kalerkantho


সাদাকালো

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আরো কিছু কথা

আহমদ রফিক

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আরো কিছু কথা

গত ৩১ আগস্ট ‘কালের কণ্ঠে’ প্রকাশিত রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক আমার লেখা নিবন্ধটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন দৈনিকে লেখা নিবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রথম প্রশ্ন।

তা-ও আবার আমার একান্তজন, ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে। টেলিফোনে ও বাসায় এসে তাদের প্রশ্ন, এ লেখায় আর্ত-রোহিঙ্গাদের মানবিক সমস্যা নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী অবস্থান যে সর্বাধিক ঘনবসতির ছোটখাটো ভূখণ্ড বাংলাদেশের জন্য সমস্যা তৈরি করবে, এ বিষয়ে তারা একমত। কিন্তু আর্তমানবতার পক্ষে তো জোরেশোরে দাঁড়াতে হবে। এই শেষ বক্তব্যের সঙ্গে যে দ্বিমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই, এ কথা ঠিক। লেখায় এর বিরোধিতা নেই।

প্রসঙ্গত বলতে হয়, গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে একাধিক কাগজে আমার একাধিক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবত সেগুলো প্রশ্নকর্তাদের নজরে আসেনি। সেখানে আর্তমানবতার পক্ষে মন্তব্যের পাশাপাশি বলা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশ  সরকার যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি গ্রহণ করে।

এবং দ্রুত মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়  আলোচনায় বসে সমস্যার যুক্তিসংগত গণতান্ত্রিক সমাধান করা, যাতে রোহিঙ্গা বিতাড়ন বন্ধ করা হয় এবং বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়, তাদের স্বদেশে শান্তিতে বসবাসের ব্যবস্থা করে।

রাজনৈতিক নেত্রী সু চির শাসনামলের শুরুতেও তাঁর সরকারের রোহিঙ্গা পীড়ন ও রোহিঙ্গা বিতাড়নের সমালোচনা করে আবারও বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তারা সমস্যার সমাধানে দ্রুত আলোচনা শুরু করে। মিয়ানমার সরকার এ ব্যাপারে সাড়া না দিলে বাংলাদেশ সরকার যেন রোহিঙ্গা ইস্যুটির মানবিক সমাধানে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। সমস্যা সমাধানের জন্য যাতে জোরালো অবস্থান নেয়। একই বক্তব্য আগেকার লেখাগুলোতেও রয়েছে।

দুই.

সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার, এমনকি স্বয়ং সু চি রাখাইন (পূর্বনাম আরাকান) অঞ্চলের ন্যায়সংগত অধিবাসী রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতাড়নের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। সে ক্ষেত্রে হত্যা, নারী ধর্ষণ, নির্যাতন—কিছুই বাদ যাচ্ছে না, যা গণহত্যার চরিত্র অর্জন করেছে। স্বভাবতই প্রাণ বাঁচাতে, মান বাঁচাতে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ লক্ষাধিক সংখ্যায় থেকে থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে নদী পাড়ি দিচ্ছে। কখনো পড়ছে বিপর্যয়ের মুখে। এখানে মৃত্যু তাদের তাড়া করছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার তাদের আশ্রয়দানে বাধা সৃষ্টি করছে। প্রশ্ন, কোথায় যাবে তারা? ফিরে গেলে মৃত্যু। নদীতে ভাসমান থাকলেও মৃত্যু। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষীদের বাধা এ ক্ষেত্রে মৃত্যুর শামিল। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারকে তাদের জন্য অস্থায়ী শিবিরের ব্যবস্থা নিতে হয়। যেমনটা নিয়েছিল ১৯৭১ সালে ভারত সরকার একাধিক রাজ্যে শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় শিবির (ক্যাম্প) খুলে পাকিস্তানি সেনাতাড়িত বাঙালিদের জন্য।

সে ব্যবস্থা ছিল সাময়িক, অস্থায়ী। তখনকার সমস্যাও ছিল বর্তমান রোহিঙ্গা সমস্যা ও বৃহত্তর রাজনৈতিক বিচারে ভিন্ন। তাই স্বাধীন বাংলাদেশে শরণার্থীদের বেশির ভাগই নিজ ভূমিতে  ফিরে এসেছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমস্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ সমস্যা দ্বিপক্ষীয় নয়, বরং ত্রিপক্ষীয়, এমনকি বহুপক্ষীয়ও। এখানে আন্তর্জাতিক জটিলতা উপস্থিত। উপস্থিত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের রাজনীতি, যা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ নেই ছোটখাটো উপসম্পাদকীয় নিবন্ধে।

