kalerkantho


সংসদ নির্বাচন নিয়ে পানি ঘোলা করার কোনো কারণ নেই

আবদুল মান্নান

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সংসদ নির্বাচন নিয়ে পানি ঘোলা করার কোনো কারণ নেই

১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার চার বছর পার করে পঞ্চম বছরে পা দিল। এদিন দেশের প্রায় সব মেইন স্ট্রিম সংবাদমাধ্যম খবরটি বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রথম পৃষ্ঠায় ছেপেছে। ব্যতিক্রম ছিল দুটি প্রিন্ট মিডিয়া। এ দুটির অনেকটা প্রকাশ্য এজেন্ডা হচ্ছে আগামী নির্বাচনে যেকোনো উপায়ে হোক শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখা। যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত ক্ষমতায় গেলেও তাদের কোনো আপত্তি নেই। এদের একটি আবার সপ্তাহ দুয়েক ধরে বর্তমান সরকারের যত নেতিবাচক সংবাদ বা কাজ আছে, তা সিরিজ আকারে প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করেছে। এসব খবরের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না করেও এটা তো প্রত্যাশা করা যায়, সরকারের কিছু ভালো কাজ নিয়েও কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করা। ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটানা ৯ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেন। এটি বাংলাদেশের যেকোনো সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য একটি রেকর্ড। পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, যিনি কিনা দেশ স্বাধীন করার জন্য আজীবন লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন, একাধিকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র সাড়ে তিন বছর বেঁচে ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একটি ভয়াবহ দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি ঘাতকদের হাতে নিহত হন। দেশের বাইরে থাকার সুবাদে তাঁর দুই কন্যা—বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। তবে এটি স্বীকার করতে হবে, যে বুলেটটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে খুঁজে পায়নি সেই বুলেটটি এখনো তাঁকে খুঁজছে। আল্লাহর রহমত ও মানুষের দোয়ায় তিনি এখনো বেঁচে আছেন।

চার বছর পূর্তিতে ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনার এই মেয়াদে গত চার বছরের সাফল্যের কথা টিভি ও বেতার ভাষণের মাধ্যমে দেশের মানুষ শুনেছে। যেসব সাফল্যের কথা তিনি বলেছেন, সে সম্পর্কে কারো কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়। অবশ্য এর দুই দিন আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়া ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বাংলাদেশের দেশ কাঁপানো মেগা প্রজেক্ট পদ্মা সেতু নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা মেধার বিচারে তাঁদের দুজনকেই দলের দপ্তর সম্পাদক রিজভী আহমেদ ও শামসুজ্জামান দুদুর কাতারে নামিয়ে এনেছে। রিজভী আহমেদ এখন বিএনপির রাজনীতিতে একটি রিলিফ চরিত্র হয়ে উঠেছেন। দুদু ক্ষমতায় গেলে ঢাকার নাম বদলে জিয়ানগর করার ঘোষণা দিয়েছেন। আরেক দিন হয়তো বলবেন, বাংলাদেশের নামটিই খালেদা জিয়া অথবা তারেক রহমানের নামে রাখা হবে। এমন কথা বিএনপির কেউ বললে অবাক হওয়ার তেমন একটা কিছু থাকবে না। এই শীতে বেশ কয়েকজন তামাদি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সুধীজন এমন সব রাজনৈতিক মন্তব্য করছেন, তা প্রমাণ করছে যে শীতকালে পাগলের সংখ্যা বাড়ে প্রবাদটি মিথ্যা নয়। শেখ হাসিনা তাঁর বক্তৃতায় তাঁর সরকারের সাফল্য ছাড়াও আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঘোষণা করে বলেছেন, এই নির্বাচন সংবিধানের বেঁধে দেওয়া পদ্ধতি অনুসারেই হবে; কারণ সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ে এটি পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এক মুহূর্তের জন্যও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা অনির্বাচিত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে যাওয়া উচিত নয়। সেই ধারার বলেই সংসদে নির্বাচনকালে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রহিত করে আগের ব্যবস্থা, অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনেই সংসদ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেমনটি অন্যান্য দেশ—ভারত,  জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যে আছে।

