kalerkantho


সাদাকালো

একজন অচেনা মানুষের স্মরণে কয়েক ছত্র

আহমদ রফিক

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



একজন অচেনা মানুষের স্মরণে কয়েক ছত্র

না, স্মরণীয়-বরণীয়, আধুনিক চেতনার আনিসুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না, সম্পর্ক তো দূরের কথা। একজন অতিবর্ষীয়ান অন্তর্মুখী, নিভৃতচারী লেখকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতা না ঘটারই কথা।

বয়সের ফারাকটাও প্রায় আড়াই দশকের। তবু তাঁর অভাবিত, অপ্রত্যাশিত হঠাৎ প্রয়াণে আলোড়িত সংস্কৃতি অঙ্গনের শোকার্ত প্রতিক্রিয়ায় অংশগ্রহণে টান অনুভব করছি। কারণ তাঁর সম্পর্কে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত শোকলিপিতে আমার জন্য অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে। সেগুলো একজন সমাজ-সচেতন লেখকের  চেতনায় দাগ কাটার জন্য যথেষ্ট।

আশ্চর্য যে আনিসুল হক নামটি একাধিক বিশিষ্টজনের নামের মিলে ধন্য। এর মধ্যেই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কেন্দ্রীয় সংগঠনের প্রধান হিসেবে নিজেকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন পরবর্তী সময়ের স্বনামধন্য মেয়র আনিসুল হক। শেষোক্ত প্রসঙ্গ পরে আসছে। লক্ষ করার বিষয় যে এ পর্যায়ে তাঁর যৌবনের বা অব্যবহিত যৌবনোত্তর পর্বের সাংস্কৃতিক স্বনামখ্যাতি ঢাকা পড়ে যায়। হয়তো তাই তাঁর উজ্জ্বল পূর্বপরিচয় অনেকটা বিস্মৃতির অন্ধকারে, অনেকের অজানা।

অথচ সেই সাংস্কৃতিক উজ্জ্বলতা তাঁর অন্তর্দীপ্ত সাংস্কৃতিক মেধার পরিচয় বহন করে। এককথায় বহুমাত্রিক মেধার ধারক-বাহক ছিলেন এই আনিসুল হক।

দুই.

কিছুদিন থেকে সংবাদপত্রের  শিরোনামে উঠে আসছিল ‘মেয়র আনিসুল হক’-এর নাম। সমাজের একাংশে কিছু জল্পনা-রটনাও উঠে আসছিল। এর মধ্যে তাঁর লন্ডন যাত্রা, সেখানে অসুস্থতার খবর মাঝেমধ্যে ছোট শিরোনামে। হয়তো তখন কেউ ভাবেনি হঠাৎ করে এভাবে তিনি চলে যেতে পারেন তাঁর চেনা সমাজে, গভীর শোকের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। হয়তো তাই সংবাদমাধ্যমে ততটা আলোচনা সৃষ্টি হয়নি। অথবা প্রত্যাশা, তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। লন্ডনের চিকিৎসা বলে কথা।

তা ছাড়া সমাজের একটি অলিখিত সত্য যে বিশিষ্ট কেউ চলে যাওয়ার পর তার পেছনে ফেলে রাখা অর্জনগুলো তাত্ক্ষণিক সামনে চলে আসে, যেগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনার প্রকাশ ঘটে। কারো কারো ক্ষেত্রে একান্তজনদের প্রতিক্রিয়ায় সংবাদ-বিস্ফোরক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যেমন স্মরণে তেমনি শোকবার্তায়। যেমনটি প্রয়াত আনিসুল হকের ক্ষেত্রে ঘটেছে। দিন কয়েক ধরে  সংবাদপত্রে তাঁর সুকীর্তি ও ব্যক্তিজীবন, সাংস্কৃতিক জীবন,  বৈষয়িক জীবন নিয়ে আলোচনা হয়।

তিন.

