইড়া থাহে হেদের কাছে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিকশা থামায় মফিজ। আমরা কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছে গেছি। ভাড়া দিতে দিতে তাকে সান্ত্বনা দেই আমি : দুঃখ কোরো না মফিজ মিয়া, ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে। এই শীতের কয়টা দিন চলে গিয়ে গরম এসে যাবে শিগগির। তখন সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে। শুনে সে বলল, ‘তয় চাউলের দাম পিঁয়াজের দাম শীত কমলেই কি আর কমব। সামনে ইলেকশন আইতাছে। দ্যাশে গণ্ডগোল লাইগা গেলে তো আমাদের কাজকাম সব বন্ধ অইয়া যাইব। তহন কী উপায় অইব? বড় মাইয়াডার লাইগাও কত চিন্তা। গুণ্ডাপাণ্ডায় ছাইয়া গেছে দ্যাশ। কুনু আইন-কানুন নাই।’ ‘আল্লাহ আছেন’, বলে আমি ব্যাগ হাতে পা বাড়ালাম ট্রেনের উদ্দেশে।

দুই.

সেই কবে, আজ থেকে প্রায় সোয়া শ বছর আগে, প্রখ্যাত ইংরেজ কবি পি. বি. শেলী বলে গেছেন : ইফ উইন্টার কামস্, ক্যান স্প্রিং বি ফার বিহাইন্ড—শীত এলে বসন্ত কি খুব দূরে থাকতে পারে? হ্যাঁ, ঠিকই তো। প্রকৃতির নিয়মে শীতের পর বসন্ত আসবে, তারপর একে একে আসবে গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরত-হেমন্ত। এই বাঘ পালানো শীতের কামড় খেতে হবে না মফিজের ছোট মেয়েটিকে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে রিকশা চালাতে হবে না তাকেও।

কিন্তু এই দুঃখের শীত, কষ্টের শীত চলে গেলেই কি মফিজের জীবনে দুঃখ-কষ্টের অবসান হবে? ওই যে বলল চালের দাম, পেঁয়াজের দাম, দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা—এগুলো কি শান্তিতে থাকতে দেবে এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে। কবি শেলীর আশার বাণীর চেয়েও যে সত্য মহামতি সক্রেটিস উচ্চারণ করে গেছেন আরো কতকাল আগে—সুখ-দুঃখ একই সূত্রে গাঁথা, একটার পর আরেকটার আবির্ভাব হবেই—কই, মফিজদের জীবনে তা হলে সুখ আসে না কেন কোনো দিন।

আমরা উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হয়েছি, আমাদের উন্নয়নের ঘোড়া টগবগিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। যে মাথাপিছু আয় স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ছিল আশি ডলারের ঘরে, তা এখন ১৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। এটা কি কম কৃতিত্বের কথা। আমাদের জিডিপি-ও স্লো বাট স্ট্যাডি গতিতে বাড়ছে, যেখানে আর সবাই হয় থিতু হয়ে আছে এক জায়গায়, আর নয় তো অধোগতি। এসব দেখে শত্রু-মিত্র সবারই চোখ টাটায়।

ঢাকা শহর দেশের বৈঠকখানা। এই বৈঠকখানাকে সাজাতে পরিকল্পনার অন্ত নেই। একটার পর একটা মেগাপ্রকল্প হচ্ছে। উড়াল সড়ক আর আকাশছোঁয়া দালানের ভিড়ে ক’দিন পর ঢাকার মানুষ আর চেষ্টা করলেও আকাশ দেখতে পারবে না। বিদেশীরা এদেশে এসে যাওয়ার সময় উন্নয়নের সার্টিফিকেট দিয়ে যায়। যদি বলি, আবার এসো, এসে আমাদের চোখ ধাঁধানো আরো উন্নয়ন দেখে যেয়ো। তারা মনে মনে বলে নৈব নৈব চ। মুখে বলে, তোমাদের ট্রাফিক জ্যামের কিছু একটা করো, তা হলে আসব না কেন, নিশ্চয়ই আসব। আর ইয়ে, ওই খুন খারাবি, গুম ওনগুলোও—।

