kalerkantho


সময়ের প্রতিধ্বনি

পাঠকের চাহিদা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা

মোস্তফা কামাল

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পাঠকের চাহিদা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা

আগামী বছরের ১০ জানুয়ারি কালের কণ্ঠ আট পেরিয়ে নবম বর্ষে পা দেবে। অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে আমরা দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সুধীসমাবেশ ও প্রতিনিধি সম্মেলন করছি।

গত মাসে পুণ্যভূমি সিলেট থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে রংপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে সম্মেলন করেছি। আগামী শুক্রবার রাজশাহীতে আমরা পাঠকের মুখোমুখি হব। প্রতিটি সুধীসমাবেশে ওই অঞ্চলের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, আইনজীবী, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের কণ্ঠ প্রকাশের পর এবারই প্রথম আমরা পাঠকের মুখোমুখি হয়েছি। সর্বত্রই ব্যাপক সাড়া পেয়েছি; তাঁদের মতামত ও আলোচনা-সমালোচনা গ্রহণ করেছি। পাঠকের চাহিদার কারণে এর মধ্যেই আমরা পত্রিকায় নানা ধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছি। নবম বর্ষে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে আরো বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। আমরা সে অঙ্গীকার তাত্ক্ষণিকভাবেই পাঠকের কাছে করেছি।

এবার আমি বিভিন্ন অঞ্চলের পাঠকের কিছু মন্তব্য এখানে তুলে ধরছি। এ বিষয়ে আরো কয়েকটি নিবন্ধ লিখব। সেখানে বিস্তারিতভাবে পাঠকের মতামত উঠে আসবে হয়তো। আমার ধারণা, সব বিভাগের সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের মতামতের ভেতর দিয়ে পুরো দেশের চিত্র উঠে আসবে। তাতে কালের কণ্ঠ’র পাঠকরা দেশের মানুষের ভাবনা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাবেন।

সুধীসমাবেশে যোগ দিয়ে অনেকেই আমাদের পত্রিকার ভালো-মন্দ নিয়ে কথা বলেছেন। কেউ কেউ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও কথা বলেছেন। তবে সর্বত্রই যে বিষয়টি লক্ষ করা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা আত্মসমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, জাতীয় রাজনীতি বিরোধপূর্ণ হওয়ার কারণে তাঁরা একসঙ্গে বসতে পারেন না। খোলামনে কথা বলতে পারেন না। অনেক সময় বিরোধপূর্ণ রাজনীতির কারণে আত্মীয়তার সম্পর্কেও ফাটল ধরছে। বিগত এক দশকে রাজনীতিতে এই পরিবর্তন (অধঃপতন) ঘটেছে।

স্থানীয় সুধীসমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল সংসদের বাইরে থাকায় দেশে এককেন্দ্রিক শাসন চলছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা ধরাকে সরাজ্ঞান করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তারা এলাকাছাড়া করেছে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। এসব খবর পত্রিকায় খুব একটা আসে না। ফলে পত্রিকার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে নিজেদের মত প্রকাশের জন্য ফেসবুক ব্যবহার করছে। আবার অনেকে এর অপব্যবহারও করছে।

কোনো কোনো বক্তা এও বলেছেন, দেশে শত শত নিউজ পোর্টাল প্রতি মুহূর্তে সংবাদ দিচ্ছে। টিভি চ্যানেলগুলো মুহূর্তে মুহূর্তে নিউজ আপডেট দিচ্ছে। যাদের হাতে স্মার্ট মোবাইল ফোন আছে তারা প্রতি মুহূর্তে জেনে যাচ্ছে বিশ্বের নানা ঘটনার খবর। তা ছাড়া ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন খবরের উৎসে পরিণত হয়েছে। পরদিন পত্রিকায় বাসি খবর পড়ার জন্য কেন পত্রিকা কিনবে?

সুধী পাঠকদের এ প্রশ্ন অবান্তর নয়। বাসি খবর পড়ার জন্য তাঁরা ১০ টাকা খরচ করবেন না। তবে খবরের সত্যাসত্য এবং ঘটনার পেছনের ঘটনা, খবরের পেছনের খবর জানার জন্য এখনো পত্রিকার কোনো বিকল্প নেই। মিথ্যা খবর দিয়ে পত্রিকা বের করলে তা বেশি দিন টিকে থাকে না। পাঠক ধরার জন্য চটকদার খবর দিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য জনপ্রিয়তা অর্জন করা সম্ভব হলেও সেই পত্রিকা গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে পারে না।