বেশ বছর কয়েক আগে বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে জয়ী একজন সুদর্শন ব্যক্তির কিছু কথা ও বিবৃতি আমাকে আকর্ষণ করেছিল ভিন্ন ধরনের কথার জাদু, আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয়ের দীপ্তি নিয়ে। সেখানে ছিল নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমাজ উন্নয়ন ও সমাজ পরিবর্তনের কথা, যা অনেক দিন অন্য কারো মুখে শোনা যায়নি। আর সে কারণেই ভিন্ন ভুবনের এ মানুষটিকে আমি আলাদাভাবে চিনে নিয়েছিলাম, তারপর অবশ্য সে ধারা আর অনুসরণ করা হয়নি আমার কর্মের ভুবনটি ভিন্ন হওয়ার কারণে।

তা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় পর উত্তর ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী প্রচারে আনিসুল হকের বক্তব্য, তৎপরতা ও তাঁর মেরুদণ্ড-সোজা দেহভঙ্গি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আবারও তাঁর পূর্বধারার চেয়ে অধিকতর বিশিষ্ট বক্তব্যে আনিসুল হক নিজেকে তুলে ধরেন যে প্রত্যয়ে, তা ছিল মহানগর ঢাকাকে তিলোত্তমা রূপে পরিণত করার। আর সে প্রত্যয় বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠে মেয়র হিসেবে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার পর কর্মসূচির  ঘোষণায়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহায়তার আবেদনে।

পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য যেমন ভূমিতে, তেমনি নাগরিকের মানসভুবনে নিশ্চিত করার স্বপ্নই ছিল আনিসুল হকের চেতনাজুড়ে। সে অনুযায়ী তাঁর কর্মসূচি রচনা। আর তা বাস্তবায়নে তাঁর মানসিক ও বাস্তবিক দৃঢ়তা ছিল অসাধারণ, অতুলনীয়। একটি ছোট্ট উদাহরণ তেজগাঁও যাওয়ার পথে অবৈধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ট্রাকস্ট্যান্ড (যার অবস্থান ছিল অবৈধ) অপসারণ ও  সরকারি জমি উদ্ধারে ভয়ভীতি, হুমকি উপেক্ষা করে সশরীরে উপস্থিত থেকে কার্য সমাধা। দেখে, সংবাদ পড়ে খুব ভালো লেগেছিল।

লেগেছিল এ কারণে যে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা মহানগরে কত যে অনিয়ম, কত যে অবৈধ জবরদখলের পেশি প্রদর্শন, তার নীরব দর্শক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বাদ পড়েনি বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যাসহ দেশের ছোট-বড় নদী। সেখানে একজন ছোটখাটো গড়নের  অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তাসম্পন্ন, নির্ভীক ব্যক্তির নিয়মতান্ত্রিক বলিষ্ঠ তৎপরতা সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করার কথা। বাস্তবে তা করেছিল।

তাঁর স্বপ্ন ছিল সবুজ ঢাকা, পরিচ্ছন্ন ঢাকা, বিদেশি মহানগরীর সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ঢাকা। সে কাজে ছিল তাঁর গভীর আন্তরিকতা, সাহসী কর্মতৎপরতা। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের অবৈধ দখল সরাতে তাঁর জীবন বিপন্ন করা সাহসী তৎপরতার কথা একাধিক লেখায় উঠে এসেছে। সত্যি সে ঘটনা টিভিতে বা সংবাদভাষ্যে যেন এক রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার দৃশ্য। সচেতন ঢাকাবাসীর অকুণ্ঠ প্রশংসা প্রকাশ পেয়েছিল সেদিন মেয়র আনিসুল হকের প্রতি।

মেধাবী মনন, কল্পনাপ্রবণ মনের অধিকারী বলেই বহুমাত্রিক কর্মতৎপরতার মাধ্যমে ঢাকাকে তিলোত্তমা রূপে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল আনিসুল হকের, যদিও তিনি ছিলেন নগর ঢাকার উত্তরাংশের মেয়র। বস্তি সমস্যার সমাধান ছিল তাঁর কর্মসূচিতে অগ্রাধিকারের বিষয়। সেই সঙ্গে জলাবদ্ধতা থেকে ঢাকার মুক্তি। কিছুদিন আগে লিখেছিলাম, খাল বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে। তখন জানা ছিল না ঢাকার খাল উদ্ধার, খালের জলপ্রবাহ নিশ্চিত করার চিন্তাও তাঁর মাথায় ছিল।

