kalerkantho


সাদাকালো

ঢাকাকে বাঁচাতে দরকার খাল উদ্ধার কার্যক্রম

আহমদ রফিক

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকাকে বাঁচাতে দরকার খাল উদ্ধার কার্যক্রম

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একসময় বহু কণ্ঠে স্লোগান উঠেছে : গ্রাম বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। স্লোগানদাতা অনেকেই জানত না, কথাটি বহুদিন আগে একজন কবি-কর্মীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল। এবং তিনি তাঁর সাধ্যমতো নিজ এলাকায় মডেল হিসেবে গ্রামোন্নয়ন ও পল্লী পুনর্গঠনের গুরুদায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছিলেন। করেছিলেনও উন্নয়নের কাজ, যা ওই এলাকায় অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর গ্রাম তৈরিতে সাহায্য করে। ঘটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবারও প্রসার। ওই মানুষটির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এলাকা রাজশাহীর কালিগ্রাম পরগনার ৬০০ গ্রাম।

আবারও ওই চিন্তাবিদ মানুষটির উক্তি উল্লেখ করে আমাদের স্বভাববৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিতে হয় এই বলে যে আমাদের কথায় ও কাজে অনেক ফারাক। আমরা যা বলি, বাস্তবে তা সামান্যই করি। আমরা কাজ শুরু করি যদিও বা তা শেষ করি না ইত্যাদি। বর্তমানে ওই অবস্থার কতটা পরিবর্তন ঘটেছে তা ভুক্তভোগী মাত্রই বলতে পারবে। তবে পরিবর্তন ঘটেছে অন্যদিকে। আর তা হলো নানা মাত্রিক জবরদখলের হিড়িকে।

যেমন নদীমাতৃক দেশের প্রাণ নদী দখলের পাঁয়তারা এতটা জোরদার হয়ে উঠেছে অবৈধ দখলদারদের বাধাহীন দৌরাত্ম্যে যে সচেতন শিক্ষিত সমাজে স্লোগান ওঠে, বিস্তর লেখালেখিতে স্লোগানের মতোই ঘোষণা ওঠে ‘নদী বাঁচাও।’ নদী না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না। ঘটনা বাস্তবিকই তাই। পদ্মা-যমুনা-তিস্তা-বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা, এমনকি নবগঙ্গা ও মধুকবির কপোতাক্ষ পর্যন্ত এ অবৈধ হামলার শিকার।

ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা এতটাই দূষিত, এতটাই নিস্তরঙ্গ, গতিহীন যে শেষ পর্যন্ত এমন কথাও নিত্যদিন লেখা হচ্ছে : ‘বুড়িগঙ্গা বাঁচাও’। স্লোগান  অনেকটাই ভারতীয় পরিবেশবাদী নেত্রী মেধা পাটেকরের মতোই, ‘নর্মদা বাঁচাও’। এ স্লোগান তাৎপর্যে ভিন্নমাত্রার হলেও বিষয়টি নদী নিয়ে। দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গ চেষ্টার আন্দোলন কায়েমি স্বার্থশক্তির কাছে হার মানে।

বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-নবগঙ্গা নিয়ে আমাদের প্রতিবাদ অবস্থার শেষ পরিণতিই কি তেমনই হবে? কারণ এখানেও কায়েমি স্বার্থ প্রবল শক্তিমান। তাই উচ্চ আদালতের নির্দেশও কার্যকর হয় না। শীতলক্ষ্যা-বুড়িগঙ্গা তার প্রমাণ। আর বিভিন্ন ধারায় এই স্বার্থপরতার এতটাই বাড়াবাড়ি শুরু হয়েছে যে বড় বড় নদীও আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। প্রমাণ বিশাল যমুনার বুকে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকারের ব্যবসা। বাধা দেওয়ার কেউ নেই। বুড়িগঙ্গার দূষণ ঠেকাতে হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তরের সরকারি সিদ্ধান্তও হালে পানি পাচ্ছে না। কায়েমি স্বার্থবাদীরা এতটাই শক্তিমান।

নদীমাতৃক দেশের প্রাণ নদীর এমন হালচাল দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। অন্যদিকে শ্রেণিবিশেষের অর্থ-সম্পদ ফুলেফেঁপে আকাশমুখী হয়ে উঠেছে। এবং এর বিস্তার এতটাই যে এখন তাদের নজর পড়েছে দেশের খাল-বিল-জলাশয়গুলোর দিকে। এসব খাল-বিল নানা দিক থেকে দেশের এক শ্রেণির মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত তা-ই নয়, পরিবহন, পরিবেশ, জলাবদ্ধতা ইত্যাদিতে এদের রয়েছে অপরিহার্য ভূমিকা। আর তা নানা মাত্রিক ভারসাম্য রক্ষায়, জীববৈচিত্র্য রক্ষায়।

দুই.

