kalerkantho


কালান্তরের কড়চা

‘তালগাছটা আমার’—এই দাবির মুখে সালিসি বৈঠক করে লাভ নেই

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘তালগাছটা আমার’—এই দাবির মুখে সালিসি বৈঠক করে লাভ নেই

আগামী সাধারণ নির্বাচনে যোগদানের প্রশ্নে বিএনপির সুর নরম হচ্ছে মনে হয়। আমি বরাবর বলে এসেছি, বিএনপি ২০১৪ সালের ভুলের পুনরাবৃত্তি আর করবে না। ওই নির্বাচনে যোগ না দেওয়া দলের যে মহাভ্রান্তি, এ কথা বিএনপির বহু প্রবীণ শুভাকাঙ্ক্ষী তখনই বলেছেন। এবার এই ভুল করলে বিএনপির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। সুতরাং ২০১৮ সালের নির্বাচনে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে বিএনপি নেতারা মুখে যা-ই বলুন, তলে তলে যে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তা পত্রপত্রিকার খবরাখবর দেখলেই বোঝা যায়।

গত ১২ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার বর্তমান মেয়াদের চার বছর পূর্ণ হয়েছে। এ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘এ বছরের শেষ দিকেই সংবিধানের ধারা মেনে নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও মির্জা ফখরুল গর্জে উঠে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সমস্যা আরো জটিল করবে। বিএনপি আন্দোলন করে দাবি আদায় করবে। অর্থাৎ হাসিনা সরকারের অধীনে তাঁরা নির্বাচনে যাবেন না, তাঁদের নির্বাচন সহায়ক সরকার গঠনের দাবি তাঁরা আন্দোলন করে আদায় করে নেবেন।

আমি এর মধ্যেই এ সম্পর্কে লিখেছি, এটা অক্ষমের আন্দোলন। নির্বাচনের আগে এটা বিএনপির দর-কষাকষি; কিন্তু হাসিনা সরকারের দৃঢ়তার মুখে তারা অবশ্যই এ সরকারের অধীনেই নির্বাচনে আসবে। আন্দোলন করার শক্তি তাদের নেই। তাদের আন্দোলনে জনসমর্থন নেই। সুতরাং নির্বাচনে এলে দলের অস্তিত্ব বজায় থাকবে। অত্যাশ্চর্য কোনো কিছু ঘটলে তারা জয়ী হতেও পারে। অন্যথায় অতি লোভে তাঁতি নষ্ট হবে। বিএনপি পলিটিক্যাল ওয়াইল্ডারনেসে চলে যাবে।

এই বাস্তব অবস্থাটা যে বিএনপি নেতারা বোঝেন তার প্রমাণ, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে নির্বাচন সম্পর্কিত কথা নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখালেও এখন তাঁরা নতুন কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে যে কথা বলেছেন, বিএনপি তার নতুন অর্থ বের করেছে। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর কথাটার তারা অর্থ করছে নির্বাচনকালে অন্য একটি সরকার থাকবে। তারা এই সরকার গঠন সম্পর্কে বর্তমান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায়। এটা শুভংকরের ফাঁকির রাজনীতি। মানুষকে বিভ্রান্ত করার রাজনীতি।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। এর সরলার্থ, নির্বাচনকালে যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে সেই সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। সারা গণতান্ত্রিক বিশ্বেই সেভাবে নির্বাচন হয়। বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে, তাদের অধীনেই নির্বাচন হবে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তাদের অধীনে হতো। এই সত্যটাকে গোপন করে বিএনপি সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চায়, নির্বাচন হবে সে সময়ের এক সরকারের দ্বারা এবং তার গঠন প্রকৃতি সম্পর্কে তারা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায়।

এটা ব্রিটিশ আমলের মুসলিম লীগ রাজনীতির এক ধাপ্পাবাজি। কংগ্রেস নেতারা মুসলিম লীগ নেতাদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিতে বললেই জিন্নাহ বলতেন, আগে আমাদের দাবি (পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা) সম্পর্কে আলোচনায় বসুন। এরপর দেখা যাবে, আমরা কিভাবে আন্দোলনে যোগ দিতে পারি। জিন্নাহর চাতুরী সম্পর্কে মওলানা আজাদ গান্ধীকে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও (দেখুন মওলানা আজাদের স্মৃতিকথা ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম) গান্ধী বহুবার জিন্নাহর সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন, দুই দিন পরই জিন্নাহ বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে বলেছেন, ‘ফ্যাসিস্ট কংগ্রেস আমাদের কোনো দাবিদাওয়া মানতে রাজি নয়।’ বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে। তার দায়ভার বহন করতে হয়েছে গান্ধী ও কংগ্রেসকে।