টেলিভিশনের পর্দায় দর্শক মনোরঞ্জনের স্বাপ্নিক কারিগর, বহুজনের ভাষায় দর্শকপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আনিসুল হক যে রুপালি ভুবন থেকে ইট-কাঠ-পাথরের নগর আর তার মাটির বাস্তব ভূমিতে নেমে আসবেন, এটা যেমন কারো ধারণায় ছিল না, তেমনি সেখানে এসে অল্প সময়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বরপুত্র হয়ে উঠবেন, এটাও  ছিল সবার জন্য অবিশ্বাস্য ঘটনা। অথচ স্বল্প সময়ের অপ্রত্যাশিত অর্জন, সন্দেহ নেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আর তাঁর নিকটজন, একান্তজনের চেতনায় ছিল মুগ্ধতার প্রকাশ।

পঞ্চাশের দশকের শহর ঢাকা  অতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। দেশভাগের সন্তান প্রাদেশিক রাজধানী শহর ঢাকা, পাকিস্তানি শাসনে অবহেলিত ঢাকার প্রাথমিক পরিবর্তন ছিল এলোমেলো, অপরিকল্পিত। চোখের সামনে এক নৈরাজ্যিক পরিবর্তন। তখন নগরপরিকল্পনাবিদ,  স্থাপত্য-উন্নয়ন প্রকৌশলীর অভাব ছিল। পরে বাস্তুকলাবিদ স্বনামধন্য মাজহার সাহেব। আপনা বুদ্ধিতে বেড়ে উঠা ঢাকা শহর থেকে নগর, নগর থেকে মহানগরের মর্যাদায়। যার যেমন মর্জি, সে ধারায় ঢাকার উন্নয়ন, তাতে আধুনিক চেতনার ও মননের দীপ্ত স্পর্শ ছিল না বললেই চলে।

তেমন এক শৃঙ্খলাহীন, বুদ্ধিদীপ্তিহীন পরিবর্তনের টানে রাজধানী মহানগর ঢাকার বর্তমান অবস্থা। গায়ে গায়ে লাগানো বহুতল ভবনের আকাশ ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা নিষ্কাশনব্যবস্থায় চরম জড়তা সৃষ্টি করেছে। পঞ্চাশের  সব সবুজ ষাট-সত্তরের দশক পেরিয়ে এখন প্রায় অন্তর্হিত। ব্যতিক্রম রমনার একাংশ। ফলে নগরে বৃষ্টি-বর্ষায় চরম জলাবদ্ধতা। ধোলাইখালসহ মহল্লার পুকুরগুলো সব ভরাট। সেখানে উঁচু উঁচু পবর্তপ্রমাণ ভবন। চমৎকার উদাহরণ—স্বল্পসংখ্যক একতলা-দোতলার সিদ্ধেশ্বরীর সবুজ মহল্লাটি এখন এক ঘিঞ্জি বসবাস এলাকা, যদিও বহুতল ভবনে আকীর্ণ।

এমন এক মহানগরের সংস্কার, একে আধুনিক চরিত্রে নতুন করে গড়ে তোলা, সুদর্শন, আরামদায়ক আবাসনে পরিণত করা বলতে গেলে অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার স্বপ্ন বৈ কিছু নয়। কিন্তু তেমন স্বপ্নই দেখছিলেন মেয়র আনিসুল হক। আর সে স্বপ্নের সোনালি সঞ্চার ঘটিয়েছিলেন উত্তর ঢাকার অধিবাসী অনেকের মনে। তাদের বিশ্বাস ছিল তাঁর ওপর।

