kalerkantho


রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে যেসব ব্যবস্থা নিতে হবে

জোনাহ ব্ল্যাংক ও শেলি কালবার্টসন

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য গত আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এমনটিই ধারণা করা হয় যে এসব নির্মমতা ও সহিংসতার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীই দায়ী। গত নভেম্বরে মিয়ানমার সরকার তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে, তবে তাদের বাড়িঘরে নয়। যে প্রক্রিয়ার ব্যাপারে তারা সম্মত হয়েছে, তাতে তাদের প্রত্যাবাসনে এক প্রজন্ম লেগে যাবে। বিষয়টিকে আমলে নেওয়া গেলেও উত্ফুল্ল হওয়ার মতো কিছু নেই। কারণ উদ্ভূত সমস্যার মূলে পৌঁছে সমাধানের অঙ্গীকারের ছাপ মিয়ানমার সরকারের কথায় নেই। মিয়ানমারে যা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের ভাষায় তা ‘জাতিনিধন’।

এ সমস্যার ব্যাপারে বিশ্বসম্প্রদায়ের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিবিধ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা উচিত। এক. স্বদেশে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে নভেম্বরে যে সমঝোতা হয়েছে সেটিকে সত্যিকার অর্থেই বাস্তবায়নের জন্য প্রভাব খাটানো এবং দুই. অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পরিপোষণের জন্য বাংলাদেশকে সহায়তা জোগানো।

মিয়ানমার (বার্মা নামেও পরিচিত) সরকার ১০০টির বেশি জাতিগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিয়েছে; কিন্তু রোহিঙ্গাদের স্বীকার করে না তারা। রাখাইন রাজ্যের উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায় রোহিঙ্গা নামে পরিচিত হলেও সরকার তাদের ‘বাঙালি’ অভিহিত করে থাকে। মিয়ানমার (তথা বার্মা) নামে ‘আধুনিক রাষ্ট্রীয় পরিচয়’ তৈরি হওয়ার অনেক আগে থেকে রোহিঙ্গারা সেখানে বাস করলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা ‘বিদেশি অভিবাসী’ ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

প্রথমেই নাগরিকত্বের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চনা ও যেসব সহিংস ঘটনার কারণে রোহিঙ্গারা পালাতে বাধ্য হয়েছে, সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে যতই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হোক, সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ডিসেম্বরের ১২ তারিখে যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রাজনীতিকদের কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে সন্দেহের চোখে দেখতেই হচ্ছে। স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে রোহিঙ্গারা নির্ভয়ে (রাষ্ট্রীয় নিবর্তনের আশঙ্কা না করে) এবং আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তায় দেশে ফিরতে পারবে কি না। এর জন্য যথাযথ পুনর্বাসন, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা এবং রাখাইন রাজ্যসহ বিভিন্ন রাজ্যে তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শর্ত পূরণ করাও দরকার। জাতিসংঘ এবং মিয়ানমার বেশ কিছু সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্যে একটি কমিশন গঠন করেছে। তবে মিয়ানমারই যেহেতু নিবর্তনকারী, ফলে সে উদ্দেশ্য সফল হবে—এ নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব যেহেতু মিয়ানমার গ্রহণ করেছে, অতএব বিশ্বসম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ তৈরি হলো তাদের দায়িত্বনিষ্ঠ রাখার, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বাধ্য করার।

মিয়ানমারকে অঙ্গীকারবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। বারাক ওবামা বিশ্বদরবারে মিয়ানমারকে গ্রহণ করে নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ১৯৬২ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশটি বিচ্ছিন্ন ছিল। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর ওবামা কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, দেশটিতে সফর করতেও যান। ২০১৬ সালের মধ্যে বেশির ভাগ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারও করেন তিনি। হয়তো যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুতই এসব করে ফেলেছে, তবে সব উল্টে দেওয়াও অসম্ভব কিছু নয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে মিয়ানমারের পুনর্ভুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র যেমন সহায়তা করতে পারে, তেমনি বাধারও সৃষ্টি করতে পারে। তারা মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহক না হলেও নিরাপত্তা-সহযোগীদের (ইসরায়েল, ভারত, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি) এ ব্যাপারে সহযোগিতা বন্ধ করার জন্য বলতে পারে। অনেকে বলে, চীন মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ও নিরাপত্তা সহযোগী। তারা মানবাধিকার পরিস্থিতির কথা বিবেচনা না করেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমারের পৃষ্ঠপোষকের দায়িত্ব সানন্দে পালন করবে। কথা সত্য। আবার এ কথাও সত্য, ২০০৭ সালের ‘জাফরান বিপ্লবে’র পর মিয়ানমারের নেতৃত্ব, বিশেষ করে মিয়ানমারের জনগণ চীনের ঘুঁটি হয়ে থাকতে চায় না।

যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে বলেছে, তাদের শুধু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হলেই হবে না, অন্যান্য জাতিসত্তার মতো তাদের নাগরিকত্ব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ শর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থন রয়েছে। অন্যথায় ১০ লাখ লোকের রাষ্ট্রহীন একটি জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হবে; বাংলাদেশ বা মিয়ানমার যেখানেই থাকুক তারা চরমপন্থা আর অস্থিরতার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হবে। এ ব্যাপারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে বা শরণার্থী শিবিরে বাসরত আফগান, ফিলিস্তিনি, সোমালি ও অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষের কথা উল্লেখ করা যায়।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের জন্য বাস্তবসম্মত এবং বহুমুখী উদ্যোগ দরকার। রাজনৈতিক সমাধান, নির্ভয়ে প্রত্যাবর্তনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কারণে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেসব মোকাবেলা করার জন্য বাংলাদেশকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলো সেই উদ্যোগে বিবেচিত হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়, তাহলে তাকে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

লেখক : প্রথমজন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক ও পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ; দ্বিতীয়জন যুক্তরাষ্ট্রের

নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যান্ড করপোরেশনের

জ্যেষ্ঠ গবেষক

সূত্র : ফরেইন অ্যাফেয়ার্স অনলাইন

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক



মন্তব্য