kalerkantho


গড় আয়ু বৃদ্ধি ও গুণগত জীবন

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গড় আয়ু বৃদ্ধি ও গুণগত জীবন

গত কয়েক বছরে আমাদের গড় আয়ু অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি তথ্য মতে বর্তমানে আমাদের গড় আয়ু ৭১.৬ বছর। শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু ও পোলিও নির্মূলে বাংলাদেশের সফলতা অসামান্য। এমন সফলতার প্রভাব গড় আয়ুতে পড়ছে বলে আমাদের ধারণা। গত ১৫ বছর আগেও আমাদের গড় আয়ু ৬০ বছরের নিচে ছিল। গড় আয়ুতে এমন বৃদ্ধি অতীতের বিভিন্ন সরকারের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বিভিন্ন খাতের সূচকের হারের বৃদ্ধির সঙ্গেও গড় আয়ুর একটি সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৬১০ ডলার। অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যাও অনেক কমে এসেছে। পাল্লা দিয়ে কমছে নিরক্ষরতার হার। এ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দিকে যাচ্ছিলাম। বর্তমানে আমরা খাদ্যশস্য রপ্তানি করতে সক্ষম হচ্ছি; যদিও রপ্তানির তুলনায় আমাদের আমদানির পরিমাণ বেশি। অনেক দেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক ভারসাম্য রয়েছে; তবু এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের সার্বিক অর্থনীতি ঊর্ধ্বমুখী। জীবন প্রত্যাশা যেমন খাদ্য গ্রহণের ওপর নির্ভর করে, তার চেয়ে বেশি প্রভাবক পুষ্টিকর ও ভেজালবিহীন খাদ্য গ্রহণে। বাজারে খাদ্যের অভাব কম, মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও ক্রমাগত বাড়ছে; কিন্ত যে কারণেই হোক পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্যের অভাব এখনো রয়ে গেছে।

পুষ্টিকর খাদ্যের পর আরো বড় নিয়ামক ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। সাধারণ ও জটিল রোগের জন্য চিকিৎসা জরুরি। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চিকিৎসা অপরিহার্য সন্দেহ নেই; কিন্তু দীর্ঘ জীবনের জন্য এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিচর্যার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বব্যাপী আজ গুণগত স্বাস্থ্য বা জীবন এবং সংখ্যাগত জীবন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শুধু গড় আয়ু বাড়ানো মুখ্য নয়, বড় বিষয় গুণগত জীবনের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া। আপনি দীর্ঘ সময় বাঁচতে পারেন অর্থাৎ আপনার আয়ু দীর্ঘ হতে পারে; কিন্তু সুস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকাই বাঁচার বড় সার্থকতা। স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে অন্যের ওপর বোঝা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আয়ু বেশি হলে সমাজে অবদান রাখার পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু স্বাস্থ্যের গুণগত মান ভালো না হলে গড় আয়ু বেশি হলেও ভালো ফল পাওয়া দুষ্কর। জনবহুল দেশ চীন একসময় জনসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। বর্তমানে বয়স্ক সমস্যা তাদের বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি গুণগত জীবন প্রত্যাশা নিয়ে ভাবছে। কিভাবে কোয়ালিটি লাইফ নিশ্চিত করা যায় সে জন্য বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। গড় আয়ু বৃদ্ধির এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আমাদেরও ভাবতে হবে গুণগত জীবন প্রত্যাশা নিয়ে।

