kalerkantho


‘উইন-উইন’ অবস্থা কি আদৌ সম্ভব?

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘উইন-উইন’ অবস্থা কি আদৌ সম্ভব?

জমে উঠেছে নির্বাচনী রাজনীতির মঞ্চ। আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মঞ্চে সরব রয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো।

পারস্পরিক হুমকি-ধমকি নিয়ে এগিয়ে চলেছে নির্বাচনী যাত্রা। এ যাত্রার শেষ কোথায়, সেটি বলা মুশকিল। কারণ বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের শেষের দিকে এসে এমন টানাপড়েনের ঘটনা ঘটে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার যা ঘটছে তা নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা থাকবেন, নাকি অন্য কেউ হবেন—এমন প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। রাজনীতির গতি দেখে মনে হচ্ছে, সরকার বিএনপিকে চাপে রাখতে চায় আর বিএনপি সরকারকে চাপে রাখতে চায়। অনেকের ধারণা, শেষমেশ শেখ হাসিনাকে প্রধান রেখেই নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। মূলত সাধারণ জনগণের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যেই বিএনপি তাদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ বিএনপি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে যে নির্বাচনে না গেলে তাদের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ একেবারেই প্রতিকূলে চলে যাবে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এ দুটি দলই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল। ফলে আওয়ামী লীগের দৃষ্টি বিএনপির দিকে আর বিএনপির দৃষ্টি আওয়ামী লীগের দিকে। নব্বই-পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখোমুখি অবস্থানে থেকেছে। কোনো বিষয়েই উভয় দল ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। বর্তমান অবস্থায়ও যে পৌঁছবে না—এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। আর সব সময়ই সরকারি দল রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে রাখতে চায়। এবারও এর ব্যতিক্রম আশা করা অমূলক হবে। কাজেই নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রশ্নে বিএনপির পক্ষ থেকে যতই উচ্চবাচ্য থাকুক না কেন, মূলত নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে হবে।

আমরা লক্ষ করছি, এরই মধ্যে ভোটের প্রচারে মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগ। দলীয় জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে নৌকা প্রতীকে ভোট চাইতে শুরু করেছেন। আর বিএনপি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রশ্নে এখনো বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য বিএনপির একটি অংশ যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে যেতে চায়, আরেকটি অংশ শর্ত সাপেক্ষে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঠিক করতে চায়। ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচন নয়’, ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন দিতে হবে’ কিংবা ‘প্রয়োজনে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাব না’—বিএনপি নেতারা এ রকম নানা কথা বললেও এগুলো পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে করতে পারছে না ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগের ধারণা, মুখে এখন যা-ই বলুক না কেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো বিএনপি আগামী নির্বাচন বর্জন করবে না। আশার কথা হলো, প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে ঘোষণা করেছেন যে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন ৫ জানুয়ারির ধাঁচের হবে না।

রাজনৈতিক বাস্তবতা, দল ও নেতৃত্বের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং দেশি-বিদেশি উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে—এমনটি ধরে নিয়েই আওয়ামী লীগের যেমন প্রস্তুতি রয়েছে, তেমনটি বিএনপিরও থাকার কথা। বিশেষ করে এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে একটি জোট গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি সেদিকটাও গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করছে। বিএনপি নির্বাচনে না এলে এরশাদের জাতীয় পার্টিই শক্তিশালী অবস্থানে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আর বিএনপি যেহেতু সংসদে বিরোধী দলের অবস্থানে নেই, সেই কারণে এরশাদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করার সুযোগ থেকেই যাচ্ছে। এ চিন্তায়ও বিএনপি কিছুটা কাতর থাকার কথা।

তবে আন্তর্জাতিক মহলের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে। নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যে তেমনটিই মনে হচ্ছে। বিশেষ করে মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনও চায় একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণমূলক ভোটের ব্যবস্থা করতে।

বিএনপির বাহ্যিক অবস্থা দেখে যা-ই মনে হোক না কেন, দল গোছানো, আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ ও নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে ভেতরে ভেতরে তাদের যথেষ্ট ব্যস্ততা রয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন সরকারের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ক্ষমতাবলয়ের বাইরের রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা শুরু করেছে। সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত দলের বাইরে থাকা নেতাদের আবার দলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ অনুকূলে আনতে দর-কষাকষিতে সব রকম চেষ্টা চালাবে দলটি। কারণ এটিও রাজনীতির অংশ।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশবাসীর যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, আর যা-ই হোক, এর পুনরাবৃৃত্তি কেউ চায় না। নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা হবে কি না জানি না। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সব দলের ঐকমত্য আগে থেকেই নির্ধারিত হওয়া দরকার। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর বিষয়ে যেমন আগ্রহ দেখানো হচ্ছিল, এবার তার ব্যতিক্রম লক্ষ করছি। এবার আওয়ামী লীগের প্রচণ্ড অনীহা রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির আগ্রহ এবার একটু বেশি।

বিএনপির প্রথম কথা হচ্ছে—আমরা নির্বাচন করতে চাই। তবে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, নিরপেক্ষ সরকার হতে হবে। বিএনপি এ জন্য আলাপ-আলোচনা, লবিং ও জনমত সৃষ্টি করে এগোতে চাচ্ছে। প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গেলে দাবি আদায় করতে তারা সমর্থ হবে বলে অনেকেই মনে করছে। সম্পূর্ণ না হলেও আংশিক দাবি মানলেই বিজয় হিসেবে ধরে নেবে বিএনপি। তাদের আংশিক সফলতাকেই পরিপূর্ণ সফলতা মনে করা দরকার।

মানুষের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা শাশ্বত, গণতন্ত্রের লড়াই ন্যায়সংগত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া—উভয়ই এটি জানেন। তাঁদের সেই অবস্থান শক্তিশালী করতেই যাঁর যাঁর অবস্থানে সঠিক সিদ্ধান্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর সামনে বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বিএনপির যেকোনো মূল্যে অস্তিত্ব রক্ষার মধ্য দিয়ে ‘উইন-উইন’ অবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে উভয় দলেরই ক্ষমতায় আসতে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক জোর তত্পরতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা আছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক ছিল। এটি প্রধানমন্ত্রী নিজেও জানেন। আর এ জন্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে যত ধরনের কৌশল গ্রহণ করা যায়, সরকার হয়তো তা-ই প্রয়োগ করবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে খেয়াল রাখতে হবে, আর কোনো ভুল সিদ্ধান্ত যেন তাদের জন্য বুমেরাং না হয়।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com


মন্তব্য