kalerkantho


বহে কাল নিরবধি

কবে শান্ত হবে সিরিয়া

এম আবদুল হাফিজ

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কবে শান্ত হবে সিরিয়া

প্রতিদিনই সিরিয়ার সংকট জটিল হয়ে চলেছে। সংকুচিত হয়ে আসছে দেশটিকে ঘিরে সব প্রত্যাশা।

প্রাত্যহিক বিদ্বেষ, আতঙ্ক ও নিষ্ঠুরতা সার্বিক পরিস্থিতির আরেক অচলাবস্থার আভাস দেয়, বিশেষ করে রুশ-মার্কিন যৌথ প্রচেষ্টা ও দূতিয়ালিতে সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হওয়ার পথে।

যখন শেষ পর্যন্ত সিরীয় সংকটের অবসান ঘটবে, সংকটের তিনটি নির্ধারণী বৈশিষ্ট্য দেশটির পুনর্গঠনকে জটিল করবে। যে বা যারাই সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় শরিক হোক সমস্যা হবে শহরটির মুখাবয়ব খুঁজে পাওয়া। কেননা এর ধ্বংস সাধনে যারা অংশ নিয়েছে তারা তো এর শৈল্পিক দিকটিকে বিবেচনায় নেয়নি, বরং এলোপাতাড়ি এবং কোনো মানবিক ভাবনা ছাড়াই তাদের পাশবিক শক্তি প্রয়োগ করেছে। এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত সৌধ ও স্মৃতি চিহ্নগুলোও ধ্বংসযজ্ঞকে এড়াতে পারে বলে সংশয় বিরাজ করছে যে সেসবকে কি আর তাদের মৌলিকত্বে ফেরানো যাবে।

বিগত বছরের এপ্রিল থেকে সিরীয় হাসপাতালগুলোতে অসংখ্য হামলা হয়েছে এবং বিপর্যস্ত লোকালয়ে ত্রাণ যেতে দেওয়া হয়নি। আলেপ্পোর বেশ কিছু হাসপাতাল অবরোধের সময় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব হয়তো যুদ্ধাপরাধ বলে গণ্য করা হবে। শুধু ২০১৫ সালেই চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলো, যেগুলোয় স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকও দেওয়া হয়েছিল সেগুলোতে ৯৪ বার হামলা হয়েছিল, যাতে ওই সব কেন্দ্রের ২৩ জন কর্মী নিহত হন।

গত বছরের মে মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সিরীয় সংকটে জড়িত সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনকে মান্য করার অনুরোধ জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে।

বলাবাহুল্য, ওই  অনুরোধ শুধু কাগজে-কলমে থেকে যায়। এখন উল্টো নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা একে অন্যকে দোষারোপ করে তাদেরই প্রণীত প্রস্তাবকে অমান্য করায়। সিরীয় শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করেছে তার অন্যতম কারণ সংকটের সঙ্গে জড়িত খেলাড়িদের একটি জটিল মানচিত্র। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যদিও এই মানচিত্র বারবার পরিবর্তিত হয়েছে শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দল বা উপদলের সাংগঠনিক চরিত্র ও নেতৃত্বও পরিবর্তিত হয়েছে বারবার। সেগুলোর ভাঙাগড়া ও যুদ্ধ কৌশলে পরিবর্তনও ছিল লক্ষণীয়। সন্ত্রাসী গ্রুপ জাবাত আল-নুসরা নাম বদলিয়ে এখন হয়েছে জাবাত ফাতাহ আল শাম। উপদলটি আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এটি এখন আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়েছে এমন আরো দুটি উপদলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

যদিও পুরনো উপদলগুলোর সঙ্গে পুনর্মিলনের এই ধারা যুদ্ধরত বিদ্রোহীদের কিছুটা শক্তি জোগায়, এতে আবার বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসীদের মধ্যকার পার্থক্যটা  অস্পষ্ট  হয়ে যায়। এমনটা ঘটেছে যখন জাবাত আল-নুসরা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং শাসক পক্ষও এমন দাবি করার সুযোগ পেয়েছে যে তারা তো অনাকাঙ্ক্ষিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধেই লড়ছে। ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সিরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল মুয়ালেম মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী উগ্রবাদীদের প্রকারান্তরে সাহায্য-সহযোগিতার অভিযোগ আনতে পেরেছেন।

