kalerkantho


বাস-মিনিবাসে নৈরাজ্য আর কতকাল?

ইসহাক খান

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



বাস-মিনিবাসে নৈরাজ্য আর কতকাল?

কোনো দেশকে চিনতে বা জানতে, সে দেশের সামাজিক ব্যবস্থাকে জানতে সে দেশের রাস্তাঘাট দেখলেই যে কেউ ওই দেশের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর জানতে পারবেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে তিনি বুঝে যেতে পারবেন দেশটা কেমন চলছে, মানুষগুলো কতটা নিয়মতান্ত্রিক।

আপনি যদি বাংলাদেশের যেকোনো রাস্তায় দাঁড়ান, তাহলে সহজেই বুঝে যাবেন আমরা কতটা অনিয়ন্ত্রিত। কতটা বিশৃঙ্খল। কলা খেয়ে খোসাটা রাস্তায় ফেলে যাচ্ছি। কাগজের ঠোঙাটা পথেই ছুড়ে দিয়ে দিব্যি ভদ্রলোকের মতো হেঁটে চলে যাচ্ছি। রাস্তাও খানাখন্দে ভরা। কোথাও আবার পানি জমে আছে। আমরা যেন আজব প্রাণী। নির্বিকার হেঁটে যাচ্ছি। কোনো বিকার নেই। আমরা ধরেই নিয়েছি, এ দেশে জন্ম নিয়েছি, অতএব এই আমাদের নিয়তি। আর যদি কোনো বিদেশি আমাদের গণপরিবহনে ওঠেন, তাহলে অবশ্যই বুঝতে পারবেন আমরা কোন তিমিরে বাস করছি।

কয়েক দিন হলো শুরু হয়েছে গণপরিবহনের নতুন উৎপাত। ৪ এপ্রিল মালিক সমিতি সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৫ এপ্রিল থেকে তা কার্যকর হয়। এই সিটিং সার্ভিস নিয়ে অজস্র লেখালেখি হয়েছে, কোনো কাজে আসেনি। নগরে যে বাস বা মিনিবাস চলে সেটা সিটিং হয় কিভাবে? টাউন সার্ভিসে সিটিং হওয়ার সুযোগ নেই। সিটিং সার্ভিস হবে দূরপাল্লার বাস-মিনিবাস। স্টেশনেই তারা প্রয়োজনীয় যাত্রী তুলে সরাসরি গন্তব্যে গিয়ে থামবে। কিন্তু লোকাল সার্ভিস যে শহরে বা নগরে চলাচল করবে তার সব স্টপেজে থামতে হবে। যাত্রীরা তাদের সুবিধামতো স্টপেজে উঠবে-নামবে। এ দেশে তা হয় না। আপনি বাসে উঠে দুই স্টেশন পরে নামবেন। কিন্তু আপনাকে ভাড়া দিতে হবে বাসের শেষ গন্তব্য পর্যন্ত। এমন মগের মুল্লুক বোধ করি পৃথিবীতে আর নেই!

অনেক দিন হলো এই সিটিং সার্ভিস বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিলাম আমরা। মালিকপক্ষ আমাদের অবাক করে দিয়ে ঢাকা শহরে হঠাৎ সিটিং সার্ভিস বন্ধের ঘোষণা দেয়। তাত্ক্ষণিকভাবে আমরা খুশি হলেও এর ভেতরে তাদের অন্য কোনো দুরভিসন্ধি আছে কি না আমরা তা ভেবে দেখিনি। মালিকপক্ষের এ সিদ্ধান্ত কার্যকরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাঠে নামায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। ১৫ এপ্রিল মিটিং করে তারা পাঁচটি স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি। অনেক বাস-মিনিবাসের মালিক গাড়ি বের করা বন্ধ করে দেন। কারণ তাঁদের গাড়িগুলো লক্কড়ঝক্কড় মার্কা। আমরা জনগণ এতটাই অসহায় যে এই অব্যবস্থার কোনো পরিবর্তনের আশা আমরা করতে পারি না। স্বয়ং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী তাঁর অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন। মন্ত্রী বলেছেন, ‘কেউ নানা অজুহাতে যদি গাড়ি না চালায়, আমরা কি আমাদের দেশের বাস্তবতায় জোর করে গাড়ি নামাতে পারব? আর গাড়ির সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁরা খুব সামান্য মানুষ নন। তাঁরা অনেকেই খুব প্রভাবশালী। ’ মন্ত্রী স্বীকার করেন, ব্যস্ত সময়ে যে পরিমাণ বাস-মিনিবাস চলে, সে তুলনায় খুবই কম চলছে।

ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়াল? মন্ত্রী নিজেই বলছেন, যাঁরা গাড়ির সঙ্গে জড়িত তাঁরা ভীষণ প্রভাবশালী। নিশ্চয়ই সরকারের চেয়ে তাঁরা ক্ষমতাশালী। না হলে মন্ত্রী অসহায় বোধ করছেন কেন? এই যদি হয় পরিবহনব্যবস্থা তখন আমাদের হাহাকার করা ছাড়া আর উপায় কী?

আমাদের এই সেক্টর সত্যি নাজুক। এখানে যারা কলকাঠি নাড়ে তারা এতটাই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করার সাহসও মন্ত্রীবাহাদুরের নেই। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় যেভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে তাতে সড়ক পরিবহন পরিত্যাগ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই যে দুর্ঘটনা ঘটছে তার জন্য কোনো বিচারের ব্যবস্থা নেই। বিচার করলেই গাড়ির মালিকরা রাস্তা বন্ধ করে দেন। আর জনগণ ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি করতে থাকে।

সড়ক মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজনের সন্দেহ মালিকদের সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত মূলত বাস-মিনিবাসের ভাড়া বৃদ্ধির একটি কৌশল মাত্র। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে গত চার দিনে যত্রতত্র [লোকাল] বাস থামিয়ে গাদাগাদি করে যাত্রী তুলে সিটিং সার্ভিসের ভাড়া আদায় করা হয়েছে। তারা জানে কিছুদিন হৈচৈ হবে, তারপর সব থেমে যাবে। এভাবেই সব হয়ে আসছে। এভাবেই সব চলবে। আমরা বড় অসহায়। আমাদের জবানও বন্ধ। আমরা শুধু পড়ে পড়ে মার খাব। এখন এই আমাদের নিয়তি।

নারী যাত্রীরা তো অচ্ছুৎ। হেলপাররা গাদাগাদি করে যাত্রী তুলবে, তবে সে ক্ষেত্রে আবার মহিলা থাকলে সমস্যা। পুরুষদের যেভাবে বেগুনের বস্তার মতো ঠাসাঠাসি করে নিতে পারে, সেটা মহিলাদের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। তাই তারা মহিলাদের বাসে তুলতে চায় না। হেলপার দরজায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ঝাড়ি দিয়ে বলে, মহিলা সিট নেই! তাহলে কি মহিলারা রাস্তায় বেরোবেন না? তাঁরা চাকরি, অফিস-আদালত করবেন না?

গুরুতর একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই নেপথ্য প্রভাবশালীরা হলেন সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতারা। তাঁরাই এ পরিবহন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁরা সবাই সরকারি দলের বড় নেতাদের ছায়ায় থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। এই যখন অবস্থা তখন অরণ্যে রোদন ছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে?

অবশ্য পরিবহন মালিকরা যখন যা খুশি তা করতে পারেন বলে দাবি বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিবের। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এবার ভাড়া কমানোর কথা বলে সিটিং সার্ভিস বন্ধ করা হয়েছে; কিন্তু ভাড়া কমেনি। উল্টো যাত্রীদের মারধর ও বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ পর্যালোচনাসভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ১৫ দিন সিটিং সার্ভিস চলবে। তার মানে গণপরিবহন বিষয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা রাখি না। তারা যা বলবে, তা-ই হবে। এই নৈরাজ্য আর কতকাল?

 

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার


মন্তব্য