kalerkantho


নতুন বছরে অর্থনীতির প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

ড. আতিউর রহমান

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নতুন বছরে অর্থনীতির প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

ভালো-মন্দ মিলেই পার করলাম ২০১৭ সাল। সমাজ ও রাজনীতি স্থিতিশীল থাকায় ভালোভাবেই উতরে গেছে বছরটির অর্থনীতি। প্রাকৃতিক ও মানুষের তৈরি—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জই মোকাবেলা করে এগিয়েছে অর্থনীতি। এপ্রিল-মে মাসে হাওর অঞ্চলে আচমকা বন্যা এবং তার পরপরই আগস্ট মাসে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে গড়পড়তার চেয়ে বেশি হারে বন্যায় ছয় লাখ হেক্টরের বেশি জমির আমন ফসল বিনষ্ট হয়ে যায়। তা ছাড়া অর্থবছর ১৬-তে চাল আমদানিরও ১০ শতাংশ এবং তা পরের অর্থবছরে মোট ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিধান রাখা হয়। সব মিলে প্রকট সরবরাহ ঘাটতির কারণে গেল বছর মোটা চালের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। ২০১৬ সালের জুনে এক কেজি মোটা চালের দাম ছিল ২৮ টাকা। পরের জুনে তা ৪৫.৬ টাকায় উঠে যায়। এর কয়েক মাস পর তা ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। সরকার চালের ওপর আরোপিত শুল্ক দ্রুত তুলে ব্যক্তি খাতের আমদানিকারকদের আমদানির সুযোগ করে দিলেও চালের দাম এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। গেল বছর হঠাৎ করেই ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে চলে আসে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ মানবিকতার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়ে এই অসহায় মানুষগুলোকে আশ্রয় দিয়েছে। এর চাপ স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর বেশ ভালোভাবেই পড়েছে।

এ দুটি বড় চ্যালেঞ্জ ছাড়াও গেল বছরের অর্থনীতিতে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহে মন্থরগতি এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও ভাটার টানের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গেল বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কিন্তু বেশ চাঙ্গাই ছিল। অর্থবছর ১৭ শেষে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.২৮ শতাংশ হয়েছে। আশা করা যায়, প্রবৃদ্ধির এই ধারা চলতি অর্থবছরেও অবিচল থাকবে। বাড়তি নির্বাচনী খরচের কারণে প্রবৃদ্ধির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। শুধু ভয় মূল্যস্ফীতির। সমকালীন এই বাস্তবতায় আসুন আমরা গেল বছরের অর্থনীতির মূল সূচকগুলোর দিকে নজর দিই।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি : আগেই উল্লেখ করেছি গেল অর্থবছরে জিডিপি বেড়েছে ৭.২৮ শতাংশ হারে। বন্যার প্রভাব এতে পড়েনি। তবে চলতি অর্থবছরে তা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নতুন বছরের প্রথমার্ধে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বোরো ফসলের উৎপাদন গড়পড়তার চেয়ে আরো বেশি করা, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের দিকে বেশি করে নজর দিয়ে রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো বেশি করে আনুষ্ঠানিক পথে আনার কার্যকর উদ্যোগ সরকার ও সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে। সার্ভিস খাতের গতি আরো বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারের জন্য সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর পাশাপাশি অতি দ্রুত ‘ফোরজি’ মোবাইল সেবা চালুর উদ্যোগ নিলে এর ইতিবাচক প্রভাব ই-কমার্স ও অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়বে। চলতি অর্থবছরের প্রথমাংশে সরকারি বিনিয়োগ ও খরচ বাড়ন্ত ছিল। সরকারি খরচের প্রবৃদ্ধির এই ধারা যদি নতুন বছরেও অক্ষুণ্ন থাকে, তাহলে এর ইতিবাচক প্রভাব সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের ওপর পড়তে বাধ্য। এসব বিচার করেই আমরা বলতে পারি যে চলতি অর্থবছর শেষে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার সপ্তম-পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রক্ষেপণ মতোই ৭.৪ শতাংশের আশপাশেই থাকবে। কৃষি, শিল্প ও সেবা—তিন খাতেই প্রবৃদ্ধির হার বাড়ন্ত থাকবে বলে আশা করছি। পুঁজি পাচার হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও এই পুঁজি আমদানির বড় অংশ যদি সত্যি সত্যি দেশে আসে, তাহলে এ বছর আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা চাঙ্গাই থাকবে বলে মনে হয়। বিশ্বব্যাংক খানিকটা সন্দিহান থাকলেও আইএমএফ চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ প্রক্ষেপণ করেছে। ব্যক্তি খাতের ঋণ বিতরণব্যবস্থায় যে চাঙ্গা ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে তার প্রভাবও বিনিয়োগ তথা প্রবৃদ্ধিতে পড়বে।

