kalerkantho


মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের পর্যালোচনা জরুরি

অনলাইন থেকে

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মিয়ানমারে গত ৩৫ বছরে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। এসব পরিবর্তন নাগরিকত্ব আইনের কিছু দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে।

এর কারণে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে; যারা নাগরিক নয় তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। আইনটি অন্য কিছু আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মিয়ানমার কর্তৃক অনুমোদিত আন্তর্জাতিক বিধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। গত কয়েক দশকে যেভাবে আইনটি প্রয়োগ করা হয়েছে, তাতে প্রজন্মান্তরে বসবাসরত সম্প্রদায়গুলোর দাবির ন্যায্যতা স্বীকার করা হয়নি। এসবের মধ্যে রাখাইনের মুসলিমরা সবচেয়ে বড় সম্প্রদায়, তবে একমাত্র সম্প্রদায় নয়।

১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের কিছু ধারা আন্তর্জাতিক নীতি-বিধির সঙ্গে (যেমন আন্তর্জাতিক আইনের অবৈষম্যের নীতি) এবং মিয়ানমার স্বাক্ষরিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। উল্লেখ্য, শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) অনুমোদনকারী (মিয়ানমারও করেছে) সব দেশকে জাতীয় আইনের নিরিখে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে শিশুর নাগরিকত্বের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, এটি রক্ষা করতে হবে এবং মান্য করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে তো মানতেই হবে যে ক্ষেত্রে না মানলে শিশু রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে। জন্মসনদ নাগরিকত্ব প্রাপ্তি নিশ্চিত করে না, সিআরসি বিষয়ক কমিটির সিদ্ধান্ত হলো, শিশুর স্বার্থরক্ষার সর্বোত্তম উপায় জন্মের পরপরই তাকে নাগরিকত্ব দেওয়া; ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়ে রাখা উচিত নয়।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে।

এসবের ফলে ক্রমান্বয়ে রাখাইনের মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে তাদের কিছু মাত্রায় স্বীকৃতি ছিল। সামরিক শাসনামলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ১৯৭৮ ও ১৯৯১ সালে ব্যাপক অভিযান চালিয়ে সরকার দুই লাখের বেশি মুসলিমকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়।

১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে বলা হয়েছে, যারা এ আইন কার্যকর হওয়ার আগে নাগরিক ছিল তাদের নাগরিকত্ব বহাল থাকবে। কিন্তু এ আইন ও এটিকে কার্যকর করার প্রক্রিয়ার কারণে রাখাইনের মুসলিমদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়। ১৯৮৯ সালে পুরো মিয়ানমারে নাগরিকত্ব নিরীক্ষণ প্রক্রিয়া চালানো হয়। যারা নতুন শর্তাবলি পূরণ করতে পারছে বলে মনে হয়েছে তাদের ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন কার্ড (এনআরসি) বদলে সিটিজেনশিপ স্ক্রুটিনি কার্ড (সিএসসি) দেওয়া হয়। রাখাইনের এনআরসিধারী বেশির ভাগ মুসলিম কার্ড জমা দেয়। কিন্তু তাদের কখনোই সিএসসি দেওয়া হয়নি, ফলে কার্যত তারা রাষ্ট্রহীন।

রাখাইনের যেসব মুসলিমের পরিচায়ক নথিপত্র ছিল না তাদের এবং ফেরত আসা শরণার্থীদের জন্য ১৯৯৫ সালে কর্তৃপক্ষ টেম্পোরারি রেসিডেন্সি কার্ড (টিআরসি বা সাদা কার্ড) ইস্যু করতে শুরু করে। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সরকার সব টিআরসি বাতিল ঘোষণা করে এবং সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনাল টিআরসিধারীদের ভোটদানে অযোগ্য ঘোষণা করে। রাখাইনের মুসলিমদের প্রার্থী হওয়ার বা ভোট দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আগের (১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর) সব নির্বাচনে তারা ভোট দিয়েছে।

রাখাইনের মুসলিমদের ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়েছে; তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব পুরোপুরি নাকচ করা হয়েছে। তাদের মৌলিক অধিকার খর্বিত হয়েছে, দৈনন্দিন জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মুসলিম (কারো কারো বৈধ নাগরিকত্ব বিষয়ক কাগজপত্র রয়েছে) আইডিপি (ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পিপল) ক্যাম্পে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

