kalerkantho


সাদাকালো

দিবসের তাৎপর্য ও ব্যর্থতা

আহমদ রফিক

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দিবসের তাৎপর্য ও ব্যর্থতা

বেশ কিছুদিন থেকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশি সমাজে নানা উপলক্ষে আন্তর্জাতিক ‘দিবস’ পালন চলছে। সমাজের নানা স্তরে এর প্রকাশ।

যেমন—বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ঘোষণা নিয়ে পালিত হচ্ছে ‘মা দিবস’, ‘শিশু দিবস’, ‘পিতা দিবস’ ইত্যাদি। বাদ যাচ্ছে না ‘কিডনি’ দিবসও। এসব দিবস পালনের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমাজে সচেতনতা এবং ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, নির্দিষ্ট দিবসটি পালনের পর বছরের বাকি সময় এ সম্পর্কে সচেতনতার প্রকাশ বা তত্পরতা দেখা যায় না। বিষয়টি ‘এক দিনকা’ অনুষ্ঠানেই শেষ হয়ে যায়।

কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য বাংলাদেশে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ (৮ মার্চ) পালন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক আনুষ্ঠানিকতা দেখে। সংবাদপত্র ভুবন থেকে সাংস্কৃতিক ভুবনে চলেছে নানা ধরনের অনুষ্ঠান, আলোচনাসভা এবং সংবাদপত্রে লেখালেখি। দৈনিকের পাতায় সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় নিবন্ধগুলোতে (এ লেখাটিও তেমনই একটি) রয়েছে দিবসটির তাত্পর্য  ব্যাখ্যা, পরিস্থিতির বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, করণীয় ইত্যাদি নিয়ে বক্তব্য পেশ।

বছরের পর বছর এ ধারা চলমান।

এখন প্রশ্ন, এতে সমাজ সচেতনতা কতটা বেড়েছে বা বাড়ছে, নারীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, ঘরে-বাইরে নারী নির্যাতন ও নারী হত্যা হ্রাসে কতটা প্রভাব পড়ছে, আদৌ পড়ছে কি না তা কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রযন্ত্র ভেবে দেখে? যদি তা না-ই হয়, তাহলে এ ধরনের দিবস পালনের সার্থকতা বা প্রয়োজন কী?

এ সম্পর্কে একজন সমাজসেবাব্রতী বর্ষীয়ান নারী জামিল আখতার বীনুকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ দেশে এজাতীয় দিবস পালন সমাজে কোনো প্রভাব ফেলে না, বরং তা আনুষ্ঠানিকতায় শেষ হয়ে যায়। নারী সংগঠনগুলো শুধু দিবসই পালন করে। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে এদের কোনো কার্যকর তত্পরতা দেখা যায় না, আন্দোলন তো দূরের কথা। তাই নিছক দিবস পালনে মন সায় দেয় না।

সত্যিই বাংলাদেশি সমাজে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা সুস্থ সাংস্কৃতিক শিক্ষার প্রভাব বড় একটা যাচ্ছে না, বিশেষ করে নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে। কেন জানি নারী নির্যাতন, ঘরে যৌতুকের দাবিতে এবং একাধিক কারণে বধূ নির্যাতন বেড়েই চলেছে। কমছে না বখাটেদের কিশোরী ও তরুণীদের ওপর হামলা বা যৌন হয়রানি। সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখলে এ সত্য প্রমাণিত হয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবসও এদিক থেকে ব্যতিক্রম নয়। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হয়। তাই তৃষা-তনু-খাদিজাদের খবর হয়ে ওঠা বন্ধ হচ্ছে না।

দুই.

সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য ও নারী নির্যাতনের ইতিহাস আজকের নয়। সূচনা অতি প্রাচীনকালে, যখন থেকে মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান এবং পেশিশক্তিতে বলীয়ান পুরুষের হাতে সমাজশাসনের ক্ষমতা চলে আসে। পাঠক ভাবতে পারেন কী উন্নত, সুসভ্য ইউরোপে মাত্র কিছুকাল আগে নারীর ভোটাধিকার স্বীকৃতি পেল, তাও কিছুসংখ্যক বলিষ্ঠ চেতনার নারী-পুরুষের আন্দোলনের ফলে। এমন বহু ঘটনা আমাদের সামাজিক পশ্চাৎ চেতনার প্রমাণ দেয়। আর ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালনের আহ্বান জানায় জাতিসংঘ এই তো বছর কয়েক আগে, ১৯৭৫ সালে।

