kalerkantho


মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে

গাজীউল হাসান খান

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে

ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে শিয়াপন্থী ইরান ও লেবাননের গেরিলা সংগঠন হিজবুল্লাহকেই তারা একমাত্র হুমকি বলে মনে করে এখন। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের নেতৃত্বের প্রশ্নে সম্প্রতি পশ্চিম তীরের আল-ফাতাহ ও গাজার জঙ্গি সংগঠন হামাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিবাদের অবসান ঘটলে ইসরায়েলি আগ্রাসনবাদী নেতারা আপাতত কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়েছেন।

কিন্তু ইহুদিবাদী নেতারা বসে থাকার মানুষ নন। সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে তাঁরা এখন শিয়াপন্থী ইরানের বিরুদ্ধে সৌদিদের কাঁধে ভর করেছেন। তাঁদের ধারণা, শিয়াপন্থী ইরানের তীব্র  বিরোধিতাকারী ও বিশ্বব্যাপী সুন্নি মুসলিমদের নেতৃত্বদানকারী সৌদি আরবকে তাঁদের নীলনকশা অনুযায়ী কাজে লাগাতে পারলে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের সব স্বার্থই সিদ্ধ হবে। সুতরাং ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে সৌদি বাদশাহ এবং বিশেষ করে তরুণ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন তাঁরা। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ষোলো আনাই সমর্থন রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সুতরাং লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘর্ষে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বেশ আগে থেকেই। এ অবস্থায় এখন আলোচনা চলছে, কে কিভাবে আক্রমণ চালাবে।

জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের মদদদাতা ও সিরিয়ার গণবিরোধী আসাদ সরকারের সহযোগী হিসেবে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে চায় ইসরায়েল। কারণ অতীতে তাদের কাছে বারবার হেনস্তা হতে হয়েছে ইসরায়েলের ইহুদিবাদীদের।

ইসরায়েল যতবার লেবাননের সীমানা অতিক্রম করতে চেয়েছে, ততবারই তার যথাসাধ্য জবাব দিয়েছে লেবানন সরকারের পক্ষে হিজবুল্লাহ গেরিলা বাহিনী। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বসে সম্প্রতি পদত্যাগ ঘোষণা করেছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি। তাঁর অভিযোগ, হিজবুল্লাহ বাহিনীর সিরিয়াসহ অন্যান্য  দেশের মাটিতে যুদ্ধ করার কারণে লেবাননের সংখ্যাগুরু সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায় ও খ্রিস্টানরা হারিরির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। তেমন একটি অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি ব্যবস্থা নিতে গেলে তাঁর জীবনের প্রতি হুমকি এসেছে। সে জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হারিরি সৌদি আরবে গিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ভিন্ন বলে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে। কারো কারো মতে, হিজবুল্লাহ বাহিনী যাতে সিরিয়ার মতো ইরানের হয়ে ভবিষ্যতে আর ইয়েমেনসহ অন্যত্র যুদ্ধে অংশ নিতে না পারে সে জন্য তাদের প্রতিশ্রুতি আদায় করা। আর সাদ হারিরির পদত্যাগের ঘোষণাকে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের একটি পূর্বপরিকল্পিত ও সাজানো নাটক বলে অনেকে মনে করেন। লেবাননের সুন্নি মুসলিম প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে কি ডেকে নিয়ে সৌদি আরবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল? অনেকেই তা এখন আর বিশ্বাস করেন না। কারণ গতকালই হারিরি ফ্রান্সের পথে সৌদি আরব ত্যাগ করেছেন।

সাম্প্রতিককালে ইরান হয়ে উঠেছে একদিকে ইসরায়েল এবং অন্যদিকে সৌদি আরবের ‘কমন এনিমি’ বা সমভাবে দুশমন। ইসরায়েলের শত্রু হওয়ার মূল কারণ পারমাণবিক ক্ষেত্রে ইরানের প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। ফিলিস্তিনের মুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যকে ইসরায়েলের আগ্রাসন থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যেই ইরান পারমাণবিক ক্ষেত্রে প্রথম গবেষণা ও তৎপরতা শুরু করেছিল। ইরাকের প্রয়াত শাসক সাদ্দাম হোসেনও এককালে একই কারণে তাঁর ‘অসিরাক প্রকল্পে’র অধীনে ফ্রান্স থেকে এনে বাগদাদের কাছেই একটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে ইসরায়েল জঙ্গি বিমানের আঘাতে তা ধ্বংস করে দেয়। ইসরায়েলের সে আক্রমণেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদ ছিল। ইসরায়েলের ইরানবিরোধী তৎপরতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে ইরান সমর্থিত গাজা উপত্যকার হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গেরিলা বাহিনী, যারা এত দিন ইসরায়েলের আক্রমণ প্রতিরোধে আপসহীন ছিল।

