kalerkantho


নতুন বছরে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নতুন বছরে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

রোহিঙ্গা সংকটের মতো একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে ২০১৮তে, নতুন আরেকটি বছরে। হঠাৎ করে এক দিনে এই সংকটের সৃষ্টি হয়নি, এ কথাটি ঠিক হলেও ২০১৭ সালের আগস্টের শেষ দিকে এসে এর ব্যাপ্তি ও ভয়াবহতা বাংলাদেশকে যে রকম একটি কঠিন সমস্যার মধ্যে ফেলে দেয়, সেটি মোকাবেলা করার জন্য আমাদের রাষ্ট্রের কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি অথবা বিকল্প চিন্তা ছিল কি না বাইরে থেকে তা বোঝা যায়নি। রোহিঙ্গা সমস্যাটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং শুধু প্রতিবেশী হওয়ার কারণেই বাংলাদেশ এর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে—এই প্রতিপাদ্যটি ঠিক হলেও এটি এখন স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক খেলার একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন, ভারত ও আমেরিকা এই তিন রাষ্ট্র এখানে সক্রিয় খেলোয়াড়। রাশিয়া চীনের সঙ্গে আছে। রোহিঙ্গা ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার তথ্য-উপাত্ত আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে। পাকিস্তানের এই চক্রান্তের সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো কোনো রাজনৈতিক পক্ষ জড়িত থাকতে পারে, এমন কথাও শোনা যায়।

মিয়ানমার কর্তৃক আরাকানের রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক উত্খাত এবং তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার কারণে ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ এই সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত গত প্রায় ২০ বছর ধরে চার-পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করছিল। গত আগস্টের পর থেকে নতুন করে সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গার আগমন এবং যে কারণে আগমন তার কোনোটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চার-পাঁচ লাখ নিপীড়িত, নির্যাতিত ও নিজ ভূমি থেকে উত্খাত হওয়া রোহিঙ্গা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বিগত বছরগুলোতে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে গত আগস্টের ঘটনার প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে, একটি অপরটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পূর্ব থেকে অবৈধভাবে বসবাসকারী চার-পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে যদি ফেরত পাঠানো যেত অথবা তাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যেত, তাহলে গত আগস্টে যা ঘটেছে তা হয়তো না-ও ঘটতে পারত। কথায় আছে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। ১৭৮৪ সালে বার্মিজ রাজা কর্তৃক আরাকান দখলের পর থেকে বিগত প্রায় আড়াই শ বছর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও বার্মিজদের মধ্যে সম্পর্ক কখনোই মসৃণ ছিল না, সংঘাত, সংঘর্ষ লেগেই ছিল, যা এখনো বিদ্যমান। প্রথমে জিয়াউর রহমানের সরকার, তারপর এরশাদের জমানায় এবং পরবর্তী সময়ে জামায়াত-বিএনপির আমলে রোহিঙ্গা ইস্যুকে ধর্মীয় বৃত্তের মধ্যে ফেলে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই সমস্যার সমাধানের পথ ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যায়। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পক্ষভুক্ত হয় আরো কিছু রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী। ২০১৭ সালে এটি যেভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে তাতে বোঝা যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভ্রান্ত নীতির সুযোগে বাংলাদেশের ভেতরের ও বাইরের ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণে বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে সংকটে ফেলার জন্য বহুমুখী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। তারা চাইছে ২০১৮ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন সংকট সৃষ্টি করা, যাতে ভারত ও চীনের সঙ্গে বর্তমান সরকারের পরম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। গত আগস্ট মাসের ঘটনার পর বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষ, তাদের সমর্থনকারী বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া ও পেশাজীবীদের প্রতিক্রিয়া ও কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে ওই ষড়যন্ত্রের চেহারাটি স্পষ্ট হয়ে যায়। বর্তমান সরকারের সুবিধাভোগী কিছু ব্যক্তি ও মিডিয়াকেও একই সঙ্গে ওই ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে চীন ও ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত হয়েছি। তারা সাময়িক উত্তেজনায় সব কিছু ক্ষুদ্র গণ্ডিতে দেখার চেষ্টা করেছে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের উসকানি বুঝতে তারা ব্যর্থ। এদের দু-একজনকে এমন কথাও বলতে শুনেছি যে আমাদের বন্ধু পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে। এরা ভুলে যায় বন্ধু পরিবর্তন করা যেতে পারে, প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না। ভৌগোলিক অবস্থান, জনসম্পদ এবং গত কয়েক বছরের টানা অগ্রগতিতে সম্ভাবনার বিশাল দ্বার উন্মোচিত হওয়ায় বিশ্বশক্তি বলয়ের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার ফ্রন্ট লাইনে আছে বাংলাদেশ। এটি একদিকে যেমন আমাদের জন্য বড় সুযোগ, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জ। এর গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হলে এবং কোনো পক্ষের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের ঘুঁটি হয়ে গেলে, তা বাংলাদেশের জন্য মহা সর্বনাশ ডেকে আনবে।

