kalerkantho

26th march banner

গণতন্ত্র ও নির্বাচন

মো. মইনুল ইসলাম

২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গণতন্ত্র ও নির্বাচন

গণতন্ত্র ও নির্বাচন—এ দুটি শব্দ আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইদানীং বহুল উচ্চারিত হচ্ছে। গণতন্ত্র বা Democracy অভিধাটির জন্ম গ্রিসের নগররাষ্ট্রে। এর গ্রিক নাম Demokratia বা জনপ্রিয় সরকার, যার একটি অংশ হচ্ছে Demos বা জনগণ এবং অন্যটি হচ্ছে kratos বা শাসন অথবা শক্তি। তারপর বহু শতাব্দী পার হয়েছে। ইউরোপের দেশে দেশে এর বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। তারই পরিশীলিত ও উন্নত রূপ পশ্চিমা বিশ্বসহ শিল্পোন্নত দেশগুলোয় দেখি। গণতন্ত্র এখন বিশ্বনন্দিত একটি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা, যার পেছনে নিহিত রয়েছে একটি রাজনৈতিক দর্শন। দর্শনটির মূলমন্ত্র হচ্ছে—স্বাধীনতা, সাম্য এবং সৌভ্রাতৃত্ব। গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটি অল্প কথায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন অতি চমৎকারভাবে তাঁর বিখ্যাত গেটিসবার্গ বক্তৃতায় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র হচ্ছে A government of the people, by the people and for the people। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক সরকার হচ্ছে জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা গঠিত সরকার এবং জনগণের জন্য সরকার।

তবে গণতন্ত্রের বিশ্বজনীন চারটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—

১। সর্বজনীন ভোটাধিকার। সব নাগরিকের ভোটের দ্বারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশগ্রহণের সমান অধিকার ভোগ করবে।

২। অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভা ও সরকার গঠিত হবে।

৩। মৌলিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলো সব নাগরিক ভোগ করবে। সেগুলোর মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হলো—চিন্তা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, সরকারের ভুলত্রুটি কিংবা কাজকর্মের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ ও সমালোচনা করা, সংগঠন করা, সমবেত হওয়া, নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ এবং আন্দোলন করা ইত্যাদি।

৪। সুশাসন ও আইনের শাসন পাওয়ার অধিকার।

তবে ওই বৈশিষ্ট্যগুলোতেই গণতন্ত্রে কার্যপরিধির সমাপ্তি ঘটে না। এগুলো গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। বাস্তবের নিরিখে একে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এর একটি হলো আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র। অন্যটি হলো সারগর্ভ গণতন্ত্র। আমাদের মতো দেশে গণতন্ত্রের নামে যা চলে, তা অনেকটা আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র। তাই নির্বাচনের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। সে নির্বাচনও সব সময় অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয় না। আবার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হলেও বিজয়ী দল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং অধিকারগুলো সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হয় না। দেশে তারা এক ধরনের আনুষ্ঠানিক বা পোশাকি গণতন্ত্র কায়েম করে। জনগণের স্বার্থে এবং তাদের কল্যাণ কামনায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়োজিত হয় না। যা হয়, তা হলো দল, গোষ্ঠী বা পরিবারের শাসন। একটি ক্ষুদ্র ক্ষমতাবান শ্রেণি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাদের দল, গোষ্ঠী, আত্মীয়-পরিজন বা পরিবারের স্বার্থ উদ্ধারে নিয়োজিত করে। সারমর্মের দিক থেকে এটাকে তস্করতন্ত্র বলা যায়। আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্রের সুবিধা বা উপকারভোগীদের তাই নির্বাচনের ব্যাপারে বিপুল আগ্রহ ও সমধিক গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। কারণ তাতে তাদের লুটপাটের সুবিধা হয়।

গণতন্ত্রের মূলে রয়েছে একগুচ্ছ বিশেষ মূল্যবোধসম্পন্ন সংস্কৃতি। এই মূল্যবোধগুলোই সারগর্ভ গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত। ভিন্ন মত, ভিন্ন দল, বিরুদ্ধবাদীদের সমালোচনার প্রতি সহনশীলতা এবং গুরুত্ব প্রদানও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রে জনগণের ক্ষমতা সম্প্রসারণও গণতন্ত্রের কাজ। এর সঙ্গে এটাও বলা দরকার আমাদের মতো দরিদ্র দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের বড় একটি উদ্দেশ্য হবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন তথা দারিদ্র্য বিমোচন। দারিদ্র্য মুক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা বা অধিকার উপলব্ধি এবং উপভোগ করা সম্ভবপর হয় না।

গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে বিএনপি বিগত কয়েক বছর ধরে বেজায় সোচ্চার। ইদানীং সরকারি দল আওয়ামী লীগও এ ব্যাপারে সরব হয়ে উঠেছে। বিএনপির গত পাঁচ বছরের (২০০১-২০০৬) শাসনামলে বাংলাদেশ পর পর চারবার বিশ্বসভায় সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ দেশের শিরোপাটি অর্জন করেছিল। এর অর্থ হলো দেশে সুশাসন ও আইনের শাসনের বিরাট অধঃপতন ঘটেছিল। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের কর্মস্থল হাওয়া ভবন তখন দেশব্যাপী দুর্নীতির সদর দপ্তর  হিসেবে পরিচিতি পায়। তারেক নির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য, কোনো পদ বা পদবি না থাকলেও দেশ তাঁর কথায় চলত বলা যায়। সেই পাঁচ বছরে উল্লেখ করার মতো কোনো উন্নয়ন কাজই দেশে হয়নি। বরং জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যাতায়াত, যোগাযোগ, শিল্প-বাণিজ্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিরাট স্থবিরতা নেমে আসে। তখন ঘন ঘন লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।

দুর্নীতি তখন দেশব্যাপী মহামারি আকারে বিস্তার লাভ করে। এর প্রতিফলন ঘটে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আচরণেও। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা কর দিয়ে এক কোটি ৩৩ লাখ টাকা বৈধ করেন। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নৈতিক অধিকার কি তিনি দাবি করতে পারেন? এ ধরনের বহু দুর্নীতির ঘটনা তাঁদের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ও তাঁর পুত্রদ্বয় এবং হারিছ চৌধুরীদের ব্যাপারে পত্রপত্রিকার তখন দেখা যেত।

বর্তমান সরকারের আমলেও দুর্নীতির মাত্রা যে তেমন একটা হ্রাস পেয়েছে, তা বলা যাবে না। কারণ গত মাসে রংপুরের মিঠাপুকুরের এক সভায় দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দুর্নীতি সর্বগ্রাসী, আমি নিজেও খেই হারিয়ে ফেলি। ’ (কালের কণ্ঠ, ২৫-২-১৭)। তবে এখন দুদককে বেশ সক্রিয় দেখা যায়।

আর বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যাপারে দুর্নীতির গুঞ্জন বা অভিযোগ তেমন একটা শোনা যায় না। তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও মৌলিক মূল্যবোধগুলো দৃঢ়করণ এবং সম্প্রসারণে তাদের উদ্যোগ তেমন একটা দৃশ্যমান নয়। যা হোক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনবান্ধব এবং দেশকে দারিদ্র্যমুক্তকরণে আন্তরিক। জাতীয় অর্থনীতির সবক্ষেত্রে বিগত প্রায় সাত বছরে যে বিরাট সাফল্য অর্জিত হয়েছে, সেটা তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্ব ও আন্তরিক সদিচ্ছার কারণেই সম্ভব হয়েছে। দেশবাসী এখন চায় তিনি সুশাসনের দিকটিতেও যেন একইভাবে নজর দেন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য