আমরা উন্নয়নের কথা, মাথাপিছু আয় ও জাতীয় প্রবৃদ্ধির কথা বলি, প্রশ্ন হলো, এই আয়-উন্নতি কাদের? ধনী-গরীব, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত, চাষাভুষা, হাইলা-জাইলা সবার? সবার অবস্থার কি উন্নতি হয়েছে? ১৯৭২ সালে সবাই এক সমতলে না থাকলেও ওপরতলার মানুষরা যে উচ্চতায় অবস্থান করত, সেখানে তাদের অন্তত দেখা যেত, আর এখন? এখন তারা আছেন পর্বতশৃঙ্গে। আর নিচতলার মানুষের অবস্থানের সঙ্গে তাদের অবস্থানের ব্যবধানটা তাই যোজন যোজন। আমরা গর্ব করে বলি, আমাদের হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা শতকরা ৪০/৫০ থেকে আমরা ২২/২৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। নামিয়ে এনেছি বটে, কিন্তু প্রান্তিক মানুষেরা যে কী অবস্থায় আছে তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। পারি না, কারণ ঢাকা শহরের সুরম্য দালানগুলোর পাশে যে শত শত বস্তি, শহর থেকে দূরে যে হাজার হাজার বস্তিসদৃশ গ্রাম, সেগুলোর খবর আমরা রাখি না। বস্তিগুলোতে যে রিকশাওয়ালা, দিনমজুর বাস করে, যারা তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা শ্রম বিক্রি করে আমাদের কাছে, গ্রামের যে প্রান্তিক কৃষক, ভূমিহীন চাষা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে ফসল ফলিয়ে আহার জোগায় আমাদের, তারা এই শীতে কেমন ছিল আমরা কি জানি? আমরা তো লেটেস্ট ডিজাইনের স্যুট-কোট পরে উষ্ণায়িত ডাইনিং হলে দেশি-বিদেশি খাদ্য-পানীয় সদ্ব্যবহারে ব্যস্ত থেকেছি। আর না হয় গলাবাজি করে রাজনীতির ময়দানে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করতে চেয়েছি। বাংলাদেশে যত বিত্তশালী, যত ক্ষমতাশালী লোক আছেন, তাদের অর্ধেকও যদি এই শৈত্যপ্রবাহের সময় দেশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতেন, তা হলে ভয়ে পালিয়ে যেত শীত। হ্যাঁ, দাঁড়িয়েছিলেন বটে, তবে তাদের সংখ্যা নগণ্য।

তিন.

কিন্তু শীত পালালে কিংবা প্রাকৃতিক নিয়মেই তার দাপট হ্রাস পেলে কী হবে, সামাজিক বঞ্চনা-বৈষম্য ও অনাচারের ‘চিরস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ’ তো থেকেই যাবে। আর এটা এমন একটা প্রবাহ, যা শীত-গ্রীষ্ম কিছুই মানে না। সব ঋতুতেই সে মানুষকে হয় জমিয়ে বরফ করে ফেলে, আর না হয় পুড়িয়ে মারে। আর তার শিকার নিম্নবিত্ত মানুষ। যাদের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের তথাকথিত মাথাপিছু গড় আয়ের ধারে-কাছেও নেই। তা হলে এই মাথাপিছু আয়ের মাজেজাটা কী? মাজেজাটা হচ্ছে, এক শ্রেণির মানুষের আয় এত বেশি যে গড়পড়তা আয় নির্ণয় করার সময় পুরো দেশ সম্বন্ধে তা ভুল সঙ্কেত দেয়। ১০০ জন মানুষের মধ্যে ১০ জনের মাথাপিছু আয় যদি হয় ১০ কোটি টাকা, আর বাদবাকি ৯০ জনের হয় এক হাজার টাকা, তা হলে গড়পড়তা হিসাবের বেলায় ওই ৯০ জন (যাদের মধ্যে আবার অতি দরিদ্র মানুষ আছেন অন্তত ২০ জন) মানুষের আয়ও অতিমাত্রায় স্ফীত হয়ে দেখা দেবে। বাংলাদেশের বেলায় তাই হচ্ছে। একজন রিকশাওয়ালা বা ভূমিহীন কৃষক বা দিনমজুর শ্রেণীর মানুষের দৈনিক আয় কত? বড়জোর ৩/৪ শ টাকা। এর বিপরীতে উচ্চবিত্তশালীদের আয় গগনচুম্বী। নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তদেরও ধারণার বাইরে ওই পর্বতশৃঙ্গের মানুষদের আয়ের পরিমাণ। অথচ গড় আয়ের বেলায় সবাইকে এক পাল্লায় তুলে মাপা হচ্ছে। ফলে রিকশাওয়ালা মফিজ—যে একটা কাঁথার অভাবে নিজের এবং জ্বরে আক্রান্ত শিশুকন্যাটির শীত নিবারণ করতে পারছে না—সেও মাথাপিছু ১৬০০ ডলারের আয়ের দেশের মানুষ হয়ে গেছে! দেশে এই মফিজ বা তার মত মানুষের সংখ্যাই বেশি। আর যাদের আয় কোটি কোটি টাকা, যারা আমেরিকা-মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ নির্মাণ করেন, একটার জায়গায় দু’টি হাঁচি-দিলেই যারা সিঙ্গাপুরে দৌড়ান চিকিৎসার জন্য, তাঁরা আর মফিজদ্দি-কলিমদ্দিরা পরিসংখ্যানের কল্যাণে এক পাল্লায় উঠে গেছেন।

