kalerkantho


উত্তর কোরিয়া ও ট্রাম্প সংকট এখনো বিদ্যমান

অনলাইন থেকে

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বহু স্বৈরশাসকের মতো উত্তর কোরিয়ার নেতারও লোক-দেখানোর প্রতি বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় শীতকালীন অলিম্পিকে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেশে-বিদেশে প্রতীকী অর্থে হলেও প্রশংসা পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তাঁদের জাতীয় তেজেরও প্রকাশ ঘটেছে। তাঁরা জানান দিতে পেরেছেন যে দেশটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থারই একটি অংশ, জাতিচ্যুত নয়। সে দেশ আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় হতে প্রস্তুত। ডিমিলিটারাইজড জোনে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের মধ্যে গত মঙ্গলবারের শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্য উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করা হচ্ছে। দুই বছরের মধ্যে হওয়া প্রথম এই বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্ববাসী। তাহলে কি আশঙ্কাগুলোর ইতি ঘটল? অবশ্যই না। অতীত সংকটের ক্ষেত্রেও আমরা একই ধারা প্রত্যক্ষ করেছি—উত্তেজনা বাড়ে, দুই কোরিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন হয়, দুই পক্ষের তরফ থেকে এমন বাক্যবাণ শুরু হয় যেন যুদ্ধ আসন্ন, যতক্ষণ পর্যন্ত না নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়, আলোচনা শুরু হয়। যার নিশ্চিত পরিণতি হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার সাহায্য বা অন্য কোনো সুবিধা লাভের আশা। তবে এবার ঝুঁকি অনেক বেশি। 

প্রথম বিষয়টি হলো উত্তর কোরিয়া খুব দ্রুত তাদের অস্ত্রভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে। অল্প কিছু বিশ্লেষকই বিশ্বাস করেন যে পুরোপুরি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ এখনো সম্ভব। এখন যেকোনো আলোচনার মুখ্য উদ্দেশ্যই হবে, আরো অস্ত্র তৈরি বন্ধ করা। আর দ্বিতীয় বিষয়টি বসে আছে হোয়াইট হাউসে। এই পুরো সংকট তৈরির দায় এককভাবে উত্তর কোরিয়ার নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাতলা চামড়া, অজ্ঞতা, অসংগতি এবং হুমকি (অথবা মাঝেমধ্যে ভুয়া চুক্তির লোভ) এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। উত্তর কোরিয়াকে ‘এমন ক্ষোভের আগুন দিয়ে মোকাবেলা করা হবে, যা বিশ্ব আগে কখনোই দেখেনি’ বলে যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা ‘যুদ্ধ থামানোর’ প্রচেষ্টাকে খাটো করে। গত সপ্তাহে তিনি বলেছেন, তাঁর পরমাণু বোমার সুইচ কিম জং উনের চেয়ে বড় ও শক্তিশালী। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমস্যা এবং পরমাণু অস্ত্রের বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি শুধু ওই উপদ্বীপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রার্থী থাকাকালে ট্রাম্প নাকি একবার জানতে চেয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না। জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যেই তিনি দেশের পরমাণু অস্ত্রের উৎপাদন ১০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। দ্য গার্ডিয়ান সম্প্রতি জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসন পরমাণু অস্ত্রের পরিবর্তে ‘ব্যবহার উপযোগী’ ছোট অস্ত্র তৈরিতেই বেশি আগ্রহী; যদিও বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের মনঃপূত নয়। উত্তর কোরিয়াকে এই বেপরোয়া প্রেসিডেন্ট সবচেয়ে বড় ও আসন্ন ঝুঁকি বলে মনে করেন। 

‘চুক্তির গ্রাম’ বলে পরিচিত পানমুনজমে দুই কোরিয়ার নেতাদের সাক্ষাতের ছবি ও খবর প্রকাশের পরও শোনা যাচ্ছে, মার্কিন প্রশাসন সীমিত আকারে হলেও হামলা চালাতে আগ্রহী। তারা পিয়ংইয়ংকে একটা ভালো শিক্ষা দিতে চায়, যাতে পুরো বিষয়টি নিয়ে পুনর্বিবেচনায় বাধ্য হয় পিয়ংইয়ং। তবে এই চিন্তাভাবনা দেশটির পরমাণু অস্ত্র পুরোপুরি ধসিয়ে দেওয়ার হামলা চালানোর মতোই অকার্যকর এবং বাজে পরিকল্পনা। অতীতে যাঁরা এই পরিকল্পনার সমর্থক ছিলেন তাঁরাও বলছেন, এটি এখন আর গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। এর প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়ায় শুধু দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানি নাগরিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং এর আঁচ এসে লাগবে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের ওপরও। যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি প্রশাসনের (উত্তর কোরিয়া) সঙ্গে লড়তে চাইছে, যারা সব সময়ই পতনের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে। এমন একটি প্রশাসনের পক্ষে ভয় দেখানো হামলা এবং সর্বাত্মক হামলার মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব না-ও হতে পারে।

মার্কিন প্রশাসন হয়তো ইঙ্গিত দিতে চাইছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরিকল্পনা থেকে পিছু হটেনি; যদিও উত্তেজনা আগের চেয়ে অনেকটাই থিতু হয়েছে। এর পরও তারা উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে চায় অথবা পেইচিংকে আরো তৎপর করতে চায়। ট্রাম্প এরই মধ্যে দাবি করেছেন, তাঁর সাহসী তৎপরতার কারণেই আলোচনা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টও আলোচনা শুরুর বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘কৃতিত্বের অংশীদার’ করতে আগ্রহী। এর কারণ সম্ভবত এই ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে সিউলের প্রয়োজন। তবে এ ধরনের হুমকির জন্য ওয়াশিংটনকে মূল্যও দিতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ভয়টি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে। আরেকটি বিষয় আছে, পিয়ংইয়ং বিশ্বাস করে, ওয়াশিংটন হামলা চালাবে। এই ভুল বা ভুল বিচার যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে। ছোট পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করে ছোট হামলাও বিপজ্জনক। কারণ এরাও আশঙ্কাকে সত্যে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য