kalerkantho


২০১৮ সালের প্রতিশ্রুতি

অনলাইন থেকে

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বছর ফুরিয়ে এলে পেছনে ফিরে তাকানোটাই দস্তুর। কেমন কাটল বছরটি? একই সঙ্গে এ ভাবনাও আসে, নতুন বছর কী নিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ২০১৭ সালের নানা দিক নিয়ে প্রচুর বিশ্লেষণ প্রকাশ পেয়েছে। পাঠযোগ্য ইতিবাচক বার্তা সেখানে অবশ্যই আছে। তবে রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পেক্ষাপটে একে ঝামেলাদায়ক, সন্দেহ উদ্রেককারী ও বিপর্যয়ের ১২টি মাস হিসেবেও চিহ্নিত করা যেতে পারে। আমরা কি বিভাজন, সংঘাত ও দুর্ভোগের আরেকটি বছরের দিকে এগিয়ে চলেছি? জাতিসংঘ গত সপ্তাহে জানিয়েছে, লাখো অরক্ষিত শিশু হবে এসব সংঘাতের মূল শিকার। অথচ এরাই বিশ্বের ভবিষ্যৎ। না, আমরা সেই বিপর্যয়কর ভবিষ্যতের পথে হাঁটছি না। আমাদের শক্ত মুঠোর মধ্যেই রয়েছে আমাদের ভবিষ্যৎ আর ভাগ্য। পরিবর্তন আসতে পারে। পরিবর্তনের ইশতেহার হাতে নিয়ে একক ও সমন্বিতভাবে ২০১৮ সালকে একটি দিক পরিবর্তনের সময়ে পরিণত করা সম্ভব। আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে আমাদের। আবার এমনও হতে পারে যে আমাদের একটি বৈশ্বিক ও বার্ষিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যা এই বিশ্বকে একটি উন্নত, টেকসই, ফলপ্রসূ ২০১৮ সালের দিকে নিয়ে যাবে।

জাতিসংঘকে সক্রিয় করা

জাতিসংঘের মর্যাদা ও কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা ২০১৮ সালের প্রধান কাজগুলোর একটি। বহু ব্যর্থতা সত্ত্বেও জাতিসংঘ এখনো মানবতার আইন ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের একমাত্র ও সত্যিকারের অভিভাবক। যদিও ২০০৩ সালে ইরাকে অভিযান চালিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। বাকি বিশ্বশক্তিগুলোও যে করছে না তা নয়। বাশার আল-আসাদ প্রশাসনের বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদে বারবার ভেটো দিয়ে রাশিয়া সিরিয়ার দুর্ভোগকেই শুধু বাড়িয়ে চলেছে। জাতিসংঘের ঘোষণা ও মানবাধিকারসংক্রান্ত চুক্তিগুলো বহুবার আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য (যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ব্রিটেন) জাতিসংঘকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে তুলতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে ব্যর্থ হয়েছে। আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো পুরো অঞ্চলের কোনো স্থায়ী কণ্ঠ নিরাপত্তা পরিষদে নেই—এটা ভুল। মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে তাঁর পূর্ণ ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ২০১৮ সালে বিষয়টি বুঝতে হবে স্থায়ী পাঁচ শক্তিকে। জেরুজালেম ইস্যুতে সর্বসম্মত মতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেটো দিল সেটা ভুল ছিল। কোনো একক দেশের স্থায়ী ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও বিলুপ্ত করতে হবে।

গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস

স্নায়ুযুদ্ধের সময় যে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ছিল, সেগুলো ক্রমেই শেষ হয়ে আসছে। ২০১৮ সালের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে সেগুলোর মেরামত। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এখনো তাদের পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উন্নত ও বাড়িয়ে চলেছে। একই পথে হাঁটছে চীনও। যুদ্ধক্ষেত্রে কী করে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে সামরিক মহলে। ১৯৬৮ সালের অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তিতে যে শর্তগুলোর কথা বলা হয়েছে, তা বারবারই ভেঙে চলেছে স্বীকৃত পরমাণু অস্ত্রধর দেশগুলো। পাকিস্তান, ভারত, উত্তর কোরিয়া ও ইসরায়েল ‘পরমাণু ক্লাবে’ যোগ দিয়েছে। সিরিয়ার লড়াইয়ে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে, যা ১৯৯৭ সালের সনদ অনুসারে নিষিদ্ধ। দেশটির বিরুদ্ধে সে অর্থে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য পরমাণু সংঘাত ঠেকানোও ২০১৮ সালের একটি বড় চ্যালেঞ্জ।  পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধ করে গত জুলাই মাসে বিশ্বের ১২২টি দেশ যে চুক্তির প্রতি সমর্থন দিয়েছে তার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোকে। সিরিয়ার জৈব ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে নিরাপত্তা পরিষদকে।

দায়িত্ববান নেতাদের উৎসাহ প্রদান

দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের তীব্র অভাব আমরা বোধ করেছি বিগত বছরগুলোতে। রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের শি চিনপিং থেকে শুরু করে ফিলিপাইন, তুরস্ক ও সৌদি আরবে কর্তৃত্বপরায়ণ নেতাদের উত্থানও দেখেছি। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রেসিডেন্সিকে নোংরা প্যারোডিতে পরিণত করেছেন। তাঁর কারণে নিজ দেশ ও দেশের বাইরে বিভাজন বাড়ছে। নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বের এই ব্যর্থতার প্রভাব পড়েছে জীবনের সব স্তরে।

সংঘাতের অবসান

সিরিয়া, ইয়েমেন ও দক্ষিণ সুদানের লড়াইয়ের খুব ভালো বা যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। ২০১৭ সালে এগুলোর সমাধান করা সম্ভব হয়নি। তুরস্ক ও ইরানসহ রাশিয়া সিরিয়াতে যা করছে তা জাতিসংঘের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছে মাত্র। এতে কোনো পক্ষই উপকৃত হয়নি। এবার সিরিয়া সংকটের সমাধান করতে হবে দেশটির প্রতিবেশী নয়; বরং সিরীয়দের দিকে তাকিয়ে। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট মানুষ মেরেই চলেছে। এতে পশ্চিমাদেরও মৌন সম্মতি রয়েছে। যদি ট্রাম্প, প্রিন্স সালমান ও নেতানিয়াহু ইরানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাহলে তাঁদের প্রথমেই ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি ভেঙে দেওয়ার হুমকি বন্ধ করতে হবে। দক্ষিণ সুদানসহ এশিয়া বিশেষ করে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা নিয়েও ভূমিকা রাখতে হবে জাতিসংঘকে।

শ্রদ্ধাবোধ

পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান নিশ্চিত করা ২০১৮ সালের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান, ভিন্ন বর্ণ, লিঙ্গ, সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি সম্মান সর্বোপরি ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা অপরিহার্য। তাহলেই প্রত্যাশিত পরিবর্তনগুলো সম্ভব। এই প্রতিশ্রুতিগুলো কি বাড়াবাড়ি? আমরা তা মনে করি না। আমরা যদি কাজ করি, এগুলোর বাস্তবায়ন অবশ্যই সম্ভব।

 

সূত্র : ব্রিটেনের অবজারভার পত্রিকার সম্পাদকীয়

অনুবাদ : তামান্না মিনহাজ



মন্তব্য