জিন্নাহর কাছে বহুবার ভারতের বিভিন্ন দলের নেতারা প্রস্তাবিত পাকিস্তানের রূপরেখা কী হবে, তা জানতে চেয়েছেন। জিন্নাহ কোনো রূপরেখা কোনো দিন দেননি। বলেছেন, সময় এলেই পাকিস্তানের রূপরেখা দেওয়া হবে। আমার পাঠকরা লক্ষ করবেন, বিএনপি নির্বাচন সহায়ক যে নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে তার রূপরেখা কী হবে, বহুবার তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। তারা তা আজ পর্যন্ত দেয়নি। এই সেদিনও বলেছে, খালেদা জিয়া এই রূপরেখা যথাসময়ে দেবেন। এই যথাসময়টি কবে আসবে?

যে নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখাই নেই, তা নিয়ে আলোচনায় বসা যাবে কী করে? আর প্রধানমন্ত্রী কি আলোচনার ডাক দেবেন বেগম জিয়ার কাছে নিজের সম্মান খোয়ানোর জন্য? একবার তো শেখ হাসিনা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বেগম জিয়ার কাছে টেলিফোন করেছিলেন আলোচনার জন্য। সেই টেলিফোন সংলাপে বেগম জিয়া কী ধরনের অশালীন আচরণ করেছিলেন, কী ধরনের অভব্য কথাবার্তা বলেছিলেন, তা কি দেশবাসীর জানা নেই? এরপর প্রধানমন্ত্রী বর্তমান অবস্থায় বিএনপির সঙ্গে কী জন্য আলোচনায় যাবেন? যেখানে আলোচনার কোনো বিষয়বস্তুই নেই।

আগামী নির্বাচন যদি আলোচনার বিষয়বস্তু হয়, তাহলে নির্বাচনের তো নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপিও দল গোছাতে শুরু করেছে। প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে! সুতরাং নির্বাচনের আগে আলোচনার বিষয়বস্তুটা কী? আলোচনার নামে দেশের রাজনীতিতে অচলাবস্থা সৃষ্টির তো কোনো অর্থ হয় না। বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা বৈঠকই সফল হবে না। অতীতে হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না। বিএনপি আলোচনা বৈঠকে বসতে চায় সমস্যা সমাধানের জন্য নয়, সমস্যায় জটিলতা সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টির জন্য। আলোচনার নামে এই অচলাবস্থা সৃষ্টি দ্বারা তাদের লাভ, দেশের ক্ষতি। যারা সালিসি মানার নামে বারবার শুধু তালগাছটা চায়, তাদের সঙ্গে তো আলোচনায় বসে কোনো লাভ নেই।

বেগম জিয়া বিএনপির নেতৃত্বে আসার পর দলটিকে জাতে ওঠানোর জন্য স্লোগান তোলা হয়েছিল, দুই নেত্রীর বৈঠক চাই। যুক্তি দেখানো হয়েছিল, এরশাদ স্বৈরশাহীর  উচ্ছেদ ঘটানোর জন্য দুই নেত্রীর মধ্যে সমঝোতা দরকার। আমার প্রয়াত বন্ধু সাংবাদিক ফয়েজ আহ্মদ দুই নেত্রীকে একত্রে বসানোর জন্য প্রাণপাত পরিশ্রম করেছিলেন। শেখ হাসিনা রাজি হয়েছিলেন। দুই নেত্রীর একত্রে বসার ছবিও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। ওই ফটোসেশন পর্যন্তই সার! এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হয়নি। আলাদা আলাদা মোর্চা গঠন করেছে।

আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঢাকা সফরে এসে দুই নেত্রীর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। দুজনকে নিজের পাশে বসিয়ে ফটোসেশনও করেছিলেন। লাভ কিছু হয়নি। বারবার দুই দলের মধ্যে একটা সমঝোতা প্রতিষ্ঠার এই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণ কী? মূল কারণ, সব সময় বিএনপির তালগাছটা দখলে রাখার ইচ্ছা। তাদের কথা হলো, সালিস মানি, তবে তালগাছটা আমার।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সামান্য ভোটের ব্যবধানে জয় আওয়ামী লীগ মেনে নিয়েছে। এ কথা বলেনি যে আমাদের জয় কারচুপি করে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারা বিরোধী দলের আসনে গিয়ে বসেছে। কিন্তু ক্ষমতায় বসেই বেগম জিয়া ভোল পাল্টান। জাতির পিতার অসম্মান শুরু করেন। স্বাধীনতার আদর্শকে বিতর্কিত করে তোলেন। দলতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং নির্বাচনে কারচুপি করে জেতার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সংসদে বিরোধী দলের কথা বলা অসম্ভব করে তোলেন।

বিরোধী দলের সদস্যদের কেউ, এমনকি শেখ হাসিনা কথা বলতে দাঁড়ালেই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ইশারায় স্পিকার মাইক বন্ধ করে দিতেন। একবার তো সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের ‘চুপ বেয়াদব’ বলে অশোভন ভাষায় ধমক দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ বাধ্য হয়ে সংসদ বর্জন করে এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকরের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। তখন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘শিশু ও পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ হয় না।’ এখন তিনি সেই শিশু ও পাগল নিয়েই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানাচ্ছেন কি?

দেশে বিএনপির কাণ্ডকারখানাতেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সফল হয়নি। বিএনপি নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের আমলে এই সত্য প্রকট হয়ে ওঠে। দেশের মানুষ এই পদ্ধতি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সংবিধানেও এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। এ অবস্থায় এই ডেড ইস্যু নিয়ে আলোচনা বৈঠক কিসের? বর্তমান সরকার অতীতের বিএনপি সরকারের মতো দুর্নীতিতে কোনো রেকর্ড সৃষ্টি করেনি। হাসিনা সরকারের আমলে বিএনপি চার-চারটি সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। তার পরও বিএনপি নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অসত্য ব্যাখ্যা তৈরি করে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রশ্নে আলোচনায় বসার আবদার তোলেন।

আসলে আলোচনা নয়, আলোচনার নামে কৌশলে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা। বিএনপি দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার কাজে আন্তরিক হলে কৌশলের রাজনীতি ত্যাগ করে নির্বাচনে আসুক। নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি হলে তখন প্রতিবাদ জানাক। দেশের মানুষ ও বিশ্ববাসীর চোখ এবার বাংলাদেশের এই নির্বাচনের ব্যাপারে সদা জাগ্রত। এই চোখকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয় এবং আওয়ামী লীগ সরকার সেই ফাঁকি দিতে চাইবেও না, রংপুরের সাম্প্রতিক সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনেও তার প্রমাণ মিলেছে।

দেশের মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন চায়। হাসিনা সরকারও সেই নির্বাচন দিতে বদ্ধপরিকর। সুতরাং অপ্রয়োজনে পানি ঘোলা না করে এই নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির ভয় কিসের? আসলে তারা চাচ্ছে ২০০১ সালের তাদের পছন্দের নির্বাচনপ্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি। তা আর হবে না। সাহাবুদ্দীন-লতিফুরের নেতৃত্বে গঠিত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আসল চেহারাটা কী ছিল, দেশের মানুষ তা আজ জানে।

বিএনপি নিজের স্বার্থ ও অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে নির্বাচনে অংশ নেবে। এটা দর-কষাকষি ও মুখরক্ষার চেষ্টা। যতই গরম গরম কথা বলুক তারা জানে, ২০০১ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটানো আর সম্ভব নয়। জনগণ ভোট দিলে তারা গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় আসবে। এতে কারো আপত্তি নেই। জনগণ না চাইলে তারা সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করতে পারবে। সেই দরজা তো খোলা থাকবেই।

আমার লেখার পাঠকরা একটু অপেক্ষা করুন। নির্বাচনে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে বিএনপি এখন সুর নামিয়েছে। দেখবেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হলে তারা ঠিকই নির্বাচনে অংশ নেবে। নইলে দেশের রাজনীতিতে বিএনপিকে আইয়ুবের কনভেনশন লীগ ও ভাসানী ন্যাপের পরিণতি বরণ করতে হবে।

লন্ডন, সোমবার, ১৫ জানুয়ারি ২০১৮

 



মন্তব্য