kalerkantho


বিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতি ও আমাদের শঙ্কা

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতি ও আমাদের শঙ্কা

গত ২৯ নভেম্বর এসএসসির টেস্ট পরীক্ষায় নকল ধরার কারণে পিরোজপুরে এক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে ওই বিদ্যালয়েরই ছাত্র ও ছাত্রলীগের সভাপতি ও তাঁর সহযোগীরা মারধর করে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই ছাত্রলীগ সভাপতিকে বহিষ্কার করে কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।

এমন কমিটি বিলুপ্ত কিংবা বহিষ্কারের খবর এর আগে অহরহই হয়েছে। আবার পরক্ষণেই কোনো না কোনোভাবে বহিষ্কৃতদের পুরস্কৃত করার খবরও আমরা পেয়েছি। তবে বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনার মাধ্যমে আরো একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। আর এই অধ্যায়ের শেষ কোথায়, তা নিয়ে শঙ্কার যাত্রাও শুরু হলো। বিদ্যালয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাত্রার মাধ্যমে শিশুদের আধিপত্য চর্চার যে ক্ষেত্র সূচিত হলো, তা নিয়ে আমাদের ব্যথিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পিরোজপুরে নকল ধরার কারণে শিক্ষককে পেটানোর যে ঘটনা ঘটেছে তা কেমন ধরনের সংকেত বহন করে—সেটি বুঝতে কারো বাকি থাকার কথা নয়। কোনো শিক্ষক নকল ধরবেন, অন্যায় ও অনৈতিকতা প্রশ্রয় দেবেন না—এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নকল ধরার পর হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকলে কেউই চাইবেন না নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে। শুরুতেই এ বিষয়ে ভাবতে না পারলে এর ভয়াবহতাকে স্বাগত জানাতে বাধ্য হতে হবে। আর যারা আধিপত্য চর্চায় লিপ্ত হবে, তারাও কি শিক্ষার যথার্থ মর্ম অনুধাবন করে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারবে? নাকি নকল কিংবা অনৈতিকতার আধিপত্য চর্চায়ই তারা মনোনিবেশ করবে!

গত ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে এরই মধ্যে বেশ কিছু বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হয়েছে। মূলত স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে আরো গতিশীল ও বেগবান করার লক্ষ্যে সব সাংগঠনিক ইউনিটের অন্তর্গত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। ওই নির্দেশের পর সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের বিদ্যালয় কমিটি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলমান থাকতেই এর প্রমাণ শুরু হয়েছে পিরোজপুরের ঘটনায়।

আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের ছাত্রসংগঠনগুলোকে কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলায় আনতে পারছে না। প্রায়ই এসব ছাত্রসংগঠনের নেতিবাচক কার্যক্রমে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার খবর পাচ্ছি। যেখানে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে বিদ্যালয় পর্য়ায়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে কি না সেটি নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। জাতীয় সমস্যা ও সংকটের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো বাদ দিলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কুল-কলেজ পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতির মূল বিষয় ছিল শিক্ষাকেন্দ্রিক ও শিক্ষার স্বার্থসংশ্লিষ্ট। আর সে কারণেই শিক্ষা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে বিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে স্টুডেন্টস কাউন্সিল বা কেবিনেট গঠনের উদ্যোগ নেয় বর্তমান সরকার। এরই মধ্যে এ বিষয়ে যথেষ্ট সফলতা এসেছে। এর মাধ্যমে শিশুকাল থেকে গণতন্ত্রের চর্চা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, অন্যের মতামতের প্রতি সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন, বিদ্যালয়ের শিখন-শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষকমণ্ডলীকে সহায়তা করা, বিদ্যালয়ে ১০০ শতাংশ ছাত্র ভর্তি ও ঝরে পড়া রোধে সহযোগিতা করা, শিখন-শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে উঠছে।

এমন প্ল্যাটফর্ম থেকে শিক্ষার্থীরা গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্বের বীজ রোপিত হওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু কলুষিত ও অনিশ্চিত জাতীয় রাজনীতির ধারা পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সহাবস্থান নিশ্চিত না করেই মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের ফলাফল কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। শিক্ষা-শান্তি-প্রগতি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন মূলমন্ত্র হলেও গত দেড় দশকে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড তাদের এই মূলমন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও ক্ষুব্ধ হয়ে একসময় ছাত্রলীগের অভিভাবকত্ব পরিত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণহীন তাণ্ডবে দেশব্যাপী সমালোচনার মুখে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি বাতিলসহ কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে দলীয় ফোরাম। এর পরও অব্যাহতভাবেই নিয়ন্ত্রণহীন ছাত্রলীগ। একসময়ের শিক্ষা আন্দোলনের পথিকৃৎ ছাত্রলীগের এক শ্রেণির নেতাকর্মী এখন বন্দুক-চাপাতির নৃশংসতাকেই যেন বেছে নিয়েছে। তাদের কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। স্কুল-কলেজের গলি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিপক্বতা ও সামাজিক-রাজনৈতিক কমিটমেন্ট সৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও এসব নেতাকর্মীর মধ্যে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে জাতীয় রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতির বিপথগামিতাকেই দায়ী করা যায়। এবারের জেএসসি ও পিইসি পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতেও বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় ছাত্রলীগের প্রভাব ও অনধিকার প্রবেশের ঘটনা পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে।

দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক ছাত্রলীগের বিদ্যালয় কমিটি সারা দেশে হাজার হাজার পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রায় প্রতিটিতে ছাত্রলীগের বিভিন্ন স্কুল ও স্থানীয় কমিটির মধ্যে বিরোধ ও প্রভাব বিস্তারের রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেখানে হাতে গোনা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা কমিটি সরকার ও দলীয় ভাবমর্যাদার তোয়াক্কা না করে যখন-তখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও রক্তাক্ত সংঘাত নিয়ন্ত্রণ বা নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না, সেখানে হাজার হাজার বিদ্যালয় কমিটির কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা আছে কি না তা আমাদের জানা নেই।

সে ক্ষেত্রে প্রথমেই জাতীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা দরকার। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সব দল ও মতের ছাত্রসংগঠনের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু শিক্ষাকেন্দ্রিক ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির পুনরুজ্জীবন শুরু করা সম্ভব হলে দেশে ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা সূচিত হওয়ার পরই দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে বিদ্যালয় পর্যায়ে কমিটি গঠনের চিন্তা করা উচিত। এটা নিশ্চিত যে ছাত্রলীগের বিদ্যালয় পর্যায়ে কমিটি গঠিত হলে অন্য সংগঠনগুলোও তাদের তত্পরতা শুরু করবে। প্রতিপক্ষ সংগঠনের সঙ্গে এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ছাত্রলীগের বিদ্যালয় কমিটি শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম কারণে পরিণত হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com


মন্তব্য