নারী স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস বড় করুণ। ২০০ বছরের সেই ইতিহাসের যাত্রা কাঁঁটায় ভরা পথ অতিক্রমের, প্রবল বাধাবিপত্তির, যদিও নারী-স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অগ্রচারীর ভূমিকা পালন করেছেন কিছুসংখ্যক অদম্য সাহসী নারী-পুরুষ। এরই মধ্যে ২০০ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে।   তা সত্ত্বেও নারীর অবস্থা, তার দৈহিক-মানসিক অবস্থান কোন পর্যায়ে তা ভেবে দেখার মতো। বিশেষ করে অনুন্নত ও আধা-উন্নত দেশগুলোতে নারীর ব্যক্তিক-পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনায়, বিশেষভাবে নারী নির্যাতন ও নারী হত্যার হার হিসাব করে। আর ত্রিধাবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর উন্নতির পাশাপাশি এর অন্ধকার দিকটি বড় ভয়ংকর!

আজকে এই দিনে (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে স্মরণ করতেই হয় সেই বিশ্ববরেণ্য দু-চারজন মনীষীকে যাঁরা সাহস করে প্রতিবাদের ও অধিকার দাবির প্রথম শিখাটি না জ্বালালে এই যাত্রা হয়তো আরো বিলম্বিত হতো। এ অগ্রযাত্রায় প্রথম স্মরণীয় মেরি ওলস্টোন ক্রাফটের নারী স্বাধিকারবিষয়ক রচনা (১৭৯২) যা এ বিষয়ে আদি দলিল বা সনদ হিসেবে স্বীকৃত। এর প্রতিক্রিয়ায় সমাজে সৃষ্ট আলোড়নের ধারাবাহিকতায় স্মরণযোগ্য মার্গারেট ফুলার (১৮৪৫), স্টুয়ার্ট মিল (১৮৬৯) প্রমুখের নারী স্বাধিকারের পক্ষে রচনা, বিশেষ করে ইবসেনের জনপ্রিয় প্রাসঙ্গিক নাটক (১৮৭৯) কিংবা মার্ক্সবাদের কিংবদন্তি পুরুষ ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসের নারীর সপক্ষে প্রকাশ্য মতামত ঐতিহাসিক ঘটনা হলেও ১৮ থেকে ১৯ শতক নারীর জন্য তমসাচ্ছন্নই বটে।

খ্রিস্টীয় ভুবনের প্রশাসনকেন্দ্র ভ্যাটিকানের রক্ষণশীলতা, প্রবল প্রতাপ ও বিধিবিধান তথা নির্দেশনামা নারীর সামাজিক দুর্দশার প্রধান কারণ। এর মধ্যে আশার আলো জ্বেলেছে কিছু কিছু ঘটনা, যেমন—বাস্তিল চূর্ণ করা ফরাসি বিপ্লব নানা পেশার নিম্নবর্গীয় নারীদের তাদের অধিকার হাতে পেতে সাহায্য করেছিল। দ্বিতীয় ঘটনা ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সম্মেলনে’ কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিনের ঘোষণা নারী-পুরুষের সমান অধিকারের দাবিতে। সত্যি বলতে কি ইউরোপীয় রেনেসাঁস এ বিষয়ে কোনো সদর্থক ভূমিকা রাখেনি। এ এক আশ্চর্য ঘটনা!

বিশ শতকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন এ বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। ঘোষিত হয় আন্তর্জাতিক নারী শ্রমিক দিবস। এ উপলক্ষে ১৯১১ সালে পূর্বোক্ত ক্লারা জেটকিন দিবসটি সাধারণভাবে বিশ্ব নারী অধিকার দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ঘটনা নিউ ইয়র্কে নারী শ্রমিকদের সমাবেশ (১৯০৮), কোপেন হেগেনে আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন  (১৯১০), যে সম্মেলনে ৮ মার্চের দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এবং লেনিন কর্তৃক সোভিয়েত ইউনিয়নে নারী-পুরুষের সম-অধিকারের ঘোষণা সত্ত্বেও বিশ্বে নারী অধিকারের বিষয়টি জোর পায়ে হাঁটেনি।

বিশ শতকের আধুনিকতা, উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিচর্চা নারী মুক্তির ক্ষেত্রে আলো ফেলতে পারেনি, উচ্চ শ্রেণিতে নারীর ফ্যাশন-ভূষণ বেড়েছে এ-ই যা। এরপর নারী স্বাধিকারের প্রশ্নে আনুষ্ঠানিকতার অভাব ঘটেনি। একের পর এক অনুষ্ঠিত সম্মেলনে নারীর অধিকারবিষয়ক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। পাশ্চাত্যে নারীর অবস্থার কিছু পরিবর্তন ঘটলেও সত্যিকার অর্থে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে সেখানে নারী নির্যাতনের মাত্রা কমেছে এ-ই যা। কিন্তু আমেরিকার মতো কথিত গণতন্ত্রের দেশেও নারীর প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়া এখনো দূরের বিষয়।

তিন.

