kalerkantho


কালান্তরের কড়চা

নতুন বছরে কোন দিকে মোড় নেবে রাজনীতি

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নতুন বছরে কোন দিকে মোড় নেবে রাজনীতি

লন্ডনের এক হাসপাতালে দীর্ঘ এক মাস রোগশয্যায় শুয়ে ভাবতাম, ২০১৮ সাল দর্শন আমার কপালে নেই। হয়তো ২০১৭ সালই আমার জীবনের অন্তিম বছর। কিন্তু ভাগ্যগুণে বা আয়ুর জোরে এবারও বেঁচে উঠেছি। কয় দিন থাকব জানি না, আমার বয়সী বেশির ভাগ সঙ্গী-সাথি কবে বিদায় নিয়েছেন। আমারও এখন যাওয়ার পালা। তবু ২০১৮ সালের নতুন ভোরের নতুন সূর্যের যে সাক্ষাৎ পেলাম, তাতেই আমি আনন্দিত। প্রার্থনা করি, আমার লেখার সব পাঠকের জীবনে এই খ্রিস্টীয় নতুন বছরের আনন্দের ছোঁয়া লাগুক, এ বছর তাদের জীবন সুখ ও শান্তিময় হোক।

কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘কোথাও সান্ত্বনা নেই পৃথিবীতে শান্তি নেই আজ।’ এ কথাটা এ যুগের জন্য আজ আরো বেশি সত্য। গোটা বছর যে হত্যা, আগ্রাসন, ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে পৃথিবীজুড়ে, তার তুলনা বিরল। নতুন বছরটি কি সেই অগ্নিদাহ থেকে মুক্ত হয়ে একটি শান্ত ও সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে? এই প্রশ্নই আজ সবার মতো আমার মনেও জাগছে। ঘরের কথা দিয়েই শুরু করি, বছরের শেষ দিকে আমার কাছে বড় খবর ছিল দুই মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রয়াণ। একজন চট্টগ্রাম শার্দুল মহিউদ্দিন চৌধুরী, যাঁকে বলা হতো চট্টলার জনগণমন অধিনায়ক। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। আমি তাঁকে চিনতাম, চট্টগ্রামে বহুবার তাঁর আতিথ্য নিয়েছি। চট্টগ্রামের মানুষের মনে তাঁর যে বিরাট আসন পাতা তার প্রমাণ মিলেছে তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে। দুঃখজনক হলো তাঁর কুলখানিতে পদপিষ্ট হয়ে ১০ ব্যক্তির মৃত্যু। এই মৃত্যু রোখা যেত, যদি এই কুলখানির উদ্যোক্তা আগেভাগে একটু সতর্ক হতেন। জনতাকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সম্পর্কে সজাগ থাকতেন।

আরেকজন মহিউদ্দিন চৌধুরীর কথা বলব, তিনি চট্টল শার্দুলের মতো বিখ্যাত কেউ নন। কিন্তু একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। ছিলেন সাংবাদিক ও কূটনীতিক। লন্ডনে শেষ জীবনটা কাটিয়েছেন। গত নভেম্বর মাসের গোড়ার দিকে আমি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাই, তখন ম্যানচেস্টার থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। তাঁর লেখা স্মৃতিকথা ‘কাপুরুষের জবানবন্দি’ বইটিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা তথ্য রয়েছে। লেখাটি লন্ডনের একটি বাংলা সাপ্তাহিকে ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হচ্ছিল। তিনি শেষ করে যেতে পারেননি, লেখাটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলে অনেকেই বিদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালের অনেক অজানা তথ্য জানতে পারতেন।