এই যে নদ-নদী তথা জলস্রোত-জলপ্রবাহ নিয়ে দীর্ঘ ভূমিকা, এর নেপথ্য কারণ খাল-বিল রক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন, তাদের বাঁচানোর ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে। যাঁরা ব্যবস্থা নেবেন তাঁরা এখনো যথেষ্ট মাত্রায় শক্তিমান হলেও দায়িত্ববান ততটা নন। তাই সমস্যার নিরসন দূরে থাক, তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আগ্রাসনের হাত ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে; দূরে, অনেক দূরে এগিয়ে এর থাবা।

দেশজুড়ে চলছে খাল-বিল দখলের মহোৎসব। উত্তরবঙ্গের কিংবদন্তিসুলভ চলনবিলের বুকে এখন চাষাবাদ চলছে, অন্য অংশ ব্যবসায়ীকুলের আগ্রাসনের শিকার। নানা কৌশলে, নানা কায়দায় চলছে এসব খাল-বিল দখলের পাঁয়তারা। এদের নির্ভীক তৎপরতা দেখলে মনে হতে পারে যে এসব ক্ষেত্রে দেশটিতে কোনো ধরনের শাসনব্যবস্থার অস্তিত্ব নেই। যে যার মতো করে শক্তি ও আধিপত্যের প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে।

অবাক হওয়ার মতো ঘটনা যে এ নির্বিচার দখলদারি-নৈরাজ্য শুধু যে দেশের দূর প্রান্তিক অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে তা-ই নয়, খোদ রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায়ও দখলদারির ব্যাপকতা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব, উদাসীন বা বিশেষ কোনো কারণের চাপে অন্ধের ভূমিকা পালন করছে।

প্রমাণ কিছুদিন আগের একটি দৈনিক পত্রিকায় দুই কলামজুড়ে শিরোনাম : ‘ঢাকার খালে ২৪৮ দখলদার’। তাদের দূরদর্শী চিন্তার প্রকাশ ছোট অক্ষরে ঘোষণায় : ‘খাল বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে’। এই সচেতন ঘোষণার প্রেক্ষাপটেই আমাদের এ প্রতিবেদনের শুরু এই বলে : ‘গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে, নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ ইত্যাদি। একই কথা খাল-বিল নিয়ে।

ওই সুচিন্তিত সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে ঢাকা মহানগরের প্রান্তিক এলাকাজুড়ে খাল দখলের এই যে মহোৎসব, এতে শুধু স্বার্থপর দুর্বৃত্তরাই তৎপর তা-ই নয়, সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডও এতে সংশ্লিষ্ট। পূর্বোক্ত পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে লোভের নজর পড়েছে এমন ‘৫৮টি খালের মধ্যে ৩৭টি খালের অংশবিশেষ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (‘রাজউক’), তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাতটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও ২৪৮ জন ব্যক্তি দখল করে নিয়েছে।’

এককথায় এসব খাল ভরাটের পেছনে অবৈধ-অনৈতিক ভূমিকায় রয়েছে ‘রাজউক, জেলা পরিষদ, আবাসন প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।’ ভাবতে অবাক লাগছে, ‘শর্ষের মধ্যে ভূত।’ তাহলে অন্য ভূতেরা দখলদারিতে সাহসী ও উৎসাহী হবে না কেন? হ্যাঁ, তারা উৎসাহী হচ্ছে। এবং বিনা মূল্যে বিপুল সম্পদের অধিকারী হচ্ছে।

‘জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২২টি খালের মধ্যে একটি বাদে বাকি সব খালের জায়গায় এখন রাস্তা। যে খালগুলো টিকে আছে সেগুলোর অধিকাংশ ময়লা-আবর্জনার চাপে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ধরে রাখতে পারছে না। দ্রুত উদ্ধার না করলে এগুলোও হারিয়ে যাবে।’