এবার স্বদেশে নারী প্রসঙ্গ। রামমোহন-বিদ্যাসাগর-দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি প্রমুখের নারীবান্ধব প্রচেষ্টার পটভূমিতে ইংরেজ আমলে মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারিত ১৪ (১৮৭২), তাও এদেশীয় সমাজের প্রবল আপত্তির মুখে বিয়েতে মেয়েদের সম্মতি বয়স আইন পাস ১৮৯১ সালে। আর বাল্যবিয়ে রোধে আইন পাস ১৯২৯ সালে, মেয়েদের ভোটাধিকার ১৯২৫ সালে এবং নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকৃত এই তো ১৯৩৫ সালে।

এরই মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান সমাজে নারী স্বার্থবিরোধী কুপ্রথার বিরুদ্ধে ও নারীশিক্ষার পক্ষে, সর্বোপরি নারী স্বাধিকারের পক্ষে জোরালো উচ্চারণ ও বাস্তব প্রচেষ্টায় নজরুলসহ জাতীয় কংগ্রেসের নারী নেত্রীরা, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, ঢাকার লীলা নাগ এবং পরবর্তী পর্যায়ে কমিউনিস্ট সংগঠনগুলো নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। কোনো কোনো নারী সংগঠনের আন্তরিকতা সত্ত্বেও  বেশির ভাগ মহিলা সমিতির প্রচেষ্টা আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত।

তাই বিশ শতক শেষে একুশ শতকের এক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও বাংলাদেশে শহরে-গ্রামে নারী নির্যাতন ও হত্যা এবং ফতোয়াবাজি নারী জীবনে অভিশাপই হয়ে আছে। নারী আন্দোলনের দীর্ঘ পথযাত্রা শেষে এযাবৎ কী প্রাপ্তি তা হিসাব-নিকাশ ও বিচার-ব্যাখ্যার পর ছবিটা কেমন দাঁড়িয়েছে, তা বোঝা যায় কিছুটা হলেও বাস্তব পরিস্থিতির মূল্যায়নে এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত অঘটনের সংখ্যা থেকে। উল্লেখ্য যে এ বিষয়ে সবাই একমত, সংবাদপত্রে প্রকাশিত নারী নির্যাতনের ঘটনার তুলনায় অপ্রকাশিত সংখ্যা অনেক বেশি।

অস্বীকার করা যাবে না যে গত কয়েক দশকে এ দেশে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক গুণ বেড়েছে, নারীশিক্ষার প্রসারও ঘটেছে, অফিস-আদালতে, ব্যাংক-বীমার মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এমনকি বেতার, টিভি ও এনজিও সংগঠনে নারীকর্মী ও কর্মকর্তার সংখ্যা (বলা বাহুল্য, রাজধানী ঢাকায়) দেখে মনে হতে পারে, এ দেশে নারী বিপ্লব ঘটে গেছে। এঁরাই বুঝি দেশ চালাচ্ছেন (দুই নারী প্রধানমন্ত্রীর কথা বাদ দিয়েই বলছি)। বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষায়তনেও নারীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো দৃশ্যমান। এমনকি জাতীয় সংসদেও রয়েছে তাঁদের উপস্থিতি।

কিন্তু এ সবই পানিতে ভাসমান বরফের ওপর অংশ মাত্র, প্রদীপের নিচে অন্ধকার। বিশদ বিচারে তা উঠে আসে যখন দেখা যায় বিভিন্ন নিরপেক্ষ জরিপ বলে শ্রম অঙ্গনে শ্রমজীবী নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্যের কথা, নারীর যৌন হয়রানির কথা, অসংগত আচরণের কথা, পরিবারে নারী নির্যাতনের কথা (যেখানে বাদ যায় না স্বামীর অত্যাচারও, যা দৈহিক ও মানসিক) এবং অনুরূপ বৈষম্য, পীড়ন ও নির্যাতনের ঘটনাবলি।

হিসাব মিলাতে গেলে দেখা যায়, এ ক্ষেত্রে ইতিবাচকতার চেয়ে নেতিবাচক ঘটনাবলি তাত্পর্যে-গুরুত্বে ও অপরাধতত্ত্বের বিচারে অনেকটাই ভারী। বিশেষ করে যখন যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ নির্যাতন, আগুনে পুড়িয়ে মারা বা এসিডে দগ্ধ করার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এজাতীয় ঘটনার সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়।