আমি গত বছরকে স্মরণ করতে গিয়ে দেশ-বিদেশের বড় বড় ঘটনার কথা উল্লেখ করছি না। যেমন ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে বসে বিশ্বশান্তির জন্য সংকট সৃষ্টি, লন্ডনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ব্রেক্সিট সমস্যা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুলকালাম, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা ইত্যাদি কোনো কিছুই এই আলোচনায় আনছি না। কারণ তা এর মধ্যেই দেশ-বিদেশের দৈনিকে সালতামামি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। আমি আমার ঘরের কিছু ঘরোয়া কথা দিয়েই বিদায়ী বছরকে স্মরণ করছি। ২০১৮ সালের প্রথম ভোরে একটি ভাবনাই ভাবছি, এই নতুন বছরে পৃথিবী কি সন্ত্রাস ও আধিপত্যবাদের দানবমুক্ত হবে, না মানবতা ও শান্তির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে! হাসপাতালে রোগশয্যায় শুয়েই জানতে পারি, রংপুর সিটির মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাতীয় পার্টির প্রার্থীর কাছে লক্ষাধিক ভোটে হেরে গেছেন। আওয়ামী প্রার্থীর এই পরাজয়ে বিস্মিত হইনি। কারণ রংপুর এরশাদ সাহেবের শক্ত ঘাঁটি। বিস্মিত হয়েছি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লক্ষাধিক ভোটে পরাজয়ের কথা শুনে। এত ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের তো পরাজয়ের কথা নয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এই নির্বাচনকে বলেছেন ‘গণতন্ত্রের বিজয়’। তাঁর এই বক্তব্য সঠিক। প্রমাণিত হয়েছে দেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে এবং রংপুরে তা হয়েছে। কিন্তু রংপুরে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ থেকে আওয়ামী লীগের শিক্ষা গ্রহণের রয়েছে। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক দল, জাতীয় পার্টির ভূমিকা এখন যাই হোক তারা একটি স্বৈরতান্ত্রিক দল হিসেবে জন্ম নেয়। রংপুরে গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে লড়াইয়ে মানুষ কেন স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকবে! এখানে দলের ও প্রার্থীর গাফিলতির কথা ওঠে। এই নির্বাচন প্রমাণ করে রংপুরের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক মেয়র জনগণের আস্থাভাজন ছিলেন না এবং আওয়ামী লীগও দল হিসেবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। রংপুরের এই চিত্র যদি আমরা দেশের সাধারণ চিত্র হিসেবে দেখি তাহলে আওয়ামী লীগ রাজনীতি ও দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতি সম্পর্কে ভাবিত হওয়ার কারণ আছে।

সামনেই ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র নির্বাচন। জনপ্রিয় মেয়র আনিসুল হকের আকস্মিক মৃত্যুতে এই পদ শূন্য হয়েছে। এটা আওয়ামী লীগের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যোগ্য ও জনগণের আস্থাভাজন প্রার্থী দিতে না পারলে আওয়ামী লীগকে কঠিন সমস্যায় পড়তে হবে। বিএনপি এখানে জোর লড়াইয়ে নামবে, সম্ভবত একজন বহুরূপী ব্যবসায়ীর ছেলে এখানে বিএনপির প্রার্থী হবেন। জাতীয় পার্টিও এখানে লড়াই থেকে বিরত থাকছে না। রংপুরের বিজয়ে এরশাদ সাহেব উৎসাহিত হয়েছেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগকে শুধু যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দিলেই চলবে না, আওয়ামী লীগকে তার সাংগঠনিক শক্তিরও পরিচয় দিতে হবে। লন্ডনে বসে শুনতে পেয়েছি, আতিকুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে পারেন। আমি তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত, ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত নই। তিনি জনগণের কাছে কতটা আস্থাভাজন তা আমি জানি না। কিন্তু একজন কর্মঠ ও সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনে বিজয়ী করে আনতে হলে তাঁকে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থিত করতে হবে এবং আওয়ামী লীগকেও তার সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় দিতে হবে। দেশের অনেক বন্ধুবান্ধবের মুখে একটা কথা শুনি, হাসিনা সরকার জনপ্রিয়; কিন্তু ক্ষমতাসীন দল জনপ্রিয় নয়। আওয়ামী লীগকে এই অবস্থার কারণটি খুঁজে বের করতে হবে। দলটিকে জনগণের আস্থা আবার অর্জন করতে হবে। নইলে আগামী নির্বাচনে শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারিশমা ও জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সহজ হবে না।

রোগশয্যায় শুয়ে যখন নিজের বাঁচা-মরার কথা ভাবছি, তখন একটি খবর শুনে খুব মজা পেয়েছি। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘আপনারা ঘুষ খান তবে একটু কম খান, মন্ত্রীরাও চোর, আমিও চোর।’ শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য শুনে আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির নেতা ও মন্ত্রীর মধ্যে দারুণ হৈচৈ পড়েছে। কেউ কেউ তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন এবং শিক্ষামন্ত্রীকে একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমি হলে কোনো ব্যাখ্যা দিতাম না। শিক্ষামন্ত্রী কাউকে ঘুষখোর বা চোর বলতে চাননি। দেশের সর্বস্তরে যে ঘুষ ও দুর্নীতির রাজত্ব চলছে তার লাগাম টেনে ধরার জন্য নিজেকে তাঁর সঙ্গে যুক্ত করে একটা সাধারণ প্রতীকী কথা বলেছেন। তা শুনে ‘ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাই না’ গোছের প্রতিক্রিয়া কোনো মহলেই হওয়া কাম্য নয়।