১৯৮২ সালের আইন ও ১৯৮৩ সালের বিভিন্ন বিধি-ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের নাগরিকত্বের কথা বলা হয়েছে। একদিকে রয়েছে ‘নাগরিক’ বা ‘জন্মগত নাগরিক’, অন্যদিকে রয়েছে ‘অবস্থানগত নাগরিক’। ‘জন্মগত নাগরিকত্ব’ শুধু ‘জাতীয় নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী’র জন্য, যারা মিয়ানমার নামের ভূখণ্ডে ১৮২৩ সালের আগে থেকে বাস করছে।

নাগরিকত্বের দুই ধরনের ক্ষেত্রেই শিশুর ওপর নাগরিকত্বের অধিকার বর্তায় মা-বাবার মর্যাদার ভিত্তিতে। ‘নাগরিক’-এর সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিক হওয়ার অধিকার রাখে যদি না মা-বাবার কেউ বিদেশি হয়। ‘অবস্থানগত নাগরিক’-এর সন্তান নাগরিক হবে যদি মা-বাবার কেউ ‘নাগরিক’ হয় বা তাদের কেউ দুজন ‘অবস্থানগত নাগরিক’-এর সন্তান হয়। অন্য সব ক্ষেত্রেই ‘অবস্থানগত নাগরিক’-এর সন্তানকে ‘অবস্থানগত নাগরিকত্ব’-এর জন্য অরেক শর্ত পূরণ করে আবেদন করতে হবে। ‘অবস্থানগত নাগরিকত্ব’ স্বয়ংক্রিয় নয়। এ নাগরিকত্ব অনেক সহজে খারিজ করা বা রদ করা যায়।

শুধু মিয়ানমার নয়, অন্যান্য দেশেও নাগরিকত্বের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। তবে সেসব দেশে নাগরিকত্বের একাধিক ধরন খুবই সুনির্দিষ্ট কারণে বিবেচনা করা হয়। সব নাগরিকের সমানাধিকারের স্বার্থে নাগরিকত্বের একটি ধরনই কাম্য।

সুপারিশ

১৭. ১৯৮২ সালের আইনকে নাগরিকত্ব পাওয়ার ভিত্তি ধরে নিয়ে কমিশন বলতে চায়, এটির পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। সে ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে:

শিশু অধিকার সনদের ৭ ও ৮ ধারাসহ যেসব আন্তর্জাতিক বিধি ও চুক্তি মিয়ানমার অনুমোদন করেছে, আইনটিকে সেসবের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে হবে।

নাগরিকত্বের বিভিন্ন ধরনের মধ্যে পার্থক্য ঘোচাতে হবে।

এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে কোনো ব্যক্তি নাগরিকত্ব না হারায় বা তার নাগরিকত্ব খারিজ না হয়।

যেসব ব্যক্তি নাগরিকত্ব হারিয়েছে বা যাদের নাগরিকত্ব খারিজ হয়েছে, তারা যাতে নাগরিকত্ব ফিরে পায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

যেসব ব্যক্তি স্থায়ীভাবে মিয়ানমারে বাস করে, তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার উপায় বের করতে হবে।

নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও নাগরিকত্বের সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।

যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সরকারকে নাগরিকত্ব আইনের পর্যালোচনা শুরুর পরিকল্পনা পেশ করতে হবে। এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে নতুন বা পরিমার্জিত আইন কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান আইনের বৈষম্যমূলক প্রয়োগ হবে না।

(সমাপ্ত, ঈষৎ সংক্ষেপিত)

সূত্র : জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন অ্যাডভাইজরি কমিশনের ‘টুওয়ার্ডস এ পিসফুল, ফেয়ার অ্যান্ড প্রসপারাস ফিউচার ফর দ্য পিপল অব রাখাইন’ শিরোনামের প্রতিবেদনের (চূড়ান্ত) নাগরিকত্ব ও নাগরিকত্ব আইন ১৯৮২ বিষয়ক অংশ।

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক


মন্তব্য