হামাস ও হিজবুল্লাহ বাহিনী উভয়েই সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বে রাজতন্ত্রের ঘোর বিরোধী। এ ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে তাদের নীতিগত সম্পর্ক রয়েছে। তা ছাড়া সৌদি আরব চায় না মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া অধ্যুষিত ইরান পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হোক। সৌদি আরব কোনো মতেই সেটি বরদাশত করবে না। আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে সমগ্র ইরান ও ইরাকের বিশাল অংশ এবং সিরিয়া ও লেবাননের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ শিয়া অধ্যুষিত। সৌদি আরবের কট্টরপন্থীরা ইসলামিক বিশ্বে শিয়াদের ধর্মীয় অভ্যুত্থানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সুন্নি অধ্যুষিত ইসলামিক বিশ্বে এমন অনেকেই রয়েছে, যারা শিয়াদের মুসলমান বলেই মানতে চায় না। কিন্তু অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে যতই বিতর্কিত হোক, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সারা মুসলিম বিশ্বে ইরান অনেক এগিয়ে। তা ছাড়া ইরানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তার কাঙ্ক্ষিত অবস্থান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি গড়ে তুলতে চায়। সেখানে ইহুদিবাদী ইসরায়েলের ন্যূনতমভাবেও কোনো অংশ দেখতে চায় না ইরান।

ইরানকে শায়েস্তা কিংবা ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়ে ইহুদিবাদী ইসরায়েলকে কাছে টানার সৌদি চেষ্টাকে সুন্নি অধ্যুষিত মুসলিম বিশ্বের অনেকে মোটেও পছন্দ করছে না। কারণ ১৯৪৮ সালে আরব অধ্যুষিত মধ্যপ্রাচ্যে একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে যুক্তরাজ্য ও বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরায়েল শুধু সম্পূর্ণ ফিলিস্তিন দখলের পাঁয়তারা নয়, জর্দান, সিরিয়া ও মিসরের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। ইহুদি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার পর গত ৬৯ বছরেও ইসরায়েল ফিলিস্তিনি আরবদের মুক্তি বা স্বাধীনতা নিশ্চিত করছে না। বরং অবৈধভাবে বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড আরো গ্রাস করে নিচ্ছে। বারবার গাজা আক্রমণ করে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু হত্যা করছে। এ যুগে এ ধরনের বর্বরোচিত আচরণ কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের নীরব ভূমিকা এবং ইসরায়েলের প্রতি তাদের সহযোগিতা ও সমর্থনের কারণেই আজও ফিলিস্তিন তার স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়নি। অথচ ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গেরিলা বাহিনীকে আক্রমণ করার জন্য সৌদি আরব গোপনে হাত মিলিয়েছে ইসরায়েলের ইহুদিবাদী ষড়যন্ত্রকারী প্রধানমন্ত্রী  বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে।

আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজতন্ত্রের অধীন ছোট দেশগুলো নিজেদের আত্মরক্ষা কিংবা অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল হিসেবে সৌদিদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। কিন্তু সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত অনারব রাষ্ট্রগুলো সৌদি আরবের সে কৌশল মেনে নেবে কি না তাতে যথেষ্ট সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের আগ্রাসনবিরোধী লেবাননের হিজবুল্লাহ গেরিলা বাহিনীকে অকার্যকর করার জন্য লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে রিয়াদে ডেকে এনে সৌদিরা যে নাটক মঞ্চস্থ করেছে, তা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা ও গুজবের জন্ম দিয়েছে। শিয়াপন্থী হিজবুল্লাহ বাহিনী লেবাননের সুন্নি মুসলিম প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে তাঁর বাবার মতো হত্যা করার যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করা হয়েছে, আসলে তা কতটুকু সত্যি? অতীতে হিজবুল্লাহ গেরিলা বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলিদের আক্রমণ প্রতিরোধ করেছে কয়েকবার। অন্যদিকে সিরিয়ায় তারা প্রকাশ্যেই আসাদ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস) কিংবা জঙ্গিবাদী ও জিহাদিদের বিরুদ্ধে। সে কারণেই ইসরায়েল ও সৌদি আরব—উভয়ের কাছেই হিজবুল্লাহ শত্রুতুল্য। অন্যদিকে সৌদিদের ভয় হচ্ছে, হিজবুল্লাহর গেরিলা বাহিনী যদি ইয়েমেনে শিয়াপন্থী হুতি গেরিলাদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয় তাহলে সৌদিরা কোনোভাবেই নিজেদের পরাজয় ঠেকাতে পারবে না। সিরিয়ায় সৌদি সমর্থকদের যে পরিণতি হয়েছে, ইয়েমেনে তার পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা অনেক বেশি।

