kalerkantho


কোরীয় উপদ্বীপ এবং কিমের পরমাণু কর্মসূচি

চোই সাং-হুন

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কোরীয় উপদ্বীপ এবং কিমের পরমাণু কর্মসূচি

আগামী মাসে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য শীতকালীন অলিম্পিকসে প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রস্তাব করেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন। উদ্দেশ্য রাষ্ট্রীয় বিচ্ছিন্নতা কমানো। গত সোমবার তিনি এ দাবিও করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে তাঁর দেশ।

পারমাণবিক হুমকি ও কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা হ্রাসের উদ্যোগের মাধ্যমে কিম আসলে অলিম্পিকসে অংশগ্রহণের বিষয়ে দ্রুত সংলাপে বসতে চান। যদি তা হয় তাহলে সেটি হবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইনের অভিষেকের পর দুই কোরিয়ার মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক সংলাপ। মুনের আগ্রহ রয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের হুমকির পরও তিনি সংলাপের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে কিম জং-উন বলেন, তিনি প্রতিনিধি (অলিম্পিকসে) পাঠাতে চান। দক্ষিণ কোরিয়া সফলভাবে আয়োজন সম্পন্ন করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, উত্তর ও দক্ষিণ—কারো এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যায়। এ কথা বলতেও ভোলেননি তিনি—তাঁর অফিসকক্ষে হাতের কাছেই ‘নিউক্লিয়ার বাটন’ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড তাঁদের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে।

একই রকমের দাবি গত ২৭ নভেম্বরও করেছিল উত্তর কোরিয়া। তারা আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল সেদিন। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে পৌঁছতে সক্ষম সেই ক্ষেপণাস্ত্র। তবে ওই ক্ষেপণাস্ত্রের নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড বায়ুমণ্ডলে পৌঁছার পরও সতেজ থাকবে কি না এবং এত দূরের লক্ষ্যে ঠিকমতো পৌঁছতে পারবে কি না সে ব্যাপারে সংশয় রয়েছে।

সোমবারের ভাষণে কিম আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, উত্তর কোরিয়া দক্ষ একটি ‘পরমাণুবাহিনী’ গড়ে তুলেছে। কোরীয় উপদ্বীপে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ শুরুর উদ্যোগকে প্রতিহত করবে এ বাহিনী। তাঁর সরকার নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড ও রকেট উৎপাদনের প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করবে।

নতুন বছরের জন্য উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির মূল্যায়ন করে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি-বেসরকারি বিশ্লেষকরা সম্প্রতি বলেছেন, ‘পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ পূরণ হয়েছে, এ দাবি করলেও উত্তর কোরিয়া আরো উত্কর্ষ সাধনের লক্ষ্যে পারমাণবিক ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আরো পরীক্ষা চালাবে। একই সঙ্গে পারমাণবিক জুজুর ভয় দেখিয়ে অবরোধজনিত চাপ কমানো এবং কিছু ব্যাপারে রেয়াত পাওয়ার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার চেষ্টা করবে তারা।

প্রসঙ্গত, গত বছর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার ওপর চার দফা অবরোধ আরোপ করে। কয়লা, আকরিক লোহা ও সামুদ্রিক পণ্যের রপ্তানি নিষিদ্ধ করা এবং বিদেশে উত্তর কোরীয় কর্মীদের কর্মসংস্থান বন্ধ করার জন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অবরোধ প্রস্তাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে উত্তর কোরিয়ায় পরিশোধিত তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর কথাও বলা হয়। এসবের ফলে গত বছর দেশটিতে গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। এ বছর তাদের যন্ত্রণা আরো বাড়বে।

সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন। উত্তেজনা প্রশমনের উদ্দেশ্যে শীতকালীন অলিম্পিকসে অংশগ্রহণের জন্য উত্তর কোরিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত মাসে তিনি এমন প্রস্তাবও দিয়েছেন যে উত্তর কোরিয়া অস্ত্র পরীক্ষা স্থগিত করলে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ সামরিক মহড়া বাতিল করা হবে।

প্রেসিডেন্ট মুন শীতকালীন অলিম্পিকসের সময়ে পারমাণবিক উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নিতে চান এবং এর ধারাবাহিকতায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চান। বিশ্লেষকদের অভিমত, উত্তর কোরিয়া আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তার ‘পরমাণুবাহিনী’কে সংহত করেছে। অতএব, এখন তারা সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি স্থগিত করার ব্যাপারে নমনীয়তা দেখাতে পারে এবং সমঝোতার আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে উত্তর কোরিয়া ‘পরমাণু শক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করতে পারে। স্বীকৃতির পর তারা অস্ত্রহ্রাসকরণ বিষয়ক আলোচনা শুরু করতে চাইবে, যাতে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ছাড় আদায় করা যায়। যেমন অবরোধ শিথিল করা বা কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর দাবি জানাতে পারে তারা। বিনিময়ে তারা আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত বা বন্ধ করে দিতে পারে। তবে পারমাণবিক সক্ষমতার অন্যান্য বিষয় নিজের কাছেই রেখে দেবে উত্তর কোরিয়া।

২০১৭ সালে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে উত্তর কোরিয়ার অর্জন ব্যাপক। সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখে ষষ্ঠ পরীক্ষায় হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় দেশটি। এটাই তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক পরীক্ষা। তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও চালিয়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের যেকোনো জায়গায় এগুলোকে পৌঁছে দিতে সক্ষম রকেট রয়েছে তাদের। আলোচনার শর্ত কী হবে বলা কঠিন, তবে উত্তর কোরিয়ার সব ধরনের পারমাণবিক অস্ত্রের নিষ্ক্রিয়করণ চায় ওয়াশিংটন এবং তার মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান।

লেখক : নিউ ইয়র্ক টাইমসের কোরিয়া প্রতিনিধি

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক


মন্তব্য