প্রসঙ্গত ভিন্ন একটি কথা বলি। গত কয়েক মাসে সংবাদপত্রগুলোতে ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের ঢল’ নিয়ে গুরুত্বসহকারে পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা থেকে একাধিক পৃষ্ঠায় সংবাদ ছাপা  হয়েছে। একের পর এক উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ ও সম্পাদকীয় কলাম লেখা হয়েছে। গোটা পাঁচেক পত্রিকার একটিরও নিবন্ধ বা সম্পাদকীয়তে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ত্রাণশিবির খোলার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। এবং গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যেমন খবরে, তেমনি নিবন্ধে এই মর্মে যে অনুপ্রবেশকারী আবাসন বাংলাদেশের জন্য সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা। কারো শিরোনাম ‘গলার কাঁটা’।

রোহিঙ্গাদের অসহায়তা সম্পর্কে আরো একটি দিক বিবেচনার যোগ্য। আমার আলোচ্য নিবন্ধটি যখন লেখা শেষ হয় (সাধারণত প্রকাশের দিন চার-পাঁচ আগে লেখা শেষ করতে হয়) তার পরপরই আশঙ্কাজনক খবরটি পত্রিকাগুলোতে প্রকাশ পায় যে বাংলাদেশ সরকার জঙ্গি দমনের উদ্দেশ্যে নাফ নদে মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথ অভিযান চালাতে একমত হয়েছে। এই পদক্ষেপের নেতিবাচক দিক নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আমার পূর্বোক্ত দু-একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। তাঁদের আশঙ্কা, পাছে ‘জঙ্গি দমন রোহিঙ্গা নিধনে পরিণত হয়’। এ বিষয়টিও নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। হতে পারে রোহিঙ্গাদের জন্য গোদের ওপর বিষফোড়া।

বাংলাদেশ সরকারের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যুটি বহুমাত্রিক সমস্যা সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও এর মানবিক দিকটি উপেক্ষার নয়। শুনছি, ফেসবুকে নাকি বহু হৃদয়স্পর্শী করুণ ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে। বলা যায়, মানবতার আর্তনাদ। আবারও বলছি, সেসব উপেক্ষার নয়। কারো মনে পড়তে পারে বেশ কিছুদিন আগেকার করুণ সচিত্র সংবাদ সাগরের বেলাভূমিতে প্রাণহীন কুর্দি শিশুটির কথা। গোটা বিশ্ব কেঁপে উঠেছিল সেই সচিত্র সংবাদ দেখে এবং ঘটনার বিবরণ পড়ে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিয়ে সেই বিশ্ব-আর্তি অনুপস্থিত।

তিন.

পূর্বোক্ত রচনাটির ঘাটতি মেটাতে ৫ সেপ্টেম্বর যখন পরিপূরক লেখাটিতে হাত দিয়েছি, তখনো দেখছি জনপ্রিয় দু-তিনটি পত্রিকায় আবারও একই ধরনের শিরোনাম, প্রথম পাতায় দু-তিন কলামের ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের ঢল’ নিয়ে সংবাদ শিরোনাম। লক্ষাধিক  রোহিঙ্গা  প্রাণ বাঁচাতে বাস্তুচ্যুত, জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত। এ বিষয়ে লেখা কলামগুলো একটি পত্রিকায় পূর্বোক্ত চরিত্রের হলেও অন্যগুলোতে রয়েছে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ। কিন্তু আশ্রয়শিবির খোলা প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য নেই। বরং একটি সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক আশ্রয়হীন অসহায় রোহিঙ্গাদের কোথায় স্থানান্তর করা যায় তা নিয়ে  ভাবতে হবে।

এত দিন পর হঠাৎ করে যেন ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে  বিশ্বের একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের, যখন মাত্র ১০ দিনে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশ সীমান্তে হাজির। দেশগুলো হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তান। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নড়েচড়ে বসছে। হয়তো সে কারণে জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক কমিশন রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। অবস্থা পর্যবেক্ষণে তাদের ত্রাণ কমিটি রাখাইনে পৌঁছতে চাইলে সু চির সরকার তাদের কোনো ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে না। তাই ত্রাণ কমিটির কর্মকাণ্ড ঝুলে আছে।

