kalerkantho


চ্যালেঞ্জ নিয়েই বাংলাদেশের জন্ম ও বেড়ে ওঠা

আবদুল বায়েস

১০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চ্যালেঞ্জ নিয়েই বাংলাদেশের জন্ম ও বেড়ে ওঠা

অর্থবছর আর স্বাভাবিক ক্যালেন্ডার বছরের মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। অর্থবছরের ব্যাপ্তি জুলাই থেকে জুন আর স্বাভাবিক ক্যালেন্ডার বছরের ব্যাপ্তি জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রতিটি ক্যালেন্ডারে বছরে ছয় মাস থাকে অর্থবছর। আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ সাল তথা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ছয় মাস শেষ হতে চলেছে। গেল বছরটি কেমন গেল?

প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা যদি ধরি তাহলে গেল বছরটি মন্দ যায়নি। ৭ শতাংশের ওপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার। বাংলাদেশের ইতিহাসে বোধ করি সর্বোচ্চ আর বৈশ্বিক অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশংসনীয় প্রবৃদ্ধির হার। বস্তুত গেল এক দশকের ওপর সময়ব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬.৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশের ওপর ওড়াউড়ি করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহতভাবে শুধু বৃদ্ধি পায়নি, প্রবৃদ্ধির ওঠানামা ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ একটি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত যে মজবুত, এটা তার প্রমাণ। মাথাপিছু আয়ের প্রায় ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি ভোগ বা ক্রয়ক্ষমতাকে যথেষ্ট বেগবান করেছে। গেল বছরটিতে মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে আগের চেয়ে বেশ ভালো করেছে বাংলাদেশ, তেমনি প্রশংসনীয় কৃতিত্ব লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ তথা মহিলাদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিতে। একই সময়ে বছরটিতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটেছে বেশ বড়মাপের। বাংলাদেশে এখন প্রায় ৯০ শতাংশ খানায় মোবাইল ফোন আছে। অনুমান করি, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ এক বিলিয়ন ডলার থেকে দুই বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

কিন্তু গেল এক দশকের রেকর্ড ভেঙে অতিক্রান্ত বছরে ধেয়ে আসা বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে একের পর এক দুর্যোগের ঘনঘটা বিস্মৃত হওয়ার নয়। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার কারণে ১০-১৫ লাখ টন খাদ্যশস্যের ঘাটতি ঘটে এবং কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়। তারপর আসে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বন্যা এবং শস্যে পোকামাকড়ের আক্রমণ। এর ফলে মোট খাদ্যঘাটতি দাঁড়ায় ২৫-৩০ লাখ টন। বাংলাদেশ গেল এক দশক যৎসামান্য পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করেছে। সেই বাংলাদেশকে শুধু খাদ্যশস্য আমদানির জন্য এখন দুয়ারে দুয়ারে মাথা ঠুকতে হচ্ছে। আর এই খাদ্যঘাটতি যে দরিদ্রের জীবনে চরম দুর্ভোগ এনেছে সে কথা বলাই বাহুল্য। দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের মোট বাজেটের ৬০ শতাংশ খাদ্যশস্য ক্রয়ে ব্যয় করে এবং বিশেষত চাল ক্রয়ে যায় মোট বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ। সুতরাং চালের বাজারে আগুনে বিশেষত গরিবের হাত পুড়বে, এটা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এদিকে আবার গেল বছরে রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধি ছিল নিম্নমুখী, যেমন ছিল নিম্নমুখী রেমিট্যান্স প্রবাহ। তেজি আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার মোটামুটি নিস্তেজ অন্তর্মুখী প্রবাহ চলতি বাণিজ্য হিসাবে বিরাট ঘাটতির সম্মুখীন করে তুলেছে। আর তাই বোধ হয় বৈদেশিক মুদ্রা, বিশেষত শক্ত ডলারের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে দুর্বল টাকাকে। এরই মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রচুর ডলার বাজারে ছাড়তে হয়েছে।

বেশ একটা বড় বিরতিতে বন্যার আক্রমণ, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের নিম্নমুখী অন্তঃপ্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশ যখন হিমশিম খাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় মিয়ানমার থেকে প্রায় সাত লাখ মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটে। তারা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়—মিয়ানমারের সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর নির্যাতনের শিকার। বাংলাদেশ যুক্তিযুক্তভাবে ও মানবিক কারণে এ সময় সাত লাখ লোককে আশ্রয় দিয়েছে। আশ্রয় দেওয়ার পেছনে মানবিক মূল্যবোধ তো কাজ করছেই, তার ওপর কাজ করছে একটি ধারণা যে সংকট স্বল্পস্থায়ী এবং অচিরেই আন্তর্জাতিক চাপে এ সমস্যার সমাধান হবে। আপাতত সে আশায় গুড়ে বালি বললে বোধ করি ভুল হবে না।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অর্থনীতির ওপর একটি সমীক্ষা দাঁড় করিয়েছে। আমরা ওই প্রতিবেদন থেকে কিছু টুকে নিতে পারি; যদিও ওই তথ্য সারা বছরের প্রতিনিধিত্ব করবে না, তবে খুব একটা ক্রান্তিকালের তথ্য বলে তুলে ধরার প্রয়াস নিচ্ছি।