সে বিশ্বাসে কালো ছায়া নেমে এলো স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষটির অনাকাঙ্ক্ষিত প্রয়াণে। তেমন শোকার্ত অনুভূতির প্রকাশ তাদের কারো কারো লেখায়। তাদের লেখায় বিচিত্র শিরোনাম। ‘নতুন ঢাকা গড়তে চেয়েছিলেন তিনি’, ‘তার দু চোখ ভরা স্বপ্ন’, ‘নগরবাসীর দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন আনিসুল হক’, ‘স্বপ্নদ্রষ্টার মৃত্যুতে কাতর ঢাকা’, ‘স্বপ্ন সারথির বিদায়,’ ‘আফসোস বাড়ালেন আনিস ভাই’, ‘একজন মানবিক মেয়র’ ইত্যাদি।

একজন বিশিষ্ট, বর্ষীয়ান টিভি কর্মকর্তার ধীরস্থির মূল্যায়ন আনিসুল হকের সাংস্কৃতিক কর্মের অসাধারণত্বের ঊর্ধ্বে ব্যক্তি মানুষটিকে নিয়ে। তাঁর ভাষায়, ‘এত ভালো মানুষ খুব কমই দেখেছি’। অথচ এই টিভি প্রযোজক তো দেখেছেন একজন মেধাবী জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। দেখেছেন তাঁর প্রতিভাদীপ্ত অভিনয়ও। বহু কাজের কাজি আনিসুল হককে নানাভাবে দেখেও ব্যক্তি মানুষটিকে তাঁর খুব বড়  মনে  হয়েছে। এটা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আনিসুল হকের জন্য ব্যতিক্রমধর্মী পাওয়া, যদিও এখন সে পাওয়ায় তাঁর কোনো যায় আসে না।

তবে আমার মনে দাগ কেটেছে একটি চলতি, আটপৌরে শব্দাবলির শিরোনাম, যা শ্রদ্ধায় ও আর্তিতে অসাধারণ; ‘লোকটা ঢাকাটারে এতিম বানাইয়া চইল্যা গেল’। এ আর্তি তেজগাঁও  সাতরাস্তার মোড়ের জটলায় দাঁড়ানো একজন দেহাতি মানুষের, এবং তা মানুষটির অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসা। একজনের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘এই রাস্তা, এই আইল্যান্ড, এই বাগান—এইগুলা সবটাই তো আনিসুল হক করেছেন। ’ আরেকজনের কথা, ‘গাবতলীতেও তো সে-ই মানুষ বানাইয়া রাইখ্যা গেছে। ইস, সেই মানুষটা এইভাবে চইলা গেল। ’ এরা কেউ মেয়র সাহেবের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুস্থানীয় নন, নিতান্তই পথচলা নিম্নবর্গীয় মানুষ।

এদের শোকার্তিতে আসল আনিসুল হকের পরিচয় ধরা পড়েছে। নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, তাও আন্তরিক দেহাতি ভাষায়।

‘ভালো মানুষ’ দেহাতি মানুষের পিতৃপ্রতিম নিকটজন মেয়র আনিসুল হকের এটাই নিখাদ পরিচয়। সাহিত্যের প্রতীকী ভাষায় বলা যেতে পারে, বনানীর কবরে মা ও ছেলের পাশে শুয়ে এসব অনুভূতির, বিশেষ করে শেষোক্ত হাহাকারের প্রতিক্রিয়ায় আনিসুল হক কি পাশ ফিরে শোবেন? যদি পারতেন, হয়তো তা-ই করতেন। হয়তো এখন তাঁর মনে হতো; ইস, কত কাজ অসম্পূর্ণ রেখে চলে আসতে হলো। ’

চার.

হ্যাঁ, কোনো কোনো মানুষের হঠাৎ চলে যাওয়া সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মেয়র আনিসুল হক, মধ্যরাতে কর্মস্থলের তদারকিতে ব্যস্ত আনিসুল হক, একালে দুর্লভ একজন সৎ ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ আনিসুল হকের প্রয়াণ তেমনই এক শোকাবহ ঘটনা হয়ে থাকল। ঢাকার মানুষ এরপর নানা ঘটনায় তাঁকে বারবার স্মরণ করবে। অনুভব করবে তাঁর অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট শূন্যতা। ভাববে, কবে আরেকজন আনিসুল হকের আবির্ভাব ঘটবে। দেখা মিলবে। আর ঢাকার বহু আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটবে।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী


মন্তব্য