শিয়াপন্থী হিজবুল্লাহর পেছন থেকে সব কলকাঠি নাড়ছে ইরান। সৌদি আরবের বদ্ধমূল ধারণা এমনই। কারণ ইরান হিজবুল্লাহ বাহিনীর ভরণপোষণ করে, অস্ত্রশস্ত্র দেয়, এমনকি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডরা তাদের প্রশিক্ষণ দেয়। এ অবস্থায় হিজবুল্লাহ বাহিনী ও ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দেওয়া ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল ও সুন্নি মতাবলম্বী সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। সৌদিরা ইয়েমেনে ক্রমাগত বিমান হামলা না চালালে সেখানকার সৌদিপন্থী সুন্নি শাসকরা ক্ষমতায়ই থাকতে পারবেন না। কারণ সেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ হচ্ছে শিয়াপন্থী এবং রাজতন্ত্রবিরোধী। ইরান সে বিদ্রোহী জনতা ও হুতি বাহিনীকে সমরাস্ত্র ও সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে বলে সৌদিদের অভিযোগ। সুতরাং বৃদ্ধ সৌদি বাদশাহ ও তাঁর তরুণ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবার উঠেপড়েই লেগেছেন ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গেরিলাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, সে কর্মতৎপরতায় প্রকৃতপক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তাতে কি ইরান নিজেদের খুব সংকটাপন্ন মনে করছে? ঠিক তা নয়।

ইরানের কাছে সৌদি রাজতন্ত্রের ভেতরের সব খবরই আছে। বর্তমানে সৌদি রাজপরিবার ও প্রভাবশালী মহলে যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চলছে, তাতে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে সৌদি আরবে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটতে পারে। তার প্রভাব যে আরব উপসাগরীয় অন্যান্য রাজতন্ত্রে পড়বে না, তা নয়। ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের কৌশলী রাজনীতিকরা সে সময়েরই অপেক্ষা করছেন যখন মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটবে এবং অন্যদিকে ইরান পর্যুদস্ত হয়ে নতজানু হবে। একমাত্র তেমন একটি পরিস্থিতিতেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করা ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব হবে। আপাতত সৌদি আরব সে চিন্তাভাবনা করতে প্রস্তুত নয়। তারা আপাতত ইয়েমেনে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। তাদের সে পথে বর্তমানে কাঁটা হয়ে আছে ইরান ও হিজবুল্লাহ বাহিনী। তাই সৌদিরা ইসরায়েলিদের সাহায্যে যুদ্ধ বাধাতে চায় লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে। সে সংঘর্ষে ইরান এগিয়ে এলে তার ওপরও আক্রমণ চালানো হবে নির্দ্বিধায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের এ ব্যাপারে সমঝোতা রয়েছে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

ইহুদি প্রভাবাধীন যুক্তরাষ্ট্রের  ইসরায়েলপ্রীতির কারণেই ইরানের পারমাণবিক চুক্তির বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এত আপত্তি ও মতবিরোধ। ইহুদি রাজনীতিকদের রণনীতি ও রণকৌশল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তাঁরা মনে করেন, বিশ্বের একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে নিতে হবে। একমুহূর্তও তাদের বসে থাকার অবকাশ নেই। অনেকের মতে, এটিই হচ্ছে ইহুদিবাদ। কিন্তু মধ্যখান থেকে এখন চরম সংকটে পড়েছেন লেবাননের সাদ হারিরি। তাঁর পক্ষে কি দেশে ফিরে যাওয়া কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এখন পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করা সম্ভব? ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে কী কথা হয়েছে সৌদি শাসকদের, তা এখনো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। সব কিছু দেখে মনে হচ্ছে, একটি সংঘাত যেন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে। অথচ সিরিয়া মোটামুটি আইএসমুক্ত হলেও তার ভবিষ্যৎ কী হবে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। সিরিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বাশার আল আসাদকে কিভাবে সরানো সম্ভব হবে এবং জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে কী পরিমাণ সময় লাগতে পারে তা কেউ জানে না। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হলে তার পরিণতি কী হবে? বর্তমান অবস্থায় সৌদি আরব ও ইসরায়েলের হিজবুল্লাহ ও ইরানকেন্দ্রিক রণ পাঁয়তারা বন্ধ করার মতো শক্তিশালী নেতৃত্ব তেমন দেখা যাচ্ছে না। রাশিয়ার নেতা ভ্লাদিমির পুতিন কিংবা তুরস্কের নেতা এরদোয়ান ছাড়া উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা এবং বর্তমান সংকট নিরসনের জন্য আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সৌদি আরব কিংবা ইসরায়েল কি তাদের কথা শুনবে? যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যত সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাপারে একাত্ম হয়ে বসে আছে বলেই মনে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় টিকে থাকা ট্রাম্পের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে উঠলে তিনি নিজেই একটি যুদ্ধবিগ্রহ বাধিয়ে দিতে পারেন বলে অনেকে মনে করেন।

কিছুদিন আগে দক্ষিণ লেবানন সীমান্তে ইসরায়েল একটি সামরিক মহড়া পরিচালনা করেছে এবং সেটি ছিল অনেকটা উসকানিমূলক। সৌদি আরবের দাবি হিজবুল্লাহর বিদেশের মাটিতে গিয়ে যুদ্ধ করার প্রয়াস সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। লেবাননের সাদ হারিরি বলেছেন, হিজবুল্লাহ তা বন্ধ করার নিশ্চয়তা না দিলে তিনি পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করবেন না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হিজবুল্লাহ কি চাপের মুখে সত্যিই সে দাবি মেনে নেবে? যদি মেনে না নেয় তাহলে এ অঞ্চলে একটি সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে। আর যদি তাই হয়, তবে তার শেষ কোথায় কেউ জানে না।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com


মন্তব্য