সঞ্চয় ও বিনিয়োগ : বাড়ন্ত প্রবৃদ্ধির এই হারকে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হারও সমর্থন করে। গেল অর্থবছরে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল জিডিপির ৩০.২৭ শতাংশ। এই বিনিয়োগের বড় অবদান এসেছিল সরকারি খাত থেকে (জিডিপির ৭.২৬ শতাংশ)। এর আগের অর্থবছরে সরকারি বিনিয়োগ ছিল ৬.৬৬ শতাংশ। মনে রাখা চাই, সাতটি মেগা প্রকল্প এখন চলমান। এর মধ্যে পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি চোখে পড়ছে। অন্যান্য বড় প্রকল্পের কাজও দ্রুতই এগোচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন মনিটর করছেন। নির্বাচনের বছর বলে আগামী বছর এগুলোর রূপায়ণে সরকার আরো বেশি নজর দেবে। তাই চলতি অর্থবছর শেষে আমাদের সরকারি বিনিয়োগ যেমন বাড়বে, তেমনি সম্পূরক ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগও বাড়বে। এসব প্রকল্পে ব্যবহৃত সিমেন্ট, বালু, রডসহ সব কাঁচামাল তো ব্যক্তি খাতের জোগানদাররাই জোগান দিয়ে থাকেন। তাই সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বিনিয়োগ আগামী বছর বাড়বে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারীরা হয়তো নির্বাচনের পূর্বক্ষণে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধে খানিকটা দ্বিধান্বিত থাকলেও চলতি অর্থবছরের বাকি সময়টায় তাদের তত্পরতা বেশ জোরালোই থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।

বিনিয়োগের এই চাঙ্গা ভাব ধরে রাখার জন্য জাতীয় সঞ্চয়ের হারও বাড়াতে হবে। আর সে জন্য বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স যাতে আনুষ্ঠানিক উপায়ে বেশি করে আসে সেদিকে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাড়তি তত্পরতা দেখাতে হবে। কী করে হুন্ডির পরিমাণ কমানো যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। ডলারের বিনিময় হার নমনীয় রাখা, বিদেশেও মোবাইল ব্যাংকের এজেন্ট নিয়োগ দেওয়া এবং ব্যাংকগুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে অবশ্য আনুষ্ঠানিক পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো সম্ভব। এখনো আমাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পার্থক্য ইতিবাচক। তার মানে পুরো সঞ্চয় আমরা বিনিয়োগ করে উঠতে পারছি না। অবশ্য হালে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের দেওয়া অর্থের ছাড়ও বাড়ছে। বিদেশি অর্থের প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে খানিকটা গতি এসেছে। পাশাপাশি আমাদের রাজস্ব আহরণেও গতি বাড়ছে। নয়া ভ্যাট আইন স্থগিত হওয়ায় মোট রাজস্ব সংগ্রহ খানিকটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও আয়কর ও অন্যান্য কর সংগ্রহে এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ছে। এই প্রতিষ্ঠানের তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ছে। বাড়ছে জনসম্পৃক্তি। আয়কর প্রদানে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। নতুন বছরে দেশি-বিদেশি সম্পদ সংগ্রহের এই অভিযাত্রা আরো জোরালো হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। আর তা হলে আমাদের ‘ফিসকল ডেফিসিট’ বা রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের নিচেই থাকবে। এই ঘাটতির হার আরো কমানোর প্রচেষ্টা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি এই কষ্টার্জিত অর্থের অপচয় যাতে আরো কম হয় সে জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা, জবাবদিহি ও প্রযুক্তিমনস্কতা বাড়ানোর জন্য নীতিনির্ধারকদের তত্পর হতে হবে।

অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য নিরসন : গত বছরের শুরুর দিকে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন যে কী করে প্রবৃদ্ধি অর্জন ও বৈষম্য কমানো যায়, তা বাংলাদেশ থেকে শেখা উচিত। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের গ্রাম থেকে লাখ লাখ নারী-পুরুষ শহরে এসে রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানায় কাজ করছে। এর ফলে তাদের দক্ষতা ও আয় বাড়ছে। সে কারণে বাংলাদেশে আয়ের বৈষম্য সেভাবে বাড়েনি। অবশ্য হালে আয়বৈষম্য সূচক বাড়ছে। ওপরের ৫ শতাংশ খানা ২৭.৯ শতাংশ আয় ভোগ করে (২০১৬)। আর নিচের ৫ শতাংশ খানা হিসসা হচ্ছে মাত্র ০.২৩ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার আরো কমে দাঁড়িয়েছে ১২.৯ শতাংশে। আমাদের এসডিজির স্বপ্ন হলো ২০৩০ সালে কার্যত অতি দারিদ্র্য শূন্যে নেমে আসবে। তবে সারা দেশে দারিদ্র্যের হারে রকমফের আছে। এই আঞ্চলিক দারিদ্র্যের হারের পার্থক্যের দিকে আমাদের বাড়তি নজর দিতে হবে। সে জন্য স্থানীয় সরকারগুলোকে আরো দক্ষ ও তত্পর করতে হবে। শহরের চেয়ে গ্রামে নিঃসন্দেহে দারিদ্র্য বেশি হারে কমেছে। গ্রামে কৃষি আয়ের চেয়ে অকৃষি আয় বেড়েছে। ফলে গ্রামীণ বেকারত্বও কমেছে। আর শহর ও বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ গ্রামেই বেশি যাওয়ার কারণে খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তার সংখ্যাও গ্রামে বেড়েছে। পুকুরে মাছ চাষ, মুরগির ফার্ম, দোকানপাট, মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো উদ্যোগের সংখ্যা হালে ব্যাপক হারে বেড়েছে। এসবের প্রভাব দারিদ্র্য নিরসনের ওপর পড়েছে। ফলে গ্রামীণ ভোগ স্থিতিশীল রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি এ বছরও চাঙ্গা থাকবে।

মূল্যস্ফীতি :  বাংলাদেশ ব্যাংকের বিচক্ষণ মুদ্রানীতির কারণে মূল্যস্ফীতির হার গেল বছরও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ২০১৭ সালের জুনে ৫.৪৪ শতাংশ ছিল। ২০১৬ সালের জুনে তা ছিল ৫.৯২ শতাংশ। অবশ্য অর্থবছর শেষে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণে গড় মূল্যস্ফীতি খানিকটা বেড়েছে। এরই মধ্যে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.৮৭ (সেপ্টেম্বর-২০১৭) শতাংশ হয়ে গেছে। এর প্রভাব খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে শুরু করেছে। জানুয়ারিতে যে মুদ্রানীতি বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করবে, তা যেন এ প্রশ্নে আরো সাবধানী হয় সেই প্রত্যাশাই করছি।

আমদানি : ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৩.৪৯ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (অক্টোবর পর্যন্ত) আমদানির পরিমাণ ছিল ১৭.১৪ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তা ছিল ২৯ শতাংশ। মনে হয় পুরো অর্থবছরই আমদানির এই চাঙ্গা ভাব বজায় থাকবে। আর আমাদের আমদানির বিরাট অংশ ব্যয় হয় রপ্তানির জন্যই।

রপ্তানি : চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (নভেম্বর পর্যন্ত) রপ্তানি আয় হয়েছে ১৪.৬ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের ওই সময়ের তুলনায় তা ৭ শতাংশ বেশি। গেল অর্থবছরের মোট রপ্তানি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের চেয়ে ছিল মাত্র ২ শতাংশ বেশি। সেই বিচারে চলতি অর্থবছরের রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ধারা ইতিবাচক। খুদে ও মাঝারি পর্যায়ের হাজার হাজার উদ্যোক্তার তৈরি পোশাক খাতের অনুরূপ ইডিএফ, নগদ প্রণোদনাসহ সব সুবিধা দিলে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটবে।

রেমিট্যান্স : গত অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১২.৮ বিলিয়ন ডলার। এর আগের অর্থবছর তা ছিল ১৪.৯৩ বিলিয়ন ডলার। তার মানে গত অর্থবছরে এই খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। বর্তমান অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৫.৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ওই সময়ের চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্স ভোগ বাড়ায় নতুন খুদে উদ্যোক্তা তৈরিতে অবদান রাখে। তাই সরকার, রেগুলেটর ও ব্যাংকগুলোকে এদিকে নজর বাড়াতে হবে।

রিজার্ভ : জুন ২০১৭ শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৩.৫ বিলিয়ন ডলার। জুন ২০১৬ থেকে তা ছিল মাত্র ০.৩৬ বিলিয়নের বেশি। ২০ ডিসেম্বর ২০১৭ তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩.০ বিলিয়ন ডলারে। তার মানে রপ্তানি আয় আমদানি আয়ের চেয়ে কম হারে বাড়ার কারণে এবং রেমিট্যান্স স্লথ হওয়ার কারণে রিজার্ভের পরিমাণ গত বছর কমেছে। তবে এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৯ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তবুও রিজার্ভ আরো বাড়াতে সচেষ্ট থাকতে হবে।