নিচতলার মানুষের কষ্ট শুধু হঠাৎ এক বছরের শৈত্যপ্রবাহের কারণেই নয়। তাদের কষ্ট বার মাস। তারা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের মধ্যে জন্মায়, মৃত্যুবরণও করে সেই চক্রে। গরিব বলেই তারা গরিব। গরিব নামক অক্টোপাসের হাত থেকে তাদের মুক্তি নেই। বন্যা-খরা-জলোচ্ছ্বাস-নদীভাঙ্গন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ওপরতলার মানুষদের কেশাগ্রটিও স্পর্শ করতে পারে না। অথচ নিচতলার মানুষগুলোর এটাই বিধিলিপি। বানভাসি কিংবা খরায় ফসলহানি হয় তাদের, নদীভাঙ্গন আর ঝড়-তুফান-সাইক্লোনে গৃহহারা হয়, মৃত্যুবরণ করে তারাই।

চার.

তাই বলছিলাম, শীত যাবে, বসন্ত আসবে, শীতের হিমশীতল বাতাসের করাল ছোবল থেকে দেশবাসী অচিরেই রক্ষা পাবে, সবই ঠিক আছে, কিন্তু ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ সেই অগণিত অভাগার জীবন থেকে কষ্ট কি কোনো দিন দূর হবে? তাদের কাছে জীবন মানেই তো দুঃখ, জীবন মানেই তো কষ্ট, যন্ত্রণা।

অথচ কত অল্পে তুষ্ট তারা। তাদের চাহিদা কত কম। শহরে-বন্দরে-গ্রামে তাদের বিশাল অট্টলিকা চাই না, দু’বেলা প্রয়োজন নেই মহার্ঘ খাবার-দাবার, জীবন পূর্ণ হোক বিলাস-ব্যসনে—এমন কামনা তাদের নেই, তারা চায় শুধু দু’বেলা দু’মুঠো শ্রমলব্ধ অন্নের নিশ্চয়তা ও যত্নে গড়া পর্ণকুটিরে শান্তির ঘুম। এর চেয়ে ক্ষুদ্র বাসনা আর কী হতে পারে? এটুকু চরিতার্থ হলেই এরা জয়ধ্বনি দেয় মতলববাজ দাতাগোষ্ঠীর। আর এটুকু দিতেই হাতে খিল ধরে যায় সেই সব বিত্তশালীর, যারা চিরকাল প্রবঞ্চনা করে আসছে তাদের সঙ্গে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অপমানিত’ কবিতার ক’টি পংক্তি স্মরণ করে লেখাটি শেষ করতে চাই : হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।/মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে,/সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।/...যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,/পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।...

নিচতলার মানুষগুলোকে আর কতকাল নিচে ফেলে রেখে উন্নয়নের ফানুস উড়াব আমরা?

 

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com



মন্তব্য