শেখ হাসিনার রেডিও-টিভির ভাষণের পরপরই যথারীতি বিএনপির মির্জা ফখরুল আর তথাকথিত নিরপেক্ষ ঘরানার কিছু সুধীজন টিভি ক্যামেরার সামনে  হাজির। মির্জা ফখরুল জানালেন, শুধু তিনি নন, দেশের মানুষ হতাশ। কারণ শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কিছু বলেননি। তাঁর মতে, শেখ হাসিনার বক্তব্য দেশকে সংকটের দিকে নিয়ে যাবে। তিনি কোন জনগণের কথা বুঝিয়েছেন, তা বোঝা গেল না। ২০১৩ সালে অসাংবিধানিক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি দেশের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করে প্রায় ৩০০ নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মেরেছিল, যদি সেই জনগণের কথা বলে থাকেন, তাহলে তিনি মারাত্মক ভুল করেছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে আরো বলেছেন, তাঁর দল নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলতে চায়। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কেমন হবে, তা স্পষ্ট করেই সংবিধানে বলা আছে, যেমনটি প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা অনেক অপমান মাথায় নিয়ে বেগম জিয়ার সঙ্গে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন। এমনও বলেছিলেন, সেই সরকার হবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দ্বারা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিএনপি যেকোনো মন্ত্রণালয় চাইতে পারে। বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর এমন উদার আহ্বান পায়ে ঠেলে দিয়েছিল এবং ঘোষণা করেছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে কোনো সরকার গঠন করা হলে তা তারা এক দেশ কাঁপানো গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে টেনে নামিয়ে দেবেন। বিএনপি বুঝতে অক্ষম যে আন্দোলনের নামে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা এক জিনিস আর সত্যিকার গণ-আন্দোলন অন্য জিনিস। বিএনপি ভুলে গিয়েছিল, এরশাদবিরোধী আন্দোলন তারা আগে শুরু করলেও তা ততক্ষণ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছেনি যতক্ষণ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তাতে শামিল হয়নি। এ দেশে গণ-আন্দোলন করার অভিজ্ঞতা শুধু আওয়ামী লীগেরই আছে, তা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। বিএনপি বা তাদের মিত্র জামায়াত আন্দোলনের নামে লাগামহীন সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে, জনগণের দুর্ভোগের কারণ হতে পারে, জনগণ আর রাষ্ট্রের সম্পদের ক্ষতি করতে পারে; কিন্তু কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতা তাদের নেই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসেছে। যেহেতু এরশাদ পতনের আন্দোলনে সব দলই অংশগ্রহণ করেছিল, তারা ঠিক করেছিল এরশাদের পতনের পর যে নির্বাচনটি হবে তা হবে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, যার প্রধান হবেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি। সেই সময় আন্দোলনরত তিন জোট এ ব্যাপারে একমত হয়েছিল যে পর পর তিনটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে। ১৯৯০ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের অধীনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় এবং সেই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয় লাভ করে। এরপর কিন্তু এমন একটি সরকারের কথা মানুষ ভুলে যায়। আরো উল্লেখ্য যে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেও গঠিত হয়নি। সংবিধান বলবৎ রেখে এমন একটা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করাটাও অনুচিত ছিল, যা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়েও উল্লেখ করা হয়েছে। বেগম জিয়ার প্রথম শাসনামলে মাগুরা ও ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে যে তামাশা হয়েছিল, তা যদি না হতো, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরো বিষয়টাই বিস্মৃত হয়ে যেত। এই দুটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনের নামে তামাশা হওয়ার পর আওয়ামী লীগসহ অন্য দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার দাবিটি আবার পুনরুজ্জীবিত করে। বেগম জিয়া কোনো অবস্থাতেই এই ব্যবস্থায় ফিরে যেতে অস্বীকার করেন এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আরেকটি প্রহসনের সংসদ নির্বাচন করেন। যাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্বাচনকালীন অসাংবিধানিক একটি সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য দাবি তোলেন তাঁরা একবারও বলেন না ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সেই সংসদে ১৬টি আসনে কোনো প্রার্থীই ছিল না। ১৬৮টি আসনে বিএনপি ছাড়া কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। সেই সংসদে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল (বরখাস্ত) আবদুর রশীদকেও খালেদা জিয়া সংসদ সদস্য হিসেবে বসার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। যেসব মিডিয়া আর সুধীজন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে বলে গলা ফাটান, তাঁরা এসব তথ্য সম্পর্কে কখনো উচ্চবাচ্য করেন না। কথায় কথায় তাঁরা বর্তমান সরকারকে অনির্বাচিত সরকার বলেন। কখনো বলেন না ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের নামে যে তামাশা হয়েছিল, সেই নির্বাচনে কত শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিল! এমন একটি অসমাপ্ত ‘সংসদ’ই তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে সংসদ ভেঙে দিয়ে সব সংসদ সদস্য রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এ রকম একটি তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই তো উচ্চ আদালত বাতিল করে দিয়েছেন। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে বিএনপি আর তার মিত্রদের শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনেই নির্বাচনে আসতে হবে। সেই সরকার আকারে ছোট হবে, সদস্যরা নির্বাচিত হবেন এবং তাঁরা রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন। তেমন একটি নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করা সমীচীন। নির্বাচনে আসতে না চাইলে কোনো দলকে জোর করে অথবা ফুসলিয়ে নির্বাচনে আনা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নয়। নির্বাচন ছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হওয়ার একমাত্র বিকল্প হচ্ছে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা, যার রেকর্ড বিএনপির আছে।

সব শেষে একটি কথা বলতেই হয়। শুধু উন্নয়নের কথা বলে নির্বাচনে জয়লাভ করা সহজ নয়। নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করতে হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বুঝতে হবে ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ এখনো অপ্রতিরোধ্য। গত কয়েক মাস দেশের প্রায় সব সিটি করপোরেশনের সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, সেসব সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীরা প্রতিপক্ষের কাছে হারেননি, হেরেছেন নিজেদের দলের নেতাদের ষড়যন্ত্রের কাছে। আমার বিশ্বাস, আগামী নির্বাচন একটি ভালো নির্বাচন হবে এবং সেখানে সব দল অংশগ্রহণ করবে। কোনো দলকে সেধে নির্বাচনে আনতে হবে না। সংসদ নির্বাচন নিয়ে পানি ঘোলা করার কোনো কারণ নেই।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক



মন্তব্য