ব্যাংকিং খাত : ব্যাংকিং খাতের মৌলিক সূচকগুলো গেল বছর সার্বিকভাবে স্থিতিশীল ও ঝুঁকি সহনে সক্ষম থাকলেও খেলাপি ঋণের হার অস্বস্তিকর পর্যায়ে রয়ে গেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশেরও বেশি হওয়ায় এই অস্বস্তি আরো বেড়েছে। শিল্প খাতে খেলাপির হার ৩০ শতাংশ। বড় বড় ঋণখেলাপির ঋণের কিস্তি পরিশোধে অসহযোগিতার কারণে এই অস্বস্তি আরো বাড়ছে। নতুন কয়েকটি ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং সুশাসনের অভাবের কারণে পুরো ব্যাংকিং খাত নিয়ে মানুষের উত্কণ্ঠা বেড়ে গেছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এত দিন ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের বিশ্বাস অক্ষুণ্ন ছিল। কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ‘নানা মাত্রিক’ পরিবর্তন ও মালিকানার কেন্দ্রীভবন আমানতকারীদের বেশ খানিকটা হকচকিয়ে দিয়েছে। আশা করি সাধারণ মানুষের দুর্ভাবনা প্রশমনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্বের অংশ হিসেবে জাতীয় স্বার্থে যা প্রয়োজন তা-ই করবে। আইন তাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ নীতি অনুসারে অনুসরণ করে যাচ্ছে (বর্তমানে মূলধন পর্যাপ্ততা ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০.৬৫ শতাংশ)। খেলাপি ঋণের বিপরীতে যে অর্থ প্রভিশন রাখতে হয় তাতেও পরিস্থিতি ততটা খারাপ নয়। ৮৬ শতাংশ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন করা আছে। প্রকৃত ঘাটতি ১৪ শতাংশ (ছয় হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা)। এর বড় অংশই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে। জুন ২০১৬ থেকে জুন ২০১৭ পরিসরে আমানত বেড়েছে ১০.৬৯ শতাংশ হারে। ওই একই সময়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ১৮.১১ শতাংশ। এই ঋণ প্রবৃদ্ধি ডিসেম্বর শেষে আরো বেড়েছে। মূলত ব্যক্তি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। এসব গুণমানের হয়েছে কি না তা দেখার প্রয়োজন রয়েছে। কৃষিঋণ, খুদে ও মাঝারি খাতের ঋণ ও ভোক্তা ঋণের পরিমাণ বাড়ন্ত ছিল বছরজুড়েই। কিছু ব্যাংক অবকাঠামো খাতেও তাদের ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে। গেল বছর ব্যক্তি খাতের ঋণ বাড়ার ফলে অর্থবছর শেষে বিনিয়োগের হার বাড়ন্তই থাকবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব প্রবৃদ্ধির ওপরও পড়বে।

ব্যাংকিং খাতের যে সূচকগুলো স্বস্তিদায়ক, সেগুলো হচ্ছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কিত। নিম্ন আয়ের মানুষদের আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি ব্যাংকগুলো নিজেদের গরজেই কৃষি, এসএমই ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তার মানে তারা নয়া উদ্যোক্তা তৈরির কাজে উৎসাহ দেখাচ্ছে। ২০১৭ সালের ১১ মাসে ব্যাংকের নতুন শাখা খোলা হয়েছে ১৮৯টি। কৃষক, অসহায় মুক্তিযোদ্ধা, গার্মেন্টকর্মী, তাঁতি, জেলে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সামাজিক ভোক্তাদের জন্য বিশেষ ধরনের ১০ টাকার হিসাব খোলার ধারা গত বছরও অব্যাহত ছিল। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ধরনের হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৭২ লাখ। এর মধ্যে শুধু কৃষকের হিসাব সংখ্যা ৫৩ শতাংশ। উল্লেখ্য, কৃষকদের এ ধরনের হিসাবে ঋণ প্রদান, সঞ্চয় ও রেমিট্যান্স সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য ২০০ কোটি টাকার পুনরর্থায়ন কর্মসূচিও চালু রয়েছে। এ ছাড়া জুন ২০১৭ নাগাদ স্কুল ব্যাংকিংয়ের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ৩৩৮। পথশিশুরাও ব্যাংকে হিসাব খুলেছে এবং এ পর্যন্ত সাড়ে ২৬ লাখ টাকা সঞ্চয় করেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২০ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা পরিমাণ কৃষিঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এর ১০ শতাংশ প্রাণিসম্পদ খাতে বিতরণ করা হয়েছে। জুন ২০১৭ নাগাদ এসএমই খাতে ৮৩ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এসবের আওতায় জুন ২০১৭ নাগাদ ছয় হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব পুনরর্থায়নের ন্যূনতম ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ব্যাংকিং লেনদেন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষকে যুক্ত করার অংশ হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো হয়েছে এবং কোর ব্যাংকিং সলিউশন চালু করা হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি ব্যাংকগুলোর এই মনোযোগ অবিচ্ছিন্ন রয়েছে। এটি সত্যি আশাপ্রদ।

