kalerkantho


সময়ের প্রতিধ্বনি

বিএনপির ভিশন ২০৩০ এবং নতুন মিশন

মোস্তফা কামাল

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



বিএনপির ভিশন ২০৩০ এবং নতুন মিশন

২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা করে নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের রূপকল্প ঘোষণার রেওয়াজ আগে কখনো ছিল না।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ছিল তাতে। সেই রূপকল্প শুধু নাগরিক সমাজকেই আকৃষ্ট করেনি, নতুন প্রজন্মের ভোটার ও সাধারণ মানুষকেও কাছে টেনেছিল। নির্বাচনে বিপুল বিজয় লাভ করেছিল আওয়ামী লীগ। তখনই আওয়ামী লীগ ঘোষণা করেছিল, তাদের লক্ষ্য ২০৪১। সেই লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ কাজ করছে। নিশ্চয়ই আগামী নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা থাকবে।

বিএনপি অনেকটা দেরিতে আওয়ামী লীগের দেখানো পথেই পা বাড়িয়েছে। ঘোষণা করেছে ভিশন ২০৩০ বা রূপকল্প ২০৩০। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১০ মে স্থানীয় একটি হোটেলে রূপকল্প ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আগামী দিনে তিনি ক্ষমতায় যেতে পারলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনবেন। এ ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূল করার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ডলারে উন্নীত করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করা হয়েছে। এখন মাথাপিছু আয় ১৬০০ ডলার। দুই বছর পর নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হলে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলে মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ডলারে উন্নীত করবেন। কী কৌশলে করবেন তা নিশ্চয়ই বিএনপির জানা আছে।

তবে খালেদা জিয়া যদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারেন, তাহলে সেটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি হবে। তিনি সফল হোন সেই কামনা আমরা করি। তবে এ কথাও ঠিক, রাজনীতি হচ্ছে কৌশলের খেলা। সেই খেলায় বিএনপি অনেকটাই পিছিয়ে আছে। ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করে আবার আলোচনায় এসেছে তারা। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও এক ধরনের চাঙ্গা ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরামর্শকদের মধ্যেও ইতিবাচক মনোভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির রূপকল্প নিয়ে এখনই বেশ আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তারা বলছে, এসব ফাঁপা বুলি। আবার বলছে, বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে ১১ বছর পিছিয়ে আছে। পিছিয়ে আছে সেটা ঠিক। তবে তাদের ভিশন ২০৩০-কে নেতিবাচকভাবে দেখার কিছু নেই। আগে তো তাদের কোনো ভিশনই ছিল না। বিদেশিরা অনেকবার বিএনপি নেতাদের বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদি ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ আছে। আপনাদের কী আছে? এখনকার যুগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকলে জনগণ কিসের ভরসায় আপনাদের পাশে থাকবে? উন্নয়ন সহযোগীরাই বা কী দেখে বিএনপির পাশে দাঁড়াবে?

আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ খোঁজার ও বোঝার চেষ্টা করছে, বিএনপির ভিশন ২০৩০ ঘোষণার পেছনে কোন কোন দেশ নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। ভিশন তৈরির ক্ষেত্রে কোন দেশ কী ভূমিকা রেখেছে। বিএনপির ভেতরে কারা কোন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। দেশের ভেতরে তৃতীয় কোনো শক্তি বা পক্ষ জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কেউ কেউ ধারণা করছে, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাবটি ইউরোপীয় কোনো দেশের। এতে আমেরিকারও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের ব্যাপারেও বিএনপির প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে।

তবে বিএনপির একটি বড় অংশ মনে করে, শুধু ইউরোপ-আমেরিকা পাশে থাকলে হবে না, চীন ও ভারতকে সঙ্গে রাখতে হবে। এরই মধ্যে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা দিল্লি সফর করেছেন এবং মোদি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চীনকে হাতে রাখতেও নানা কৌশলে এগোচ্ছে বিএনপি।

আগামী জাতীয় নির্বাচনেও বিএনপি ভোটারদের মন জয় করতে ভারতবিরোধী নীতি নিয়ে অগ্রসর হতে পারে। খালেদা জিয়ার বক্তব্যেও তার আভাস পাওয়া গেছে। তবে তলে তলে তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও অব্যাহত রাখবে। ভারত যদি আওয়ামী লীগের দিকেই ঝুঁকে থাকে, তাহলে স্পষ্ট ভারতবিরোধী নীতি নেবে বিএনপি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনের দুই বছর আগেই বিএনপি কেন ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করল? ২০১৯ সালের জানুয়ারির আগে তো নির্বাচন হচ্ছে না! দুই বছরে রূপকল্পের উত্তেজনাও শীতল হয়ে যাবে। দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে তখন নতুন করে কী দাওয়াই দেবে? এমনিতেই জোট নিয়ে মহা ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে তাদের।

