kalerkantho


আপনিও কিন্তু নজরবন্দি!

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গত সপ্তাহেই উইকিলিকস ফের একবার নতুন বোমা ফাটিয়েছে। এবারের তথ্যটি মারাত্মক। এতে আমি-আপনি সবাই যুক্ত।  

মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) ইতিহাসে এটিই বৃহত্তম তথ্য ফাঁস। উইকিলিকস দাবি করেছে, প্রতিদিনের ব্যবহার্য প্রায় সব ইলেকট্রনিকস ও ডিজিটাল মাধ্যমই আসলে মার্কিন গোয়েন্দাদের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। সাড়ে আট হাজার পৃষ্ঠার তথ্য প্রকাশ করে তারা জানিয়েছে, মোবাইল থেকে স্কাইপ, কম্পিউটারে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা অ্যান্টি-ভাইরাস থেকে টেলিভিশন, সব কিছুতেই নজরদারি করার মতো সফটওয়্যার ব্যবহার করছে সিআইএ। অন্তত পাঁচ হাজার হ্যাকার কেন্দ্রীয়ভাবেই কাজ করছে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারির জন্য। বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবেও সিআইএ এ কাজ করে থাকে।

উইকিলিকস এই বিপুল তথ্য ফাঁসের ভাণ্ডারের নাম দিয়েছে ভল্ট-৭। আট হাজার ৬০০ পৃষ্ঠার তথ্যের সঙ্গে তারা ৯৪৩টি অ্যাটাচমেন্ট দিয়েছে। বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা রয়টার্স মার্কিন গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এই তথ্য সত্য বলেই মনে হয়।

কারণ যেসব পরিভাষা ও ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়, তাও সঠিকভাবেই লেখা হয়েছে। ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারির বিপুল তথ্য ফাঁস করেছিলেন। কোন কোন দেশের, কোন রাষ্ট্রপ্রধানের টেলিফোনেও নজরদারি চলছে, সেই তথ্য দিয়েছিলেন স্নোডেন। উইকিলিকসের এবারের ফাঁসে এখনো সেই নাম নেই। কিন্তু উইকিলিকস পরিচালক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ জানাচ্ছেন, যতটুকু প্রকাশ করা হয়েছে তা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এতে লাখ লাখ লাইন অব কোড ও বিশদ তথ্য রয়েছে। বস্তুত ‘সিআইএর সমগ্র হ্যাকিং ব্যবস্থাই’ ফাঁস করার মতো অবস্থায় রয়েছে। পর্বে পর্বে তা সামনে আনা হবে। যে অংশ প্রকাশিত হয়েছে, তা ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে।

উইকিলিকসের এই তালিকায় হ্যাকিংয়ের লক্ষ্যে ব্যবহূত সফটওয়্যার ও অন্যান্য যন্ত্রের বিপুল তালিকাও দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে প্রায় সব কিছুর ওপরেই গোপনে নজরদারি চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সিআইএ কী হ্যাকিং করতে পারে এবং করছে, তার তালিকায় রয়েছে অ্যাপল আইফোন ও অ্যানড্রয়েড। গুগল অ্যানড্রয়েড ফোনের স্যামসাং, সনি, এইচটিসির মোবাইলে সিআইএ হ্যাকিং করতে সক্ষম। মোট প্রায় ৮৬ শতাংশ স্মার্টফোন এই দুই অপারেটিং ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। মাইক্রোসফট উইন্ডোজ ব্যবহারকারী যন্ত্রও এই তালিকায় রয়েছে। রয়েছে পার্সোনাল কম্পিউটার থেকে সোশ্যাল মিডিয়া। সিআইএ নিজে ও অন্য মার্কিন সংস্থার সাহায্য নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের এনক্রিপশনকেও এড়িয়ে তথ্য জোগাড় করে ফেলতে পারে। হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ সিআইএর হাতে যাচ্ছে—এই তথ্যই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। হোয়াটসঅ্যাপের মতো টেলিগ্রাম বা সিগন্যালও এর শিকার। উইকিলিকস যে সফটওয়্যার ব্যবস্থার কথা বলেছে, তাতে ব্যবহারকারী কোথায় রয়েছেন, কী কথা বলেছেন, কী শুনেছেন, কী ছবি তুলেছেন তার সবই চলে যেতে পারে সিআইএর হাতে। পাসওয়ার্ড চুরি তো জলভাত।

শিউরে ওঠার মতো একটি নথিতে দেখা যাচ্ছে, স্যামসাং স্মার্ট টেলিভিশন ‘অফ’ হয়ে গেছে মনে হওয়ার পরও ওই ঘরের যাবতীয় কথোপকথন রেকর্ড করা হচ্ছে তাতেই। সেখান থেকে চলে যাচ্ছে সিআইএর সার্ভারে। এই প্রোগ্রামের নাম দেওয়া হয়েছে ‘উইপিং অ্যাঞ্জেল’।

ফাঁস হওয়া নথি থেকে আরেকটি ভয়ানক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সিআইএ যান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকেও সংক্রমিত করার চেষ্টা করছিল। উদ্দেশ্য কী, তা ঘোষিত না হলেও সচেতনভাবেই দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দেওয়া সম্ভব। আসলে যা হত্যারই আরেকটি পদ্ধতি।

হ্যাকিংয়ের নানা পদ্ধতির একটি হলো— এমনভাবে তা করা হচ্ছে যদি তা বোধগম্য হয়ে যায়, তাহলে মনে হবে রাশিয়া, চীন বা ইরান থেকে হ্যাকিং হচ্ছে। যদিও আসলে তা করছে সিআইএ। উইকিলিকস অনুযায়ী, সিআইএ এক হাজারের বেশি হ্যাকিং সিস্টেম, ট্রোজান, ভাইরাস, ম্যালওয়্যার তৈরি করেছে, যা দিয়ে তারা নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশের লক্ষ্যবস্তু ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও এই ‘সাইবার গোয়েন্দাগিরি’ কাজ করছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দূতাবাস থেকেও সিআইএ এই হ্যাকিংয়ের কাজ করছে। ফ্রাংকফুর্টের মার্কিন দূতাবাসে এর স্পষ্ট উল্লেখই রয়েছে নথিতে। দুনিয়াজুড়ে এই বৈদ্যুতিন গোয়েন্দাগিরি চালাতে ১৫০টি স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানে ওয়াশিংটন বসিয়েছে ৭০০টি সার্ভার।

সিআইএ এই তথ্য ফাঁসের সত্যাসত্য সম্পর্কে যদিও কোনো মন্তব্য করতে চায়নি।

কিছুদিন আগেই এক বিবৃতিতে গুগল জোরের সঙ্গেই দাবি করেছিল, ‘কিছুদিন অন্তর অন্তরই আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, আমরা নাকি আমাদের সিস্টেমে সরকারের জন্য একটি পেছনের দরজা তৈরি করেছি। এটা বলতে পারি সরকারের জন্য কোনো পেছনের দরজা নেই। ’

ঠিকই বলেছিল গুগল। সরকারের জন্য কোনো ‘পেছনের দরজা’ নেই। সদর দরজাই হাট করে খোলা!

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতিবিদ


মন্তব্য