এসবের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)ভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০১৭ সালে ৩১টি প্রকল্পে ১০০ মিলিয়ন ডলার (৭৯২ কোটি টাকা) বিতরণ করা হয়েছে। আরো ২৬২ মিলিয়ন ডলারের ৩৬টি আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সন্তোষজনক সার্বভৌম ঋণদান : স্থিতিশীল জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও বহিঃখাতের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে ২০১৭ সালেও স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস (এসঅ্যান্ডপি) ও মুডিস মূল্যায়নে যথাক্রমে BB এবং Ba3 অর্থাৎ স্থিতিশীল আউটলুক অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। ফিচ রেটিংসও একধরনের ঋণমানের কথা জানিয়েছে।

এসব সন্তোষজনক ঋণমানের কারণে বাংলাদেশের পক্ষে বেশি হারে এফডিআই সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহ করাও এখন অনেকটাই সহজ হয়েছে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ থাকায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য অনেক বিদেশি উদ্যোক্তাই এখন উৎসাহী। জাপানের হোন্ডা কম্পানি অচিরেই বাংলাদেশে অ্যাসেম্বল ইউনিট চালু করতে যাচ্ছে। তাদের দেখাদেখি আরো অনেক জাপানি উদ্যোক্তা বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে।

তবে আমাদের ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা ও অস্থিরতার মতো নেতিবাচক খবরগুলো বেশি বেশি প্রচারিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশ খানিকটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের অনেক ব্যাংকের এলসি খুলতেই চায় না। খুললেও তার চার্জ অনেক বেশি হারে করে থাকে। অনেক দিন পরে আমাদের চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের খানিকটা দ্বিধান্বিত করছে। তবে রাশিয়া, জাপান, চীন ও ভারত সরকারিভাবে বাংলাদেশে ব্যাপক হারে সরকারি বিনিয়োগ করায় আমাদের বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়নে গতি আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ভারতীয় সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ দ্রুতই বাড়ছে। ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় ‘লাইন অব ক্রেডিট’ চালু আছে। এখন বলা হচ্ছে আরো ১০ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় বিনিয়োগ আসবে। এসবের পার্শ্ব-প্রভাব ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের ওপরও পড়ছে। তাই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির চাকা দ্রুতই ঘুরছে। আশার কথা, আমাদের রপ্তানি-উদ্যোক্তা ও আইসিটি উদ্যোক্তা এখন বিশ্বমানের। তাঁরা দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছেন। এখন তাঁদের জন্য নীতি সহায়তা ও ঋণ সহায়তা আরো বাড়াতে পারলে তাঁরা বাংলাদেশকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এমডিজি পূরণে আমরা যে সাফল্য দেখিয়েছি, আমার বিশ্বাস এসডিজি পূরণেও সেই সাফল্যের ধারা বাংলাদেশ অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে। ২০১৮ নির্বাচনের বছর বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতার ঝুঁকি সত্ত্বেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় তার সক্রিয়তা অব্যাহত রাখবে—সেই প্রত্যাশাই করছি। অর্থনীতি যেন রাজনীতির কোপানলে না পড়ে সেই প্রত্যাশা সবারই। অর্থনীতি সম্পর্কিত নীতিনির্ধারকদের অযথা ‘অতিকথনে’র কারণে যেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা নিরাশ না হয়ে পড়েন সেদিকে সর্্বোচ্চ মহলকে খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশ দ্রুতলয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে পৃথিবীর দ্রুততম প্রবৃদ্ধির তিনটি দেশের একটি হবে বাংলাদেশ। দেশের অসাধারণ এই উন্নয়ন অভিযাত্রায় দল-মত-নির্বিশেষে সবাই যুক্ত থাকবেন, নতুন বছরে সেই কামনাই করছি। শুভ নববর্ষ।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংক।

dratiur@gmail.com



মন্তব্য