এই হঠাৎ তৎপরতার মধ্যে যেন হঠাৎ করেই রোহিঙ্গাবিরোধী সংবাদের এক অশনিসংকেত। সংবাদ শিরোনামটি হলো ‘মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ছে, তবু পক্ষে চীন’। সংবাদ বিবরণে  প্রকাশ, গত সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি  প্রস্তাব গ্রহণে বাধা দিয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে রোহিঙ্গা নিরাপত্তা পরিষদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু চীনের বাধায় রাখাইনে জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে যে রোহিঙ্গা বিতাড়নের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর উদ্যোগে চীনের সমর্থন পাওয়া যায়নি। চীন চায় না বাংলাদেশ এ বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক দরবারে হাজির হোক। এখানেই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতা। প্রতিটি বৃহৎ শক্তি তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও  জোটস্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। রোহিঙ্গা স্বার্থ, বাংলাদেশের স্বার্থ তাতে মার খাচ্ছে। একই রকম জটিলতা দেখা গিয়েছিল ১৯৭১ সালে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে। ওই বর্বর গণহত্যাকে গুরুত্ব দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দেয়নি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো। কিন্তু এখন রোহিঙ্গা গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তুরস্কসহ পূর্বোক্ত কয়েকটি দেশ। তারা রাখাইনে গণহত্যা বন্ধ, জাতিসংঘের ত্রাণ, নজরদারি ব্যবস্থা ও তাদের পুনর্বাসনের পক্ষে।

সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যা ও বিতাড়ন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু পীড়িত রোহিঙ্গা মুসলমানই দেশত্যাগ করছে, তাই নয়; গতদিনের সংবাদে প্রকাশ, দলে দলে কয়েক শ হিন্দু রোহিঙ্গাও ঘর ছেড়ে নদীতে ভাসমান। কে জানে, এ কারণেই হঠাৎ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইয়াঙ্গুন সফরের পরিকল্পনা কি না! কিন্তু লক্ষ করার বিষয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করছে। হয়তো কিছুদিন পর তারা ত্রাণকাজে সক্রিয় হয়ে উঠবে। তত দিনে নাফ নদে অনেক লাশ ভাসবে রোহিঙ্গা নারী-শিশু-পুরুষের। অনেক রক্ত পানিতে মিশবে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তির এত দিনকার নিষ্ক্রিয়তা এবং সম্প্রতি কারো কারো নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দু-একটি দৈনিক পত্রিকার  সম্পাদকীয়। তাতে খুব একটা বরফ গলবে বলে মনে হয় না। কারণ পুনরুল্লেখ সত্ত্বেও বলতে হচ্ছে, এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক  রাজনীতির জটিলতা ও খেলা এবং দু-একটি বৃহৎ শক্তির রাষ্ট্রিক স্বার্থ। হয়তো তাই এ সমস্যার সমাধানে দরকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্যোগী রাষ্ট্রগুলোর অধিকতর আন্তর্জাতিক  তৎপরতা।

বাংলাদেশকেও এ উদ্যোগে অংশ নিতে হবে জোরালোভাবে, যাতে এই সম্মিলিত উদ্যোগ পরাশক্তিদের সক্রিয় করে তোলে মিয়ানমারে গণহত্যা ও বিতাড়ন বন্ধের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের  সক্রিয় সহযোগিতা পাওয়া না গেলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে সর্বাধিক উদ্যোগী হতে হবে। এ কথাটি  আমার পূর্বেকার ও গত লেখাটিতেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যেই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছে। তাদের জন্য  দরকার পরিকল্পিত ত্রাণ ও আবাসনব্যবস্থা, যা সরকারের সুশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণে থাকবে ভূ-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে। কারণ এ ব্যবস্থা সাময়িক। একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা মিত্র দেশে পরিপূর্ণ নিরাপত্তায় বসবাস করতে পারে। না হলে বাংলাদেশের সমস্যা বাড়বে  বৈ কমবে না। তাই আন্তর্জাতিক তদবিরে বাংলাদেশকে অনেক অনেক সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে এবং তা রাষ্ট্রিক স্বার্থে। ঘরে বসে বক্তৃতা-বিবৃতি এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।

চার.