বাংলাদেশের জন্য ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাগুলো কী সেটি আমাদের বুঝতে হবে। বর্তমান উন্নয়ন ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে এবং বাংলাদেশকে একটা উদার গণতান্ত্রিক ও পরিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক জঙ্গিমুক্ত রাষ্ট্র করতে চাইলে চীন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। নতজানু নীতি নয়, ওই তিন প্রতিবেশীর জন্য বাংলাদেশের বন্ধুত্বেরও অপরিহার্যতা রয়েছে। তাই পারস্পরিক অপরিহার্যতা বজায় রাখার কৌশল অবলম্বন করতে পারাটাই হলো আমাদের চ্যালেঞ্জ। একাত্তরের পরাজিত রাষ্ট্রটি প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহায় এবং যে বৃহৎ শক্তি আমাদের ব্যবহার করতে চায় নিজেদের স্বার্থে, তারা বহুদিন ধরে নানা কৌশলে উল্লিখিত পারস্পরিক অপরিহার্যতাকে বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে। এবার রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বহু উসকানি সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সব পক্ষের ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত চীন, ভারত বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রথম দিকে এই দুই বন্ধু রাষ্ট্রের ভূমিকা ও কৌশল সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দেয়। মিয়ানমারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে সমস্যা সমাধান করার চ্যালেঞ্জ অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে শেখ হাসিনা গ্রহণ করেছেন| BBIN, BCIM এবং BIMSTEC-এর গুরুত্ব তিনি বোঝেন। তাই ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিবলয়ের সমীকরণে বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও চীন, ভারত, রাশিয়া, জাপন ও যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়নের সহযোগী করতে পেরেছেন। এটা মোটেও সহজ কথা নয়। শেখ হাসিনার আগে এটি কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বঙ্গবন্ধু এর গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। এ কারণেই তিনি তখন ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন বলয়ের সঙ্গে সুগভীর মিত্রতার বন্ধন রক্ষা করেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক  উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন। অনেক ভেবেচিন্তে ১৯৭৪ সালে ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য পাকিস্তানে গিয়েছেন। কিন্তু সব কিছু গুছিয়ে আনার সময় তিনি পাননি। গত আট-নয় বছর ধরে রাষ্ট্রের সব সেক্টরে একটানা অগ্রগতির ফলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনার সৃষ্টি এবং বিশ্ব অঙ্গনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কোচিত ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের নিজস্ব শক্তি ও সম্ভাবনা না থাকলে এটি সম্ভব হয় না। একটি উদ্ধৃতি দিই। `Foreign relation is not a gift that will be bestowed upon us by Heaven or by any earthly powers, but can only be the fruit of a development of our inner forces. We must first root out the causes wihch led to our Collapse and we must eliminate all those Who are profiting by that Collapse.` (মইন ক্যাম্প, অ্যাডলফ হিটলার, পৃ-৫২৭)। হিটলার বিশ্বে একজন ঘৃণিত ও প্রত্যাখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু এই উদ্ধৃতিটি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। ১৯৭৫ সালের পরে বাংলাদেশ যেভাবে কল্যাপস (ভেঙে পড়া) করেছিল এবং সেই ভেঙে পড়ার সুযোগে যেসব দেশি-বিদেশি শক্তি লাভবান হয়েছে তাদের দুর্গ ভেদ করে গত আট-নয় বছর শেখ হাসিনা রাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী জায়গায় দাঁড় করাতে পেরেছেন বলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বশক্তির কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, যে কথা একটু আগেও উল্লেখ করেছি। কিন্তু আমরা দেখছি, সেই পুরনো শত্রুরা এখনো সক্রিয় আছে। দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু রাজনৈতিক শক্তি এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রোহিঙ্গা সংকটকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এই দুরভিসন্ধি বাংলাদেশের মানুষকে বুঝতে হবে এবং ওই সব অপশক্তির সব অপচেষ্টাকে নস্যাৎ করার জন্য যে যেভাবে পারে সেভাবেই সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। এটাই আজ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার (Compulsions) মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে এই তিন রাষ্ট্রের পারস্পরিক নির্ভরতার জায়গাগুলো একদম অনুপেক্ষীয় এবং তাতে মাঝখানে থাকায় বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। তবে এই সুবিধা চ্যালেঞ্জবিহীন নয়। চ্যালেঞ্জের সঠিক মূল্যায়ন এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারাটাই বড় কথা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তী সময় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের লিগ্যাসি ভারত-বাংলাদেশ উভয়ের জন্য এখনো ভূ-রাজনীতির অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সুতরাং পাকিস্তান ও চীনের বিপরীতে ভারসাম্য রক্ষার জায়গা থেকে হিসাব করলে বোঝা যায় ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতের জন্য বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা অপরিহার্য। ঠিক একইভাবে ঐতিহাসিক লিগ্যাসি এবং সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক বন্ধন তো রয়েছেই, সর্বোপরি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্যও অপরিহার্য।