কিন্তু কে করবে উদ্ধার? কে রাস্তা ভেঙে চাপা পড়া খালের পুনরুজ্জীবন ঘটাবে, জলপ্রবাহ নিশ্চিত করবে? কে কিংবদন্তিতুল্য ধোলাই খালের অস্তিত্ব পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারবে? সেখানে তো এখন দিনরাত বাণিজ্যিক কর্মতৎপরতা, লাভ-লোকসানের হিসাব-নিকাশ আর কারিগরি কর্মকাণ্ডের ঠনঠন আওয়াজ। শিশু-কিশোর থেকে বয়স্ক মানুষ সেখানে কর্মব্যস্ত। এমন এক দায়দায়িত্বহীন নগরে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেবে, রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে উঠবে, এমনটাই তো স্বাভাবিক। বাস্তবে তা-ই ঘটছে। ঘটছে নগরবাসীর চরম দুর্ভোগ।

তিন.

পরিস্থিতি বিচারে একজন নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে ‘এসব দখলদারির কারণে ঢাকায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী আকার ধারণ করেছে। বৃষ্টির পানি কৃত্রিম ও স্বাভাবিক (খাল) পথ বেয়ে নদীতে পড়লে তবেই না মহানগর ঢাকা জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে।’ কিন্তু সেসব পথ বন্ধ। তাঁর মতে, ‘ঢাকাকে বাঁচাতে হলে খালগুলোর পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। যেকোনো মূল্যে এটি করতে হবে।’ বলা বাহুল্য, এ চিন্তাভাবনার কথা ঢাকাবাসী যেকোনো সাধারণ মানুষের মুখ থেকেও শোনা যায়। সাধারণ বুদ্ধিই অবস্থা বুঝতে ও করণীয় নির্ধারণের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু বড় সমস্যা হলো কে শোনে কার কথা!

অবস্থা এমন এক বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে যে প্রতিকার অসম্ভব বলা চলে। রাস্তা কেটে খাল উদ্ধার করা এখন পাগলামি বলেই মনে হবে। তবু এটা করতে হবে। কারণ ঢাকা নগরীর অভিশাপ এর জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে খাল উদ্ধারের চেষ্টা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। কাজটি খুবই কঠিন। কিন্তু ঢাকা নগরীকে বাঁচাতে হলে এ ব্যবস্থা হাতে নিতেই হবে।

প্রথমত, বিপন্ন বা মজে যাওয়া খালগুলোর সংস্কার কাজে অবিলম্বে হাত লাগাতে হবে। এগুলোর জলপ্রবাহে গতি সঞ্চার করতে হবে এবং এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ যথাযথভাবে করতে হবে, যাতে এগুলো আবার অবৈধ বা অযৌক্তিক কর্মকাণ্ডের শিকার না হয়। দ্বিতীয়ত বিলুপ্ত খালগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এ কাজই সবচেয়ে কঠিন।

কিন্তু কঠিন হলেও তা তো ফেলে রাখা যাবে না। যেকোনো উপায়ে হোক, লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এ দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তাকে এ দায়িত্ব পালন করতেই হবে। এরপর খাল সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। না হলে আবার খালগুলো পূর্বাবস্থায়, বদ্ধাবস্থায় ফিরে যাবে। এর কারণ আমাদের চারিত্রিক উদাসীনতা এবং এক শ্রেণির মানুষের সীমাহীন লোভ-লালসা ও অনৈতিক-অবৈধ ক্রিয়াকলাপ।

ঢাকা বাঁচাতে সিটি করপোরেশনকে যেমন এ দায়িত্ব পালন করতে হবে, কাজ শুরু করতে হবে এখনই সময় নষ্ট না করে, তেমনি এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। এ দুই শক্তির সমন্বয়ে খাল উদ্ধার করে ঢাকাকে সুষ্ঠু চলাচলের ও সুস্থ পরিবেশের নগরে পরিণত করতে হবে। প্রয়োজনে শুরু করতে হবে খাল উদ্ধারের জন্য আন্দোলন। আর সে আন্দোলনে অংশ নিতে হবে সচেতন নগরবাসী মানুষের, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে, যাতে সরকার ও সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন হয় এবং কর্তব্য পালনে যথাযথ উদ্যোগ নেয়।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী



মন্তব্য