কয়েক মাস আগের সিরীর শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার মূল বিষয়ই ছিল সিরীয় ট্র্যাজেডির কেন্দ্রীয় চরিত্র বাশার আল আসাদের অবস্থানকে ঘিরে। প্রশ্ন উঠেছিল যে তিনি এই মাত্রই বিদায় হবেন অথবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে থাকবেন। এখন যে প্রশ্নটি সামনে উঠে এসেছে সেটি আরো প্রাসঙ্গিক। এখনকার প্রশ্ন হচ্ছে যে জাবাত আল-নুসরাকে গৃহযুদ্ধোত্তর সিরিয়ায় ক্ষমতার অন্যতম দাবিদার বিবেচনা করব কি না। অনেকের মনেই প্রশ্ন, বর্তমান অবস্থায় বাশার আল আসাদ এবং তাঁর সামরিক বহর এরই মধ্যে একটি নিঃশেষিত শক্তি কি না।

যে যেমনই ভাবুক না কেন, বাশার আল আসাদ সম্ভবত এখনো বিবেচনাযোগ্য শক্তি, যাঁকে ইচ্ছা করলেই ছেঁটে ফেলা যায় না। কেননা যুদ্ধের পুরোভাগে তিনি তো একা নন। সিরিয়া রাশিয়ার অন্যতম রণাঙ্গন, যেখানে একদা এই পরাশক্তি আবার একটি বৃহত্শক্তির প্রমাণ তুলে ধরতে চায় এমন একটি শক্তি, যা বিশ্বের একক অপরিহার্য পরাশক্তিকেও ঠেকাতে পারে। বাশারের মিত্র ইরানও তার আঞ্চলিক প্রভাব সম্প্রসারিত করতে চায় এবং ভূমধ্য সাগরে প্রবেশপথ পেতে আগ্রহী।

সিরীয় শান্তির পথে তৃতীয় প্রতিবন্ধক রুশ-মার্কিন সম্পর্কে অব্যাহত অচলাবস্থা উভয়ের সম্মতিক্রমে অনেকটা যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর পরিষ্কার বোঝা যায় যে তারা কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। মস্কোস্থ থিংকট্যাংক কার্নেগি এনডোমেন্টের দিমিত্রি ট্রেনিনের বক্তব্য অনুযায়ী সিরীয় শান্তি প্রচেষ্টায় সর্বশেষ ব্যর্থতা অতীতের ব্যর্থতাগুলোর সমষ্টিগত প্রভাব ফেলবে ভবিষ্যতের ওপর। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এত ব্যর্থতার পরও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার দ্বার বন্ধ হতে দেয়নি। পাঁচ বছরের  বেশি সময় সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে অপারগতা অবশ্যই কোনো মধুর অভিজ্ঞতা নয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের বৃহৎ দুই শক্তিধর দেশের সম্পর্কে টানাপড়েনই মূলত এটা সম্ভব হতে দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র বারবার রাশিয়াকে সিরিয়ায় যুদ্ধাপরাধ করার অভিযোগ তুলেছে। রাশিয়ারও  যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত দীর্ঘ অবরোধের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। পুতিনের রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের শাস্তি হিসেবে ওই মার্কিন অবরোধ অনৈতিক ছিল বলে রাশিয়ার বিশ্বাস।

যে বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের পরস্পরের ওপর এত ক্ষোভ, অভিযোগ ও অবিশ্বাস তারা তৃতীয় একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের সুরাহা করবে কিভাবে। তবে তাদের মধ্যকার অবিশ্বাস ও মতদ্বৈধতার কিছুটা নিরসন হলে তারাই সিরিয়াসহ বিশ্বের যেকোনো সংকটের অবসান ঘটাতে পারবে। তবে সে জন্য আমাদের অপেক্ষার প্রহর বেশ খানিকটা বাড়বে।

 

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস


মন্তব্য