ধর্মীয় উগ্রবাদী জঙ্গি সন্ত্রাসীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে একটি উদার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে চাইলে ভারতের সহযোগিতা ছাড়া তা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতির হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তবে উপমহাদেশকেন্দ্রিক যেকোনো ইস্যুতে ভারত-মার্কিন অক্ষের মধ্যে ভারতই শেষ কথা বলার জায়গায় আছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাপক হারে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য। এর জন্য চীনের বিনিয়োগ ও সহযোগিতার ভালো বিকল্প বাংলাদেশের সামনে নেই। সুতরাং এই সময়ে চীনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একান্ত প্রয়োজন। তবে এটা একতরফা, এমন ভাবার কারণ নেই। চীন যেসব ভূ-রাজনৈতিক কারণে মিয়ানমারের ওপর একক কর্তৃত্ব ও প্রভাব প্রতিষ্ঠায় মরিয়া, সেই অপরিহার্যতা বহুলাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যদি বাংলাদেশ ভিন্ন অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ চীনের জন্য মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমার কাছে কখনো কখনো মনে হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সর্প হয়ে দংশন, আর ওঝা হয়ে ঝাড়ার কৌশল চীন গ্রহণ করেছে কি না। এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এ পর্যন্ত যতটুকু অগ্রগতি, তা সম্ভব হয়েছে চীনের নেপথ্যের ভূমিকার কারণে।

স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছরে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুই রকম দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা গেছে। প্রায় ২৮ বছর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধী পক্ষ ক্ষমতায় থাকাকালে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির নীতি অনুসরণের কারণে দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে কখনো মসৃণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং তার কারণেই আন্তর্দেশীয় সমস্যার কোনো একটিরও সমাধান তো হয়ইনি, বরং সেগুলো আরো জটিল হয়েছে। অন্যদিকে ২০০৯ থেকে বিগত ৯ বছরসহ প্রায় ১৮ বছর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকাকালে অসাম্প্রদায়িক ও উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির নীতি গ্রহণ এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত নয়, পারস্পরিক বন্ধুত্ব রক্ষার নীতিতে অটল থাকায় ভারত-মিয়ানমার উভয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত প্রায় সব বড় সমস্যার সমাধান হয়েছে, রোহিঙ্গা সমস্যা ছাড়া। তাই আগামী দিনেও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে উদার অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির নীতিতে অটল থাকতে হবে। চ্যালেঞ্জ আছে, আগামীতেও আসবে। অভ্যন্তরীণভাবে আমরা শক্তিশালী হলে সংঘাত-সংঘর্ষের প্রয়োজন পড়বে না। শান্তিপূর্ণভাবেই সব সমস্যার সমাধান করা যাবে।

 

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com

 


মন্তব্য