প্রথমত পরিবেশের কথা। এপ্রিল ২০১৭ সালে ২৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের চেয়ে ৬৬ শতাংশ বেশি বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। সমালোচকরা বলে থাকেন, এটা নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণ। এমন ভারি বৃষ্টিপাত বৃহত্তর সিলেট ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিস্তর জায়গা প্লাবিত করে। মে ও জুন মাসের বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিক। বন্যার কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিপুল ঘাটতি ও ব্যর্থ সংগ্রহ অভিযানের ফলে চালের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এমনিতেই জাতীয় পর্যায়ে খুচরা চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল, তার ওপর বৃহত্তর সিলেট জেলায় হঠাৎ ধেয়ে আসা বন্যা জ্বলন্ত উনুনে যেন তেল ঢেলে দিয়েছে। এপ্রিল-জুন এই তিন মাসে চালের দাম তার আগের তিন মাসের তুলনায় ১৫ শতাংশ এবং গেল বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি ছিল। জুন ২০১৭ সালে ভোক্তামূল্য সূচক প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায় ৭ শতাংশের ওপর, যা কি না বন্যার কারণে ঘটেছে; গেল তিন মাসের তুলনায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬-১৭ সালে খাদ্যশস্য সংগ্রহমাত্রা নির্ধারিত ছিল প্রায় ৩.৭০ কোটি টন (৩.৫১ কোটি টন চাল ও ১.৪৩ কোটি টন গম)। এপ্রিল ২০১৭ সালে মোট খাদ্যশস্য মজুদ ছিল মাত্র ০.৫৬ মেট্রিক টন, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৬ শতাংশ কম। মে ও জুন মাসে চালের মজুদ আরো হ্রাস পেয়ে যথাক্রমে ০.৫৫ ও ০.৩৮ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। এটা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে কম মজুদ।

এবার আসা যাক মজুরির কথায়। খাদ্যের অভাবে যেমন দুর্ভিক্ষ হয়, তেমনি দুর্ভিক্ষ হয় মজুরির অভাবে। পৃথিবীতে এযাবৎকালে যত দুর্ভিক্ষ হয়েছে তার পেছনে বড় কারণ ছিল কর্মসংস্থান বা মজুরির অভাব। অমর্ত্য সেনের ভাষায়—‘এনটাইটেলমেন্ট’ হচ্ছে আসল কথা। এনটাইটেলমেন্ট বৃদ্ধি করা গেলে দামের ঊর্ধ্বমুখিতাও সহ্য করা যায়। ২০১৭ সালের জুন মাসে একজন নারী শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ২৬৯ টাকা, অথচ একই সময়ে পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল দৈনিক ৩৫৮ টাকা; অর্থাৎ নারী ও পুরুষের শ্রমের দামে ৩৩ শতাংশ বা দৈনিক প্রায় ৯০ টাকা পার্থক্য। অন্য কথায় নারী শ্রমিকের মজুরি পুরুষ শ্রমিকের মজুরির তিন-চতুর্থাংশ।

মনে রাখা দরকার যে গ্রামীণ বাংলায় আমন ধান কাটার পর পুরুষের চেয়ে নারী কৃষি শ্রমিকের চাহিদা বেশি হ্রাস পায়। বোরো মৌসুমের চারা লাগানোর কাজ মূলত পুরুষ শ্রমনির্ভর থাকায় মজুরি পার্থক্য আরো বেশি বৃদ্ধি পায়। গেল তিনটি অর্থবছরের মজুরির উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন নারী শ্রমিক পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে গড়পড়তা ২৪ শতাংশ কম মজুরি পেয়ে থাকে। তার মানে পার্থক্যটা দৈনিক প্রায় আড়াই কেজি চালের সমান। বলার অপেক্ষা রাখে না যে খানার খাদ্য নিরাপত্তায় এর তাৎপর্য অনেক, বিশেষত যেসব খানা নারী শ্রমনির্ভর। আর এই পার্থক্যটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল ও খুলনা জেলায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি চমৎকার কৃতিত্ব প্রদর্শন করে আসছে এটা যেমন সুখবর, তেমনি আগামী দিনগুলোতে উদীয়মান চ্যালেঞ্জগুলো স্বস্তির সুবাতাস দেয় বলে মনে হয় না। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য বেশ কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। প্রথমত, আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি খাদ্য পরিস্থিতিকে কিছুটা হলেও উন্নত করতে পারবে। আশা করা যায়, এবার আমন উৎপাদন সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের দ্রুত পুনর্বাসন প্রয়োজন। লাখ লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ অর্থনীতির জন্য একটি বাড়তি চাপ। তৃতীয়ত, বিশ্ববাজারে রপ্তানি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি সাপেক্ষে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ প্রশস্ত রাখা একটা চ্যালেঞ্জ। তেমনি রেমিট্যান্স প্রবাহের ঊর্ধ্বমুখিতা। চতুর্থত, অগ্রগামী সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে চলমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এবং অবশেষে ক্রমাগত বিশ্ব যেভাবে বৈরী আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে, তাতে অনুমান করা সম্ভবত কঠিন নয় যে আগামী দিনগুলো বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে। অবশ্য এই চ্যালেঞ্জ নিয়েই তো বাংলাদেশের জন্ম ও বেড়ে ওঠা।

বছর যায়, বছর আসে। অর্থনীতি কখনো কাঁদে, কখনো হাসে।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য