বর্তমান সরকারের বহু মন্ত্রী ও এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু অভিযোগ আছে। আবার তাঁদের মধ্যে অনেকে সৎ ও নীতিপরায়ণ। কিন্তু অসৎ ব্যক্তিদের উপদ্রবে তাঁদের সুনামও ঢাকা পড়ে গেছে। এ অবস্থায় একজন মন্ত্রী যদি অন্যকে উপদেশ দিতে গিয়ে আত্মসমালোচনামূলক কথা বলেন, তাহলে তাঁকে বলির পাঁঠা করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। আমাদের মহানবী (দ.)-র কাছে একবার এক ব্যক্তি এসে বলল, হুজুর, আমার ছেলেটা বড় বেশি মিষ্টি খায়, আপনি তাকে একটি উপদেশ দিন যেন সে তা বেশি না খায়। মহানবী (দ.) তাকে বললেন, তোমার ছেলেকে নিয়ে দুই দিন পরে এসো। লোকটি দুই দিন পর এলো এবং মহানবী (দ.) তার ছেলেকে বেশি মিষ্টি খাওয়ার অপকারিতা বুঝিয়ে বললেন। লোকটি মহানবীকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি আমার ছেলেকে দুই দিন আগে যে কথা বলতে পারতেন তা দুই দিন পরে বললেন কেন? মহানবী জবাব দিলেন, আমি নিজেও বেশি মিষ্টি খাই, সুতরাং আমি যা করি, তা না করার জন্য অন্যকে উপদেশ দিতে পারি না। সে জন্য গত দুই দিন আমি মিষ্টি খাইনি। এখন তাই তোমার ছেলেকে উপদেশ দিতে পারি। এই নজিরটি মনে রাখলে শিক্ষামন্ত্রীর উক্তির জন্য আমাদের বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ থাকে না।

দেশের রাজনীতির কথায় আসি, বিশ্বের রাজনীতি খুব একটা ভালো দিকে মোড় নিচ্ছে না। জেরুজালেম নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হঠকারিতা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে না পারলে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে। পরমাণুু বোমাসংক্রান্ত বিষয়ে উত্তর কোরিয়া ও ইরানকে আমেরিকা শায়েস্তা করতে চাইলে তা বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের অশুভ আঁতাতের বিপজ্জনক প্রক্রিয়া বাংলাদেশ পর্যন্ত গড়াতে পারে। এই বিশ্ব পরিস্থিতির মুখে বাংলাদেশে একটি সাধারণ নির্বাচন দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। বিএনপি এখন মুখে যাই বলুক, এই নির্বাচনে তাদের অংশ নিতেই হবে। নইলে দলটির অস্তিত্ব থাকবে না। বিএনপির জনপ্রিয়তা নেই, সংগঠনশক্তিও নেই। তারা আওয়ামী লীগবিরোধী প্রটেস্ট ভোটের ওপর নির্ভর করে আশা করছে নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হবে। আওয়ামী লীগ নেতারা তা নিয়ে উপহাস করতে পারেন, কিন্তু তা ছোট করে দেখা ঠিক হবে না। আওয়ামী লীগের যেটা বড় দুর্বলতা তা হচ্ছে দলে বিপুলভাবে সুবিধাবাদীর অনুপ্রবেশ এবং দলটির প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করা, সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করে ফেলা। এই অবস্থা থেকে অবিলম্বে দলটিকে মুক্ত করতে হবে। শেখ হাসিনা এবার নির্বাচনে জয়লাভের জন্য যোগ্য প্রার্থী মনোনয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন। কিন্তু এবার যোগ্য প্রার্থী দেওয়া হলেও তাঁদের জয়লাভের জন্য সাংগঠনিক শক্তি দরকার হবে। আওয়ামী লীগ জনগণের দল। জনগণের সমর্থনেই দলটি ক্ষমতায় আসে। কোনো ষড়যন্ত্র বা ক্যু করে নয়। সুতরাং জনগণের সমর্থনে ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে দলের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার বাস্তব কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। ২০১৮ সালে বিশ্বপরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা এখন বলা মুশকিল। বিশ্বপরিস্থিতি ভালোর দিকে মোড় নেবে, না আরো খারাপের দিকে এগোবে তা এ মুহূর্তে বলা যাবে না। তবে আশাবাদীরা মনে করেন, বিশ্বপরিস্থিতিতে একটা আকস্মিক শুভ পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ট্রাম্পের যুদ্ধবাদী নীতি পরাস্ত হবে, মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের আঁতাত আরবদের প্রতিরোধের সম্মুখীন করবে।

মিয়ানমারের জঙ্গি শাসকদের রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হতে হবে। বাংলাদেশে বিএনপি ও জামায়াতের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং একটি তথাকথিত সুধীসমাজের হঠকারিতা ব্যর্থ করে আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। নতুন বছরে এটাই আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনা। সবার সঙ্গে তা মিলবে কি না জানি না।

লন্ডন, সোমবার, ১ জানুয়ারি ২০১৮

 


মন্তব্য