kalerkantho

co

বিব্রতকর দশায় ভারতের বিচার বিভাগ

অনলাইন থেকে

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ঘটনাটি একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্ভাগ্যজনক। সুপ্রিম কোর্টের চার জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সংবাদ সম্মেলন করে বিচার বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ে নজিরবিহীন মতানৈক্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি (সিজেআই) দীপক মিশ্রর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে বিদ্রোহের যে ব্যানার তুলে ধরা হলো, তা দুঃখজনক। সিজেআইয়ের প্রশাসনিক কাজ নিয়ে চলমান এই বিতর্কে কে সঠিক সেই বিষয়টিকে বাদ দিলেও গত শুক্রবার যা ঘটে গেল তা খুব সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। দীর্ঘ সময় এর প্রতিক্রিয়া থেকে যাবে। সর্বোচ্চ আদালতের উত্তেজনার আঁচ কয়েক মাস ধরেই পাওয়া যাচ্ছিল। প্রশ্ন হলো, এর কি এভাবে প্রকাশ্যে আসার প্রয়োজন ছিল? নিজেদের মধ্যেই মিটিয়ে নেওয়া যেত না? প্রধান বিচারপতির পর সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ চার বিচারপতি জে চেলমেশ্বর, রঞ্জন গগৈ, মদন বি লোকুর ও কুরিয়ান জোসেফ বিষয়গুলো নিয়ে খুব বিস্তারিত না জানালেও স্পষ্ট বোঝা যায়। তাঁদের ক্ষোভের কারণ হচ্ছে, বিচারপতি মিশ্র ‘বাছাই’ করে মামলার বেঞ্চ গঠন করছেন। এসব ক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। তাঁর বিচারিক কাজ নিয়েও আপত্তি আছে এই চার বিচারপতির। তাঁদের অভিযোগ, দেশ ও প্রতিষ্ঠানের জন্য সুদূরপ্রসারী ভূমিকা আছে এমন মামলাগুলো কনিষ্ঠ বিচারক ও বেঞ্চের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগের মধ্যে অনেকেই বিচারকাজে বাইরের হস্তক্ষেপের অশুভ ইঙ্গিত পাচ্ছেন। এখানে উল্লেখ করার দাবি রাখে যে মামলায় বিচারক নিয়োগ ও বেঞ্চ গঠনের পূর্ণ এখতিয়ার প্রধান বিচারপতির। বিষয়টিকে চার বিচারপতি স্থিরীকৃত আইন বলে স্বীকারও করেছেন। এক সাংবিধানিক আদালত ১৯৯৮ সালে এই সিদ্ধান্ত দেন। এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েই চার বিচারপতি জানান, প্রচলিত মতধারা থেকে বিচারপতি মিশ্র দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছেন, যা ‘নজিরবিহীন ও অবাঞ্ছিত’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এটি চূড়ান্ত বিচারে খোদ প্রতিষ্ঠানকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে। যুক্তির বিচারে এটি বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিষয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের উপস্থিতিতে শুনানির মধ্য দিয়েই যা মিটিয়ে নেওয়া উচিত ছিল।

প্রধান বিচারপতিকে চার বিচারপতির লেখা চিঠি, যা গণমাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে এবং যেভাবে তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করলেন, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট, লিখিত বা মৌখিকভাবে ক্ষোভের যে প্রকাশ তাঁরা ঘটিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে তা আরো ব্যাপক ও গভীর। বিচারপতি মিশ্রর বেঞ্চ গঠনের ক্ষমতা নিয়ে এই চার বিচারপতির কারো কোনো আপত্তি নেই। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই ক্ষমতা প্রধান বিচারপতি কী করে ব্যবহার করছেন তা নিয়ে। প্রধান বিচারপতির তৈরি করে দেওয়া পালা অনুসারেই বিচারকাজ চলে। ক্যাটাগরি অনুসারে নানা বেঞ্চের ওপর পৃথক মামলা দেওয়া হয়। মামলার বণ্টন সম্পন্ন হলে প্রধান বিচারপতির কাজ হলো তদারক করা। এর অন্যথা বিরল। হলেও তার যৌক্তিক কারণ থাকে। তবে কিছু মামলায় ব্যতিক্রমের চর্চা হয়েছে, তার কোনো সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান নেই। এই চার বিচারপতির আপত্তির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিশেষ সিবিআই বিচারক বি এইচ লয়ার মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের জন্য পিটিশনের বিষয়টি। ২০১৪ সালে বিশেষ একটি মামলার দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি লয়া। ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ গুজরাটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে সোহরাবউদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার নির্দেশ দেন এবং তা কার্যকরও করা হয়। এ নিয়ে মামলার শুনানির সময় ওই বিচারকের মৃত্যু হয়। অন্য বিচারপতির অধীনে শুনানির পর খালাস পেয়ে যান অমিত শাহ। মামলাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিদ্রোহী চার বিচারপতি। ভুল-বোঝাবুঝি দূর করার স্বার্থেই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলাটির যথাযথ সমাধান টানা জরুরি।

বর্তমান সরকারের উচিত বিচার বিভাগের এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে দূরে থাকা। সরকারের তৎপরতা থেকে স্পষ্ট, তারা কাজটি করবে। তবে একেবারে নীরব না থেকে বিচারপতি নিয়োগ ও বিচার কার্যক্রম নিয়ে নিজস্ব মতামত জানাতে পারে তারা। বিদ্রোহী চার বিচারপতি যে চিঠি দিয়েছেন তার মধ্যেও এ বিষয়টি এসেছে।

চার বিচারপতি যেসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেগুলো এড়িয়ে না গিয়ে প্রধান বিচারপতির উচিত সব বিচারককে নিয়ে একটি বৈঠক ডাকা, যেখানে উদ্বেগ জানানো প্রতিটি বিষয়ের সতর্ক শুনানি হবে। যে পদ্ধতিতে তাঁরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন সেটিকে নাকচ করতে গিয়ে তাঁদের ক্ষোভের বিষয়বস্তুকে বাতিল করে দেওয়া চলবে না। চার বিচারপতির এ ধরনের নজিরবিহীন তৎপরতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, মতানৈক্য পচন ধরাতে শুরু করেছে। গভীর হচ্ছে বিভক্তি। একই সঙ্গে তাঁরা বিশ্বাস করেন, ভুল বা সঠিক যা-ই হোক, নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সর্বোত্তম পন্থা হলো জনসমক্ষে নিজেদের মতানৈক্য আর প্রকাশ না করা। উত্তর প্রজন্মে এই ঘটনা নজির হিসেবে বিবেচিত হবে না, বরং এর উল্লেখ হবে স্খলন হিসেবে। বিচারক নিয়োগ নিয়ে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের তীব্র মতবিরোধ বছরখানেক আগে জাতি অস্বস্তি নিয়ে প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের বিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছিল। তবে এর চেয়েও অনেক বেশি গুরুতর সংকট হলো বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ ফাটল। এর ফলে বিচার বিভাগের প্রতি সমাজের আস্থা বিনষ্ট হতে পারে, বিচার বিভাগের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হতে পারে। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় জীবনে উদ্দীপ্ত ভূমিকা রেখে চলেছে এই প্রতিষ্ঠান। এর ওপর এখন কালোছায়া পড়ছে। সমন্বিত আত্মজিজ্ঞাসার সময় এটাই।

 

সূত্র : দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য