গড় আয়ু বৃদ্ধি কোনো দেশের জন্য অশনিসংকেত নয়, যদি আয়ু বৃদ্ধিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়। এর অন্যতম উপায় কোয়ালিটি লাইফ বজায় রাখার চেষ্টা করা। আমরা গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর চিন্তা করছি। মানুষের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর এটি একটি উত্তম উপায়। স্বাস্থ্য খাতে বিগত বছরগুলোর ব্যয় ও সফলতা আমাদের জীবন প্রত্যাশাকে করেছে বৃদ্ধি। নিয়মিত ডাক্তার নিয়োগ, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বৃদ্ধি ও জটিল রোগের চিকিৎসা এ দেশে হওয়ায় মৃত্যুহার অনেক কমেছে। পাশাপাশি ভেজালবিরোধী অভিযান, খাদ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে মানুষের ধারণা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বজায় থাকায় গড় আয়ু বৃদ্ধি আরো এগিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে আরো যুক্ত হয়েছে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা। শুধু ডাক্তার নয়, স্বাস্থ্যবিষয়ক খুঁটিনাটি জানতে হলে আমাদের রয়েছে আরো অনেক মাধ্যম। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন আমরা স্বাস্থ্যের নানা দিক জানতে পারি। ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র আমাদের অনেক কিছু জানতে শেখাচ্ছে। ফলে আমাদের সচেতনতার মাত্রা অনেক গুণ বাড়ছে। 

গুণগত জীবনকে প্রফেশনাল ভাষায় অ্যাকটিভ এইজিং বলা হয়। বয়স্ক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর আওতা বড় এবং বিস্তৃত। অ্যাকটিভ এইজিংয়ের সুফল পরিবার, সমাজ ও দেশ সরাসরি পেয়ে থাকে। সব ক্ষেত্রে আমরা একে ধরে রাখতে পারব তার কারণ নেই। বেঁচে থাকার জন্য যেমন রয়েছে খাদ্য, তেমনি আরো অনেক কিছু। তা পূরণ করার জন্য আমাদের ব্যবস্থা জরুরি। বলার অপেক্ষা রাখে না, গুণগত মানের স্বাস্থ্য অন্যের ওপর নির্ভরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু এর বিপরীত অবস্থা নির্ভরতা তৈরি করে। তখন প্রয়োজন পড়ে পরিবারের সদস্যদের আর্থিকসহ অন্য অনেক সহায়তা। এমন প্রয়োজন যখন পরিবার পূরণ করতে পারে না তখন প্রয়োজন পড়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের সহায়তা। তৈরি করতে হয় বয়স্ক নিবাসের। গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সেবামূলক ব্যবস্থার আকারও বাড়াতে হচ্ছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনুপাতে এখনো আমাদের বয়স্ক নিবাসের সংখ্যা কম। কারণ হলো আমাদের বয়স্করা পারিবারিক পরিবেশে থাকতে অভ্যস্ত। পরিবারের বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পরিবেশ নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তাদের জন্য যুতসই নয়। বয়স্ক নিবাস বেশি পরিমাণে সুরক্ষা ও আমাদের প্রজ্ঞা, পরিবারব্যবস্থা ও প্রথার সঙ্গে ঠিক মানানসই নয়। পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ভাবা যেতে পারে। লক্ষ করলে দেখবেন আমাদের পরিবারের আকার যেভাবে ছোট হচ্ছে এবং গড় আয়ু যেভাবে বাড়ছে, তাতে গুণগত জীবন প্রত্যাশা হয়তো একদিন সফল হবে; কিন্তু জীবন একাকিত্বে কাটবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে।

বাংলাদেশে গড় আয়ু বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; কিন্তু জীবন যদি অ্যাকটিভ না হয়, যদি মানসম্মত না হয়, তাহলে সংখ্যা জীবন দিয়ে সমাজে নির্ভরতার পরিমাণ বাড়বে। আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা, জীবনাচরণ, অভ্যাস, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া বেশি জরুরি। সংখ্যা দিয়ে নয়, মান দিয়ে আমরা জীবন প্রত্যাশাকে বিচার করতে চাই। ভালো স্বাস্থ্যসহ আমরা দীর্ঘ জীবন প্রত্যাশা করি। এ জন্য যা যা করণীয়, তা আমাদের করতে হবে। নইলে গড় আয়ুর সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারব না।

 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com



মন্তব্য