kalerkantho


অতি উৎসাহীরা ক্ষমতার অন্তরায়

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



অতি উৎসাহীরা ক্ষমতার অন্তরায়

একটানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জ। আগামীতে ক্ষমতায় আসতে পারলে বাংলাদেশে নতুন ইতিহাস তৈরি হবে। কারণ এর আগে কোনো দল কিংবা গোষ্ঠী একটানা এত লম্বা সময় এ দেশে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। শুধু বাংলাদেশে নয়, যেকোনো রাষ্ট্রেই একই দলের পর পর তিনবার ক্ষমতায় আসা সহজ নয়। এটা শুধু অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল বিশ্বে নয়, উন্নত বিশ্বেও। এমনকি যেকোনো দলের পক্ষেই দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসাও অনেকটা কঠিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন চার্চিল। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শক্তিশালী নেতা ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি ছিলেন জেনারেল। ময়দানে যুদ্ধ করা সেনাপতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মিত্রশক্তির বিজয় নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন।

যুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচন হয়, সে নির্বাচনে ব্রিটেনের মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর অবদান ও অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা বিবেচনায় নেয়নি। তারা ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিয়েছিল শ্রমিক দলকে। অ্যাটলি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব কমই আছে, যারা সরকার কিংবা সরকারপ্রধানের সাফল্যের কথা চিন্তা করে ভোট দেয়। মূলত যেকোনো দেশেই সরকারবিরোধী একটি চেতনা থাকে। আর এই চেতনাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো মাঠে তত্পর হয়। খুঁটিনাটি অজুহাতে সরকারের সমালোচনায় নেমে পড়ে। ক্ষমতায় যিনি বা যাঁরাই থাকুন, তাঁদের কাছে সাধারণ মানুষের কিছু প্রত্যাশা থাকে। এই প্রত্যাশায় রকমফের হলেই সরকারি দলের বারোটা বাজতে শুরু হয়।

ভুল-ভ্রান্তি, সফলতা-ব্যর্থতা, ভালো-মন্দ—সবকিছু নিয়েই সরকারের যাত্রা হয়ে থাকে। আর সেই যাত্রায় অনেক সময় নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করে থাকে। অনেকই আছেন সুবিধা নেওয়ার আশায় চাটুকারিতা ছাড়া আর কিছু বোঝেন না। তাঁরা সরকারের ভূমিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁদের চোখে কোনো খারাপ ধরা পড়ে না। এমনকি সরকার কোনো ভুল করলে সেটিই ঠিক বলে নিজেরা যুক্তি স্থাপনের অপচেষ্টায় লিপ্ত হন। আবার অনেকেই আছেন দলকে ভালোবাসেন, তাই সমালোচনাও করেন। উল্লেখ্য, ইদানীং সরকারি দলের ভেতর কিছু অতি উৎসাহী আছেন, যাঁরা সমালোচনা নয় বরং অতি আলোচনায় দলের ক্ষতি করে যাচ্ছেন। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ’। বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, যাঁরা অতি আলোচনা, অতি ভক্তি কিংবা অযথা প্রশংসায় লিপ্ত তাঁদের বেশির ভাগই সুবিধাবাদী।

দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় ইদানীং যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই আওয়ামী লীগার। এই আওয়ামী লীগারদের হিসাব করলে খুব সহজেই তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার কথা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। আমি মনে করি, এ জন্য আওয়ামী লীগের মূল চ্যালেঞ্জ সুবিধাবাদীদের তত্পরতা। প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগপ্রধান অল্প কিছুদিন আগে এক বক্তব্যে বলেছেন, ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যাঁরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন তাঁরাই প্রকৃত আওয়ামী লীগার। কারণ তাঁদের ত্যাগ অনেক বেশি। তাঁরাই বিএনপি-জামায়াত দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এবং ওয়ান-ইলেভেনে ভূমিকা রেখেছেন। এটাই দলের নিরেট বাস্তবতা।

