kalerkantho


মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে সমাজকে বাঁচাতে হবে

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে সমাজকে বাঁচাতে হবে

মাদককে দেশের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে মাদকের সঙ্গে যুক্তদের ধরে ধরে গুলি করাই একমাত্র সমাধান হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। এটি অবশ্যই তাঁর ক্ষোভের কথা। ২ জানুয়ারি ঢাকার তেজগাঁওয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে সংস্থাটির ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনাসভায় মন্ত্রী এ কথা বলেন। বলা বাহুল্য, দেশের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আজ মাদক নেই। মাদকের ছোবলে আজ যেন জাতি ডুবতে বসেছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, আমাদের সমাজে মাদক ব্যবসায়ীরা সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তাদের হাত অনেক লম্বা হওয়ায় বেশির ভাগ সময়ই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আবার মাদক নির্মূলের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও পুলিশের কিছু অসাধু কর্তাব্যক্তি মাদক গ্রহণ ও ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। রক্ষকই যদি ভক্ষকের ভূমিকায় থাকে, তাহলে আর কিছু বলার থাকে না। একেই বুঝি বলে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা?’ আবার মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার কর্তৃক মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু এ অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীই ঘুষ খেয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের মাদক ব্যবসা নির্বিঘ্ন করতে সহযোগিতা করেন—এ যেন সরষের মধ্যে ভূত।

সরষের মধ্যে ভূতের বাস্তব দেখা মেলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুল কবীরকে ৩ জানুয়ারি বিকেলে যশোর থেকে ঘুষের দুই লাখ টাকাসহ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক গ্রেপ্তার করার ঘটনার মধ্য দিয়ে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে দেশে মাদক নির্মূলের জন্য আলাদা বাহিনী, আলাদা বিপুলসংখ্যক পুলিশ দেওয়াসহ মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হলেও দেশ থেকে যেন কিছুতেই মাদক বন্ধ হচ্ছে না। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি লোক মাদকাসক্ত। সমাজের প্রতিটি স্থানে যেন আজ মাদকের অভয়ারণ্য। সমাজের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার লোক মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িত। মাদক গ্রহণ থেকে বাদ যান না পুলিশ, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, রিকশাচালক, দিনমজুর—কেউই। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে মাদক এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। ফলে সমাজে দিন দিন বেড়ে চলছে চুরি, ছিনতাই, খুনসহ নানা ধরনের অপরাধ। আর কোনো সংসারে যদি মাদকাসক্ত কোনো ব্যক্তি থাকেন, তাহলে ওই সংসারে যে চিতার আগুন (চির-অশান্তি) বিরাজ করে, তা বলাই বাহুল্য। মাদকের সর্বনাশা নীল ছোবলে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। অনেক সুখের সংসারও ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এবং অনেক সংসারই যাওয়ার পথে। মাদকের কারণে সমাজে ঘটছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, যা এ জাতির জন্য বড় অশনিসংকেতই বটে।