পূর্ব নিবন্ধটির পরিপূরক  লেখার পরও কিছু সংযোজনের প্রয়োজন পড়ছে। কারণ রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিশ্বরাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে খুবই জটিল। এর মীমাংসা সহজে হওয়ার নয়। একাধিক বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থ এ ক্ষেত্রে জড়িত। যেমন— যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বরাজনীতিতে, বিশেষভাবে অর্থনৈতিক বিবেচনায় তার প্রধান প্রতিপক্ষ চীন একদা সোভিয়েত শক্তির বিপরীতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক মৈত্রী যতই থাকুক তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব অনস্বীকার্য। ওয়াশিংটন অনেক আগে থেকেই চীনকে কোণঠাসা করে রাখার কূটনীতি গ্রহণ করে। চেষ্টা ধীরেসুস্থে তা বাস্তবায়ন। উদ্দেশ্য চীনকে মিত্র রাষ্ট্রশক্তি দিয়ে ঘেরাও করে তাকে চাপে রাখা। এ প্রসঙ্গে হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’-এ ধৃত তত্ত্বের কথা পাঠক স্মরণ করতে পারেন।

চীনকে যতটা সম্ভব মিত্র রাষ্ট্র দিয়ে ঘিরে রাখার নীতি অনুসরণে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াসহ চীন সাগরে আধিপত্য এবং চীন সীমান্তসংলগ্ন চীনের ঘনিষ্ঠ মিয়ানমারে আধিপত্য বিস্তার। দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ইঙ্গ-মার্কিন অনুগ্রহপুষ্ট সু চিকে মিয়ানমারের শাসনযন্ত্রে বসাতে পেরেছে ওই দ্বিশক্তি। এ ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ ছিল ওয়াশিংটনের। নজর মিয়ানমারের বিপুল খনিজ সম্পদের দিকেও। স্বভাবত চীন মিয়ানমারের শাসকদের স্বার্থ রক্ষা করে চলার নীতিতে বিশ্বাসী। এ দুই শক্তি যথাক্রমে সামরিক জান্তা ও সু চির সমর্থক। তাই রোহিঙ্গা গণহত্যা তাদের চোখে গণহত্যা নয়। যেমন ছিল না একাত্তরের বাংলাদেশে।

আর রোহিঙ্গা সমস্যায় রাশিয়া অনেকটাই দর্শকের ভূমিকায়। এমন এক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আগের প্রশ্নটাই রাজনৈতিক বন্ধুদের ভেবে দেখা উচিত, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের প্রত্যাবাসন কি আদৌ সম্ভব পুরনো ও নতুনদের? কারণ আন্তর্জাতিক মুরব্বিদের বড়সড় অংশ মিয়ানমারের পক্ষে। কেউ নীরব, কেউ সম্প্রতি সজাগ। ভারত কি শেষ পর্যন্ত তার বাণিজ্যিক ও লেনদেনের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াবে? সব কিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি বাংলাদেশের অনুকূল নয়।

তাই সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের পরামর্শ-নীতি আমলে আনেনি মিয়ানমার। প্রসঙ্গত আরো একটি নীতিগত দিক বিবেচনাযোগ্য। জাতিসত্তার লেনিন বর্ণিত অধিকার দলিত-মথিত করছে মিয়ানমার। চীন এর নীরব সমর্থক। এ ক্ষেত্রে কী বক্তব্য হবে মার্ক্স-লেনিন-মাওবাদীদের? বিশ্বের একাধিক জাতিসত্তার অধিকার একইভাবে দলিত। যেমন—তুরস্ক-ইরাক-সিরিয়া সীমান্তবর্তী কুর্দি জাতিসত্তার। অনেক রক্ত, অনেক মৃত্যুর পরও তারা লড়ছে। ওয়াশিংটনের দ্বিচারিতা তাদের নিয়ে খেলা করছে। একদা একই বিষয়ে তীব্র লড়াই করে হার মেনেছে শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু তামিল জাতি। ক্ষুদ্র শক্তিতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে কারেন বিদ্রোহীসহ মিয়ানমারের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো। রোহিঙ্গারা এদেরই এক জাতির জনগোষ্ঠী। কিন্তু লড়াই যে দুর্বল। স্পেনের বাস্ক সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীও ভাষা ও জাতিসত্তার অধিকার অর্জনে লড়ছে দীর্ঘদিন ধরে। এমন সব ক্ষেত্রে কী হবে আমাদের  মার্ক্সবাদীদের নীতিই? ভেবেচিন্তে ঠিক করতে হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিকতাবাদী সমাজতন্ত্রীদের এই নীতি নির্ধারণে পিছিয়ে থাকলে চলবে না। শুধু রোহিঙ্গা নয়, সবার কথাই ভাবতে হবে। তবে রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশসংশ্লিষ্ট বলে এই ভাবনা অগ্রাধিকারে পড়ে, তাতে সন্দেহ নেই।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী


মন্তব্য