আওয়ামী লীগের মাথায় যখন আগামী নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের দ্বন্দ্ব-সংঘাত মাথাচাড়া দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেশের অন্যতম সমালোচিত ইস্যু। সরকারি দলের নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সত্ত্বেও নির্বাচনে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলো নিজেদের গ্রুপিং কিংবা অভ্যন্তরীণ কোন্দল। আর সেই কোন্দল পুঞ্জীভূত করে রাখলে দলের পরাজয় ডেকে আনা ছাড়া আর কিছুই সামনে থাকে না। সম্প্রতি চট্টগ্রামে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলি হয়েছেন এক ছাত্রলীগ নেতা। বাসা থেকে ডেকে নিয়ে তাঁকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কলেজের রাজনীতি নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখির কারণে সৃষ্ট বিরোধিতার জের ধরেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে। এই অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে সংগঠনটির অনেক নেতাকর্মী এখন আর কোনো সমালোচনাকে ভালো চোখে দেখছে না। অথচ যেকোনো গণতান্ত্রিক সংগঠনের অভ্যন্তরে বিরোধী মত থাকবে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে একটি সংগঠন নিজেদের সঠিক কাজ নির্ধারণ করবে। খবরের কাগজে এই হত্যাকাণ্ডের যেসব সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান করার চেষ্টা করলাম, তাতে কোনোটিই মূল দলের ভবিষ্যতের জন্য শুভ নয়। দলের সমালোচনা থাকবে, নেতাকর্মীদের আধিপত্য থাকবে, নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর জন্য হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটতে থাকলে সংগঠনে নেতৃত্বের সংকট হবে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছাত্রলীগ আলোচনায় আসে বেপরোয়া আচরণের কারণে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এই ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনটি এখন নিজেদের মধ্যেই কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কোন্দলের খবর পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্য কোনো ছাত্রসংগঠন এখন ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ নয়। ছাত্রলীগই ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রায়ই কোনো না কোনো দলীয় সভায় রাখঢাক না করে সরাসরি কথা বলেন। মাঝেমধ্যে নেতাকর্মীদের হুমকি-ধমকিও দেন। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন। কিছুদিন আগে, সিলেটের সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় প্রতিনিধি সমাবেশে তিনি বলেছেন, ‘প্রচার লীগ, তরুণ লীগ, কর্মজীবী লীগ, ডিজিটাল লীগ, হাইব্রিড লীগ আছে। কথা হাছা, সংগঠনে কাউয়া ঢুকছে। জায়গায় জায়গায় কাউয়া আছে। পেশাহীন পেশিজীবী দরকার নেই। ঘরের ভেতর ঘর বানানো চলবে না। মশারির ভেতর মশারি টানানো চলবে না। ’ তাঁর এই বক্তব্য থেকেও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠন ও আওয়ামী লীগারদের শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে।

শেষ কথা হলো, নিজেরা কামড়াকামড়ি করে আগামী নির্বাচনে নিজেরাই নিজেদের পথের কাঁটা হওয়া থেকে দূরে সরে আসতে হবে। দেশ ও জাতির উন্নয়ন করতে হলে রাষ্ট্রক্ষমতার চাবি হাতে থাকা যেহেতু জরুরি, সেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতায় যাওয়া। ক্ষমতায় যেতে অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হতে আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি এখন মরিয়া হয়ে উঠবে—এমনটাই স্বাভাবিক। এখন উভয় দলই পারস্পরিক ও পাল্টাপাল্টি ভুল ধরাধরিতে ব্যস্ত। এ ক্ষেত্রে বিএনপির হাতে প্লাস পয়েন্ট রয়েছে। অন্যদিক আওয়ামী লীগের সামনে রয়েছে চ্যালেঞ্জ। কারণ আওয়ামী লীগ যেহেতু ক্ষমতায় আছে, সরকারি কার্যক্রম পরিচালনায় ভুল হওয়ার আশঙ্কা তাদেরই বেশি। অন্যদিকে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাদের ভুল হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপি অতি সাবধানী হয়ে উঠেছে। ভুল এড়িয়ে নির্বাচনের দিকে যাওয়া আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com


মন্তব্য