যদিও ফেসবুকে অপপ্রচার চালিয়ে রামু, নাসিরনগর এবং রংপুরে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা আমাদের আতঙ্কিত করে। কোনো কোনো নিউজ পোর্টালে ভুয়া খবর ছড়িয়ে নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। কিছু সংবাদপত্রও বিভ্রান্তিতে পড়ে ভুয়া খবর ছাপে। তাতে পাঠকরা বিভ্রান্তিতে পড়েন। তা ছাড়া পত্রিকাজুড়ে নেতিবাচক খবরও এখন আর মানুষ দেখতে চায় না। নেতিবাচক খবর পড়ে কর্মস্থলে যেতে চায় না। আবার শুধু ইতিবাচক খবর দিয়েও পুরো পত্রিকা করলে জনপ্রিয়তা পাবে না। ফলে প্রতিদিন নতুন একটি পত্রিকা করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চ্যালেঞ্জ যে শুধু বাংলাদেশের সংবাদপত্রের, তা নয়। সারা বিশ্বের সংবাদপত্রই চ্যালেঞ্জের মুখে। পাঠক কমে যাওয়ার কারণে বিশ্বের বিখ্যাত পত্রিকাও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। কোনো কোনো সংবাদপত্র কর্মী ছাঁটাই করে লোকসান কমিয়ে টিকে থাকছে। আবার অনেকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেও টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের চ্যালেঞ্জ নানামুখী। এখানে বিজ্ঞাপনের বাজার অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু মিডিয়ার সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিনিয়তই মিডিয়ার সংখ্যা বাড়ছে। আর বিজ্ঞাপনের বাজার কমছে। ই-টেন্ডারিংয়ের কারণে সরকারি বিজ্ঞাপন মাত্রাতিরিক্ত হারে কমে গেছে। বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতারা ঝুঁকছে ফেসবুক-গুগলের দিকে। ফলে সংবাদপত্র অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি এবং প্রভাবশালী মহলের চাপে সংবাদপত্রশিল্পের চিঁড়েচ্যাপ্টা অবস্থা। গণতন্ত্র যেমন বারবার হোঁচট খাচ্ছে, গণমাধ্যমও তাতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ রকম বৈরী পরিবেশে পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী পত্রিকা করা খুবই কঠিন কাজ। তার পরও নানা কৌশল অবলম্বন করে আমরা পত্রিকা করছি। পত্রিকাকে এগিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে পাঠকরা সহযোগিতা করছেন এবং শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছেন। আসলে একটি সংবাদপত্রের মূল চালিকাশক্তিই তো তার পাঠক।

সেই পাঠকরাই জানালেন তাঁদের চাহিদার কথা; তাঁদের অভাব-অভিযোগের কথা। তাঁরা বললেন, সরকারের ভেতরের খবর, অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতির খবর সাহস করে প্রকাশ করতে হবে। দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক (মন্ত্রী-সচিব কিংবা উঁচুস্তরের মানুষ) ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রতিহিংসার রাজনীতি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। এ ধরনের প্রবণতা নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট করতে হবে।

পাঠকরা আরো জানান, এমন কোনো খবর ছাপা যাবে না, যে খবর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে। যে খবরের কারণে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্যও কিছু করা ঠিক নয়। অর্থাৎ পাঠকরা বারবার সততা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

আমরাও আট বছর ধরে সততা, দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারির সঙ্গে পত্রিকাটি পরিচালনা করে আসছি। আমাদের কাজে ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি নেই। আমাদের চেষ্টা ও ইচ্ছাশক্তি প্রবল। আমরা সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে চাই। আমাদের নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নেই। আমাদের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি বিশেষ কোনো দুর্বলতাও নেই। তবে দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে কোনো আপস নেই। আমরা শুরুতেই এ অঙ্গীকার করেছিলাম; এখনো সেই অবস্থান থেকে একচুলও নড়িনি, ভবিষ্যতেও নড়ব না। পাঠকরা নিশ্চয়ই তা লক্ষ করেছেন।

সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। যার পাশে কেউ দাঁড়ায় না, তার পাশে কালের কণ্ঠ দাঁড়ায়। প্রভাবশালীদের চোখরাঙানিতে আমাদের কলম থেমে যায় না। আমাদের সব কর্মী সততা ও নৈতিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। কারো বিরুদ্ধে অসততা কিংবা নৈতিক অবক্ষয়ের অভিযোগ নেই। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা অবশ্যই তা যাচাই-বাছাই করি। কোনো রকম সত্যতা পাওয়া গেলে কালের কণ্ঠ পরিবার তাকে বর্জন করে। এর বেশ কিছু নজির আমরা দিতে পারব।

তবে এ কথাও স্বীকার করি, ঘুণে ধরা সমাজে সব কিছুতেই পচন ধরেছে। গণমাধ্যম নিশ্চয়ই এর বাইরে নয়। আবার সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বেও কেউ নন। আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। তার মধ্যেও আমরা সুসাংবাদিকতা করার চেষ্টা করি। আমরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, সততা ও নৈতিকতাই আমাদের পুঁজি। আর লাখ লাখ পাঠকের অনুপ্রেরণা আমাদের শক্তি। এই দুইয়ের ওপর ভর করেই আমাদের পথচলা।

আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আমাদের দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রের কাছে, আমাদের দায়বদ্ধতা সমাজের কাছে ও পাঠকের কাছে। বিশ্বের দুই শতাধিক দেশে বাঙালি পাঠকরা কালের কণ্ঠ অনলাইন ভার্সন পড়েন। কালের কণ্ঠ’র ৭১ লাখ ফেসবুক ফ্যান। এরাই আমাদের প্রতিনিয়ত সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগায়। পাঠকের চাহিদা ও রুচির কথা বিবেচনা করেই আমরা প্রতিদিন সুসম্পাদিত নতুন একটি কালের কণ্ঠ প্রকাশ করি। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই আমাদের চলার পথে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। তার পরও আমাদের কোথাও যদি কোনো ভুলভ্রান্তি থাকে, তাহলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক    

mostofakamalbd@yahoo.com


মন্তব্য