বিএনপির অন্যতম শরিক জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দাঁড়িপাল্লাও আর নির্বাচনী প্রতীক থাকছে না। জামায়াত নেতারা যদি নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তাহলে বিএনপির ব্যানারে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে হবে। জামায়াত চাইলেও বিএনপি তাদের দলে টানতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও উঠছে।

অনেকেই বলছে, বিএনপির নেতাকর্মীরা জামায়াতকে দলে ভেড়াতে রাজি হবে না। সে ক্ষেত্রে অন্য ইসলামী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে শামিল হতে হবে। অন্য দলগুলোর তো জামায়াতের মতো ভোটব্যাংক নেই।

এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কিছু ইসলামী দলকে জোটে ভেড়াতে চাইছে। তারা মনে করছে, ১৪ দলের বেশির ভাগই বামপন্থী। দেশের রাজনীতিতে বামপন্থীদের অবস্থান কিংবা প্রভাব কোনোটাই এখন আর নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের কর্মকাণ্ড ঢাকাকেন্দ্রিক এবং বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইসলামপন্থী কিছু দলকে জোটে ভেড়াতে পারলে আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হবে। এ কারণে হেফাজতে ইসলামকেও কাছে টেনেছে। আর বিএনপি তো বলছে, হেফাজত তাদের সঙ্গে ছিল, তাদেরই আছে।

তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, বিএনপির ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করার পর রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। সবাই এখন ইসলামী দলগুলোকে কাছে টানার চেষ্টা করছে। এইচ এম এরশাদ ৫৮টি (ইসলামপন্থী ও অন্যান্য) নামসর্বস্ব দল নিয়ে ঢাউস জোট করেছেন। লোকদেখানো এই জোট করার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে দর-কষাকষির অবস্থানকে শক্ত করা। তিনি বলতে পারবেন, ‘আমার সঙ্গে ৫৮টি দল আছে। ’

আওয়ামী লীগও হেফাজতসহ কিছু ইসলামপন্থী দলকে কাছে টানার উদ্যোগ নিয়েছে। বামপন্থীদের আপত্তি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের জোটে কিছু ইসলামপন্থী দল যোগ দেবে। সেগুলোর বেশির ভাগই হয়তো ‘ব্রিফকেস পার্টি’ হবে। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বারবার এমপিদের সতর্ক করছেন। তিনি বলে আসছেন, আগামী নির্বাচন সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের নির্বাচন হবে। ২০১৪ সালের মতো যেনতেন নির্বাচন হবে না। আটঘাট বেঁধে মাঠে নামতে হবে। তিনি সবার আমলনামা হাতে নিয়ে রেখেছেন। সময়মতো সেই আমলনামা ধরে টান মারবেন!

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৫৩ জন। নির্বাচনের জন্য তাঁদের তেমন কোনো খরচ করতে হয়নি। তাঁরা তিন বছরেই ফুলেফেঁপে অনেক বড় হয়েছেন। বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। আমি নিশ্চিত, আগামী দুই বছরও তাঁরা দুই হাতে কামিয়ে যাবেন। আগামী নির্বাচনে তাঁদের কপালে কী আছে তা বিধাতাই জানেন!

আমরা একটি সূত্রে জেনেছি, ক্ষমতাসীন দলের ৫০ থেকে ৭০ জন সংসদ সদস্য আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন না। শুধু দলের ইমেজ ব্যবহার করে যাঁরা সংসদ সদস্য হতে চাচ্ছেন, তাঁদের জন্য দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। অনেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছেন ঠিকই; কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি। তাঁদের ব্যাপারেও অন্য রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন শেখ হাসিনা। সে ক্ষেত্রে মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হতে পারেন শতাধিক সংসদ সদস্য।

আমার ধারণা, ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করে খালেদা জিয়া স্থবির রাজনীতিতে কিছুটা চাঙ্গা ভাব আনতে সক্ষম হয়েছেন। দলের নেতাকর্মীরা নড়েচড়ে বসেছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত রাজনীতির আলোচনা নতুন করে শুরু হয়েছে। নির্বাচনী হাওয়াও যেন একটু আগেভাগে বইতে শুরু করেছে। এই হাওয়া ক্ষমতাসীন দলের গায়েও লাগতে শুরু করেছে, যা দলটির নীতিনির্ধারকদের কাছে সতর্কতা সংকেত হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে।

রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার এ উদ্যোগে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগই বেশি লাভবান হবে। তারা নিজেদের ত্রুটিবিচ্যুতি শুধরে নিয়ে আগামী নির্বাচনে জয়লাভের জন্য নতুন করে কৌশল নির্ধারণের সুযোগ পাবে। তবে বিএনপিকে রাজনৈতিক কৌশলটি আরো ভালোভাবে রপ্ত করতে হবে। আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে বারবারই বিএনপি হোঁচট খাচ্ছে। কৌশলে এগিয়ে থাকতে না পারলে শুধু সমর্থক গোষ্ঠী দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কঠিন হবে। বিএনপির ভারতবিরোধী নীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মনে করি।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostfofakamalbd@yahoo.com


মন্তব্য