আর পোশাকশিল্প খাতে একসময় তরুণীদের তো ছিল এক অভিশপ্ত জীবন। স্বাধীন জীবিকার টানে গ্রামীণ তরুণীদের স্বেচ্ছায় অভিশাপ বরণ। কলকাতার একজন সমাজসেবী অধ্যাপক আমাকে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে তো নীরব নারী বিপ্লব ঘটে গেছে। ’ তিনি অবশ্য জানতেন না কথিত বিপ্লবের অবিশ্বাস্য অন্ধকার দিকটি, যেখানে একসময় পোশাককর্মী তরুণী নির্যাতন ও হত্যা এক অবিশ্বাস্য মাত্রায় দেখা দিয়েছিল। এখন তা কমেছে, তবে তা দূর হয়নি। বৈষম্য ও যৌন হয়রানি এখনো রয়েছে। এ খাতে শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ও আন্দোলন তৈরি করতে না পারলে অসহায় পোশাককর্মী তরুণীর জীবনে স্বস্তি, শান্তি, নিরাপত্তা আসবে না।

বিশেষ বিশেষ খাতের বাইরে সমাজের নানা স্তরে নারী নির্যাতন, নারী হত্যা, বখাটে তরুণ ও যুবকদের কিশোরী ও তরুণীদের ওপর সংখ্যায় ও ভয়াবহতায় বিশেষ তাত্পর্য বহন করছে। এসব সামাজিক অপরাধ ও পাপ বন্ধ হওয়া দূরে থাক, কমারও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা, উত্ত্যক্ত হয়ে তৃষা নামক কিশোরীর আত্মহত্যা সংবাদপত্রে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখেছি তনু, মিতু, খাদিজাকে নিয়ে কাগজে কাগজে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।

দু-চারটি ক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও কিছুসংখ্যক ঘটনা এখনো প্রশাসনের কাছ থেকে সুবিচার পায়নি, তদন্তেই সব আটকে আছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, সমাজ এসব ঘটনার অভিঘাতে আলোড়িত হচ্ছে না, প্রতিবাদী আন্দোলন দূর অস্ত। একমাত্র সংবাদপত্র মহল যা কিছু লিখছে, তাই একমাত্র প্রতিক্রিয়া। কখনো উচ্চ আদালতকে কোনো ঘটনায় এগিয়ে আসতে দেখা যায়। কিন্তু কই, হতভাগ্য তরুণী তনু হত্যার ঘটনায় সর্বোচ্চ আদালতকে তো ফয়সালায় এগিয়ে আসতে দেখা গেল না, সে কি ওদের পরিবার আটপৌরে দরিদ্র বলে?

এ অবস্থায় ঘটা করে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের নৈতিক অধিকার কি বাংলাদেশি সমাজের আছে? আমার তো তা মনে হয় না। বিশেষ করে যখন ওই দিবসের কাগজগুলোতেই ফুটে উঠেছে ক্ষোভ, অভিযোগ, প্রতিকারহীন অন্যায়ের ক্রমাগত বেড়ে চলার কথা। এমন এক সামাজিক দুরবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সামনে অন্যান্য খাতে কৃতিত্বের জন্য গর্ব করে কোন মুখে?

বিশেষ করে কাগজে শিরোনাম ‘আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস/থামছে না নারী নির্যাতন’। এমনকি খবর : ‘অনলাইনে নিউজ শিরোনামে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়’। কিংবা শিরোনাম ‘নারীর প্রতি সহিংসতার অর্থনৈতিক প্রভাব’। বিশ্ব অথবা সম্পাদকীয় কলাম: ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস/সমাজের সর্বক্ষেত্রে অধিকার নিশ্চিত করুন’।

এজাতীয় প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় কলামের বিশদ বক্তব্য তুলে ধরতে হলে তা কাগজে কুলাবে না। এগুলো তো মাত্র এক দিনের খবর। এ ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য একটাই—এ অবস্থার পরিবর্তন না ঘটায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে কালির ছোপ পড়ছে। তাই অবস্থার একমাত্র ব্যবস্থা হচ্ছে সামাজিক শক্তির প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ানো। এগিয়ে আসতে হবে উচ্চ আদালত ও প্রশাসনকে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে। চাই জনগণের সচেতন প্রতিবাদ, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব শ্রেণি থেকে। একমাত্র তখনই তৈরি হবে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালনের অধিকার। তা না হলে দিবস পালন ফ্যাশন শোর মতো দেখাবে।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 


মন্তব্য