kalerkantho


মুখে মুখে একই কথা, আজব তো!

রেজানুর রহমান

১৬ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মুখে মুখে একই কথা, আজব তো!

বর্তমান সময়ে একটা শব্দ বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা কথায় কথায় শব্দটি ব্যবহার করে।

তাদের কাছে অবাক অথবা বিস্ময়কর কিছু মনে হলেই বলে ওঠে, আজব তো! গত কয়েক দিন ধরে আমি এই শব্দটির পেছনেই ছুটছি। কী এক ‘ব্লু হোয়েল’ ঘটনা নিয়ে সারা দেশ তোলপাড়। এটি একটি প্রাণঘাতী খেলার নাম। যে খেলায় মৃত্যু অবধারিত। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ টেলিভিশনের কোনো কোনো টক শোতে এই খেলার বিশদ বর্ণনাও তুলে ধরা হচ্ছে। একটি সংবাদভিত্তিক টেলিভিশনে দেখলাম, ব্লু হোয়েল খেলছে এমন একজন বিপথগামী তরুণকে হাজির করা হয়েছে। কথা বলার সময় তার মুখে, অভিব্যক্তিত্বে অপরাধের কোনো চিহ্নই চোখে পড়ল না। বরং সে হিরোর মতো কথা শোনাচ্ছে। কেন তাকে এই অনুষ্ঠানে হাজির করানো হলো ভেবে পেলাম না। তখনই শব্দটার কথা মনে পড়ল—আজব তো!

কয়েক দিন আগে দেশের একটি পত্রিকায় পড়লাম, শর্ত মেনে আমরা নাকি রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছি। পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গাদের শরণার্থী বলবে না বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও বাংলাদেশ এখন মিয়ানমারের এসব নাগরিকের জন্য বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিতে যাচ্ছে। ’ রিপোর্টে এদতসংক্রান্ত আরো অনেক বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ বাংলাদেশ তার নাগরিকদের জন্যই নিতে পারে, রোহিঙ্গাদের জন্য নয়। লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর মিসর ও তিউনিসিয়া হয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য আর্থিক সহায়তা নেওয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। কিন্তু ওই পরিস্থিতির সঙ্গে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা। তাই এখানে রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেওয়ার যৌক্তিকতা দেখা যাচ্ছে না। ’ তাহলে ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো এ রকম একটা শিরোনাম কেন পত্রিকায় প্রকাশ হলো? আজব তো!

রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের জাতীয় সমস্যা নয়। এটি একটি মানবিক সমস্যা। মানুষ মানুষের জন্য—মানবিক এই বোধ থেকে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এরই মধ্যে মিয়ানমারের একজন মন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছিলেন সমস্যাটির ব্যাপারে কথা বলতে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে অচিরেই সমস্যাটির সমাধান করা হবে বলে আশ্বাস দিয়ে নিজ দেশে চলে যান মিয়ানমারের সেই মন্ত্রী। আশ্বাস মানেই তো বিশ্বাস। আমরা ভেবেছিলাম, এবার বোধকরি রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে যাচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি তো তা বলছে না। দেশের একটি দৈনিকে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং লেইং ও মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির মন্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত দুটি রিপোর্ট দেখে অনেক প্রশ্ন মাথায় উঁকি দিয়েছে। মিয়ানমারের সেনাপ্রধান রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, তারা রাখাইনের স্থায়ী বাসিন্দা নয়। অন্যদিকে সু চি বলেছেন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আলোচনা চলছে। মিয়ানমারের সেনাপ্রধানই মূলত সে দেশের হর্তাকর্তা। কাজেই তাঁর কথা অনুযায়ী মনে হচ্ছে, মিয়ানমার বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সহজেই ফেরত নেবে না। তাহলে সু চি যা বলছেন, তার কি কোনোই ভিত্তি নেই! আজব তো ব্যাপারটা!

ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শিরোনামে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয় পড়ে আমাদের তাৎক্ষণিক পাওয়া না-পাওয়ার ক্ষতিকর দৃশ্যের কথা ভেবে যারপরনাই অবাক হলাম। সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সরকার ১ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে মা ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই জেলেরা বিভিন্ন স্থানে মাছ ধরছেন। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করতে জেলেরা বিভিন্ন কৌশল নিচ্ছেন। মৎস্য বিভাগের লোকজন সাধারণত দিনে অভিযান চালান। তাঁদের সেই অভিযান শেষ হওয়ার পর জেলেরা নদীতে নামেন মাছ ধরতে।

এটা তো এক ধরনের লুকোচুরি-লুকোচুরি খেলা। চোর-পুলিশ খেলাও বলা যায়। যতক্ষণ টহল চলবে ততক্ষণ মাথা গুঁজে পড়ে থাকো। টহল শেষ, চলো অন্যায় করি। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন নদীতে মাছ ধরা কি অন্যায় কাজ? ধরলাম অন্যায় কাজ নয়। সরকার একটি নির্ধারিত সময়ের জন্য কেন নদীতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ধরতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে—এ কথা কি আমরা গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছি? ১ থেকে ২২ অক্টোবরের মধ্যরাত পর্যন্ত সময়টাকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এ সময় ঝাঁকে ঝাঁকে ডিমওয়ালা মা ইলিশ সাগর থেকে উপকূলীয় লোনা পানিতে এসে ডিম ছাড়ে। আর তাই ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের জন্যই এ সময়টাতে মাছ ধরতে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে। এতে কার লাভ? সরকার না জেলেদের? তর্কের খাতিরে হয়তো অনেকে বলবেন, জেলেদের লাভ কোথায় দেখলেন? তারা তো ভাই দিনের রোজগার দিনে খায়। ২২ দিন তাদের কাজ নেই। অর্থ পাবে কোথায়? খাবে কী? এরও উত্তর আছে। এই ২২ দিনে জেলেদের জন্য সরকারি পর্যায়ে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। ধরা যাক সরকার আর্থিক সহায়তা দিল না, তবুও নিজেদের স্বার্থেই তো জেলেদের উচিত ইলিশের প্রজনন সময়ে নদীতে মাছ না ধরা। আমরা নগদ যা পাই তাতেই তৃপ্ত থাকার লড়াই করি। ভবিষ্যতের কথা মোটেও ভাবি না। ধরা যাক, সরকার নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিল। জেলেরা দেদার নদীতে ইলিশ ধরল। মা ইলিশ নদীতে ডিম ছাড়তে পারল না। পরের মৌসুমে নদীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যাবে? তখন পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তখন ২২ দিন নয়, ২২ মাসেও রাত-দিন পরিশ্রম করে তো নদীতে ইলিশ পাওয়া যাবে না! তখন কে কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে? কথায় আছে, ‘আমরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝি না’। আজব তো!

অনেক ভারী ভারী কথা হলো। এবার একটু আনন্দ-বিনোদন নিয়ে বলি। পত্রিকায় দেখলাম উত্তর জনপদের কুড়িগ্রাম জেলা শহরের শেষ সিনেমা হলটিও শেষ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম শহরে একসময় ঝিনুক, চিত্রা, পূর্বাশা ও মিতালী নামে চারটি সিনেমা হল ছিল। নতুন ছবি মুক্তি পেলে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে টিকিট পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। অথচ দর্শকখরার কারণে ঝিনুক, চিত্রা ও পূর্বাশা আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। মিতালী ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। এই হলের শেষ সিনেমা ছিল শাকিব ও বুবলি অভিনীত অহংকার। কষ্টের কথা হলো— শহরজুড়ে ছবির পোস্টারে লেখা ছিল ‘আগামী ২২-১০-২০১৭ বৃহস্পতিবার আজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মিতালী সিনেমা হল। শেষবারের মতো ছবি দেখতে চাইলে দেখে নিন। ’ আমাদের এত বড় একটা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি। সিনেমাকে বাঁচাব বলে কত কথা, কত বিবৃতি দিচ্ছি প্রতিদিন। নতুন সংগঠনের জন্ম হচ্ছে। যেন মশারির ভেতরে মশারি। কিন্তু সিনেমা হলই যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সিনেমা নিয়ে এত কথা বলে, দলবাজি করে লাভ কী?

আজব তো...।

লেখক : সম্পাদক, আনন্দ আলো


মন্তব্য