kalerkantho


প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জটিল সমীকরণ

মাছুম বিল্লাহ

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জটিল সমীকরণ

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ‘মরি মরি’ অবস্থা থেকে আজ একটা অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে বটে; কিন্তু সার্বিক অবস্থা এখনো খুব একটা ভালো নয়। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে কোনো বেতনবৈষম্য ছিল না। সে বছরই প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেলে এক ধাপ পার্থক্য তৈরি হয়। সংগত কারণেই সেটি সহকারী শিক্ষকরা মেনে নিয়েছিলেন; কিন্তু এই পার্থক্য ২০০৬ সালে এসে তৈরি হয় দুই ধাপে। এরপর ২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হলে এই পার্থক্য এসে দাঁড়াল তিন ধাপে। বর্তমানে প্রধান শিক্ষকরা বেতন পান একাদশতম গ্রেডে আর সহকারী শিক্ষকরা ১৪তম গ্রেডে। এদিকে দ্বিতীয় শ্রেণির অন্যান্য বিভাগে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁরা দশম গ্রেডে বেতন পান, তাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদেরও দশম গ্রেডে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। বিষয়টির যুক্তিসংগত কারণ শিক্ষা বিভাগে চাকরি করেন বলে কেন তাঁরা অন্যান্য বিভাগ থেকে পিছিয়ে থাকবেন, তাই মন্ত্রণালয় এটিকে দশম গ্রেডে উন্নীত করার চিন্তা করছে। অবশ্যই খুশির সংবাদ, আনন্দের সংবাদ; কিন্তু বিষয়টি সহকারী শিক্ষকদের চাপা ক্ষোভে ঘি ঢেলেছে।

আসলে প্রাথমিক শিক্ষার পুরো বিষয়টিকে আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি না একেবারেই। এক এক সময় এক এক স্রোতের কারণে, রাজনৈতিক কারণে এক একটি ঘোষণা আমরা দিয়ে ফেলি, তার পরে কি হবে বা না হবে, বিষয়টি কতটা যৌক্তিক—এসব নিয়ে চিন্তা করি না। তাই কোনো সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সমস্যা আরো বেড়ে যায়। আমরা যদি দেশের প্রকৃত কল্যাণ চাই তাহলে প্রাথমিক শিক্ষাকে একেবারে একটি আদর্শ শিক্ষা বিভাগে রূপান্তর করতে হবে।

দেশে ৬৪ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। বিদ্যালয়গুলো যদিও বিল্ডিং কিংবা ভালো একটি টিনের ঘরে প্রতিষ্ঠিত এবং খেলার মাঠ আছে; কিন্তু এগুলোর যথাযথ ব্যবহার নেই। ক্লাসরুমগুলো কোনোভাবেই শিশুবান্ধব নয়, কোনোভাবেই এগুলো বাচ্চাদের আকর্ষণ করে না। দায়সারাগোছের প্রাথমিক শিক্ষা। তার মধ্যে তিন ভাগের এক ভাগ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই থাকেন মাতৃত্বজনিত ছুটিতে, সহকারী শিক্ষক যাঁরা তাঁরা বেশির ভাগ সময়ই অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকেন। কোথাও কোথাও একজন শিক্ষক কয়েকটি ক্লাস একত্র করে ক্লাস পরিচালনা করেন, কোথাও কোথাও দু-একটি ক্লাস করার পরই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। সহকারী শিক্ষকরা ভোটার তালিকা, উপবৃত্তির কাজ, পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা গণনা করাসহ বহু ধরনের কাজ করে থাকেন। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে কী পড়ানো হয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে।

এগুলো যেনতেনভাবে চললে হবে না, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা হতে হবে সবচেয়ে মজবুত, সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এখানে রাষ্ট্রের খেয়াল থাকতে হবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা দেখলে মনে হয় যে সরকার যেন ধরেই নিয়েছে অবস্থাপন্ন বা সচেতন নাগরিকদের সন্তানরা কিন্ডারগার্টেন কিংবা ব্যক্তিপর্যায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে আর যারা অবহেলিত বা দরিদ্র পরিবারের সন্তান তারা পড়বে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাই সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে যা হচ্ছে তা নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা নেই।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো হতে হবে শিশুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সে জন্য বিদ্যালয়গৃহে থাকবে খেলাধুলার সামগ্রী, আকর্ষণীয় শিক্ষাবিষয়ক ছবি ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী। তা না করে প্রাথমিক শিক্ষা যে যেভাবে পারে চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা হলে চলবে না। এখানে প্রয়োজন গভীর মনোযোগের। প্রাথমিকের একজন শিক্ষক হবেন আদর্শবান। চমত্কার এক মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে তাঁদের নির্বাচিত করতে হবে। তারপর নিবিড় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রকৃত শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিকের একজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাবেন দেশে-বিদেশে। তিনি প্রধান শিক্ষক হবেন, মাধ্যমিকের শিক্ষক হবেন, কলেজের শিক্ষক হবেন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষা কর্মকর্তা হবেন, শিক্ষা বিভাগের পরিচালক, মহাপরিচালক হবেন। এসব বিষয়ে আমরা খেয়াল করি না একেবারই।

প্রধান শিক্ষকের পদটি যদি প্রকৃত পরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের উল্লেখ করে নেওয়া হতো তাহলে কিন্তু এত ঝামেলা থাকত না। সহকারী শিক্ষকরাও মেনে নিতেন। আবার সহকারী শিক্ষকরা যদি দেখতেন যে তাঁরাও একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে প্রধান শিক্ষক হবেন এবং তখন তাঁরা ওই ধরনের স্ট্যাটাস ও বেতন স্কেল প্রাপ্য হবেন, তাহলে কিন্তু তাঁরা আন্দোলনের চিন্তা করতেন না। তাঁরা বিষয়গুলো নিয়ে বারবার শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন; কিন্তু কেউ তাতে কর্ণপাত করেননি। আমাদের দেশের বিষয়গুলোতে এমনিই হয়। তাই রবিঠাকুর বলেছিলেন, ‘সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করিতে কাহারও মনে পড়ে না, পরে বেঠিক সময়ে বেঠিক সিদ্ধান্ত লইয়া হাতরাইয়া মরি।’

আমরা আবারও সরকারকে অনুরোধ করছি, প্রাথমিক শিক্ষার দিকে গভীরভাবে মনোনিবেশ করুন। জাতিকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিন। প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের পদ প্রথম গ্রেডে উন্নীত করুন, সহকারী শিক্ষকদের দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীত করুন প্রকৃত মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে। তাঁদের নির্বাচন প্রক্রিয়া আরো অর্থবহ করুন। তাঁদের কোয়ালিফিকেশন নির্দিষ্ট করুন, ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন। বর্তমানের প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোকে আদর্শ শিক্ষক প্রশিক্ষণের আলয়ে পরিণত করুন। প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর একই পদ থেকে যেন অবসরে যেতে না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দিন। তাঁদের জন্য সুযোগ অবারিত রাখুন। তাহলে আমরা মেধাবীদের প্রাথমিক শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে পারব এবং জাতিকে একটি সুন্দর ও সুস্থ প্রাথমিক শিক্ষা উপহার দিতে পারব। বিষয়টি সরকারের একার পক্ষে সম্ভব না হলে বেসরকারি পর্যায়কেও এই কাজে অন্তর্ভুক্ত করুন অর্থবহভাবে।

 লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত, সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

masumbillah65@gmail.com


মন্তব্য