সংবাদপত্রের পাতা খুললে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় তাকালেই চোখে পড়ে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকদ্রব্য উদ্ধার করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। তবে দেশ থেকে মাদকদ্রব্য চিরতরে নির্মূলে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে মাদকে বুঁদ বাংলাদেশ। যেন মাদক নামক এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। দেশ থেকে এখনই যদি মাদকের বিস্তার নিযন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক অবক্ষয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে, পারিবারিক কলহ, সন্তানের হাতে মা-বাবার খুন হওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি পাবে। এ দেশে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক সেবন একসময় উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মাদক পাওয়া এখন সহজলভ্য হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে সবার মধ্যে মাদকের বিস্তার ঘটছে রকেটের গতিতে। পুরুষদের পাশাপাশি আজকাল মহিলাদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকের আগমন ও বিস্তারের পথ ছড়িয়ে পড়ছে শহর-বন্দর থেকে শুরু করে গ্রামের অলিগলি পর্যন্ত। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, কারাগারে বন্দি থেকেও অনেক আসামি বা কয়েদি মাদকের সঙ্গে যুক্ত। তারা হয় মাদক গ্রহণ করে, না হয় মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে পঞ্চাশের দশক থেকে আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র বা মাদকের গডফাদাররা বাংলাদেশকে মাদক চোরাচালানের উপযুক্ত ট্রানজিট বা করিডর হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। মাদকদ্রব্য উৎপাদনকারী থাইল্যান্ড, লাওস, মিয়ানমার, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, নেপাল, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ। ফলে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা এ দেশকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশকে টার্গেট করে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে গড়ে ওঠা কারখানায় উৎপাদিত ফেনসিডিল আর ইয়াবা ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আমাদের দেশে। এ ক্ষেত্রে সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়ে সত্যিকার অর্থেই দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে মাদকপাচার রোধে কাজ করে থাকেন, তাহলে দেশের মধ্যে মাদক প্রবেশ করা কি সম্ভব? নিশ্চয়ই সম্ভব নয়। তথ্যানুসারে মাদকাসক্তদের মধ্যে আশি ভাগই দেশের যুবসমাজ, যাদের ভবিষ্যতে দেশ বিনির্মাণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কথা। অথচ আজ তারা মাদকাসক্ত হয়ে ঝিমোচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মাদকের অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে মাদকাসক্তরা সমাজ ও পরিবারে নানা ধরনের জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজে বাড়ছে খুন-জখম, অপহরণ, ছিনতাই, চুরি, ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধ।

মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবহারজনিত সব কর্মতৎপরতায় জড়িত লোকজন ধরা পড়ছে প্রতিনিয়ত। এদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলাও হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছুদিন পর এসব মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্ত আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবার মাদক ব্যবসা ও মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশ থেকে কখনো মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে মনে হয় না। মাদক ব্যবসায়ী বা মাদকাসক্তরা যেন সহজেই জামিন না পায় কিংবা সহজেই ছাড় না পায়, সেদিকটা খেয়াল রাখা উচিত। কারণ এরা সমাজ, দেশ, জাতি ও পরিবারের শত্রু। পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীদের শক্তির উৎসগুলো শনাক্ত করে রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদের শক্তির উৎসগুলো যেকোনো মূল্যে চিরতরে বন্ধ করা আবশ্যক। দেশ থেকে মাদক নির্মূলে কঠোর থেকে কঠোরতর আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

স্মরণ রাখতে হবে, মাদক ও মাদকাসক্তি এখন বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মাদক একটি অভিশাপ। মাদক মানুষের অতীব মূল্যবান জীবন তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। নীরব ঘাতকের মতো মাদকাসক্তি প্রসার লাভ করছে আমাদের সমাজে। মাদকাসক্তি কর্মশক্তির বড় একটি অংশ গ্রাস করছে প্রতিনিয়ত। নষ্ট হচ্ছে যুবসমাজের সম্ভাবনাময় শক্তি। মাদকের ফলে জাতি হাঁটছে অন্ধকারের দিকে, মৃত্যুর দিকে হাঁটছে নৈতিক মূল্যবোধ এবং জন্ম নিচ্ছে ঐশীর মতো মাতা-পিতা হত্যাকারী সন্তান। তাই সমাজ ও জাতির স্বার্থে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত। প্রয়োজন মাদক গ্রহণকারীদের সংশোধনকেন্দ্রের মাধ্যমে সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মাদক নামক মরণনেশা প্রতিরোধে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন ব্যাপকহারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। মাদককে না বলুন—ঘরে ঘরে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করাও অতীব জরুরি। যে যুবসমাজের ওপর দেশের শিক্ষাদীক্ষা, উন্নতি-অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল, তারাই যদি মাদকের ফলে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাই মাদকের এই ভয়ংকর অভিশাপ থেকে জাতিকে বাঁচাতে সরকারসহ সবার আন্তরিকভাবে দ্রুত এগিয়ে আসা আবশ্যক।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ,

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য

kekbabu@yahoo.com



মন্তব্য