kalerkantho


খেলার জন্য একাগ্রচিত্ততা প্রয়োজন

ইকরামউজ্জমান

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



খেলার জন্য একাগ্রচিত্ততা প্রয়োজন

‘ওয়েক আপ কল’ বেজে চললেও টেস্ট ক্রিকেটে ক্রিকেটাররা দলগতভাবে জেগে উঠতে পারছেন না! জেগে ওঠার জন্য যে ধরনের সংকল্পবোধ, মানসিক শক্তি, দৃঢ়তা, সমষ্টিগত দায়িত্বশীলতা ও অভীষ্ট মনঃসংযোগ দরকার তাতে ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ভালো খেলা বা জয়ের জন্য ক্ষুধা, আবেগ ও একাগ্রচিত্ততা স্বয়ংসম্পূর্ণ। অবশ্যই আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, তবে তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও থাকতে হবে। ক্রিকেট তো শুধু কাঠের ব্যাট আর শক্ত চামড়ার বলের খেলা নয়, এই খেলার মধ্যে বসবাস করা ছাড়া উপায় নেই। টেস্ট ক্রিকেট অনেক শক্ত খেলা। দীর্ঘ সময়ের এই খেলায় মেজাজ রপ্ত করে অভ্যস্ত হতে না পারলে মাঠে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় হাবুডুবু খেতেই হবে। মাঠের পরীক্ষায় ‘সফলতা’ শব্দটি দূরে থাকবে। মানসিক চাপ নিয়েই খেলতে হবে। টেস্ট ক্রিকেট খেলার সব মানসিকতাসম্পন্ন দু-একজন ক্রিকেটার একটি দলের জন্য যথেষ্ট কখনো নয়।

শ্রীলঙ্কায় ফ্ল্যাট উইকেটের গলে প্রথম টেস্টে প্রতিপক্ষের বোলিং অ্যাটাক এমন কোনো অসাধারণ ছিল না (এমনকি স্পিন আক্রমণও, তবে বৈচিত্র্য ছিল), তা সত্ত্বেও আমাদের জাতীয় দল অনেকটা আত্মসমর্পণ করে পরাজিত হয়েছে ২৫৯ রানে। এটা কাম্য নয়।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলার মধ্যে থেকে এভাবে মাঠে শুয়ে পড়া উদ্বেগের বিষয়। এটা স্পষ্ট হয়েছে—মানসিকতা, প্রয়োগক্ষমতার ঘাটতি, ধৈর্যের অভাব, অনুশীলনে যা করা হয়েছে—আসল জায়গায় গিয়ে গুলিয়ে ফেলা, ম্যাচের পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে খেলা, দুঃসাহস-প্রীতি দলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মুখে এক রকম, বাস্তবতায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে অন্য রকম হলে তো চলবে না। খেলতে হবে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার জন্য। যা বিশ্বাস করা হয় তার প্রতিফলন ঘটাতে না পারলেই তো বিপদ। নিজের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস খুবই জরুরি। সামর্থ্য না থাকলে, প্রতিভা না থাকলে এ কথাগুলো উঠে আসত না।

পিচে থাকা বল বুঝতে না পারলে তো খেলা যাবে না। প্রতিপক্ষের বোলিংয়ে তো বৈচিত্র্য থাকবেই, এটা মাথায় নিয়ে খেলতে হবে। উইকেটে সেট হওয়ার পর অস্থিরতা, তাড়াহুড়া করে আউট হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। পরে অনুশোচনা করে লাভ নেই। টেস্ট ক্রিকেট দীর্ঘ সময়ের। সেশন বাই সেশন খেলতে হবে দলের পরিকল্পনা ও চাহিদা অনুযায়ী। একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজন লম্বা পার্টনারশিপ। ৬০-৭০ রানের ছোট জুটিতে লাভ হয় না। দলে বড় সেঞ্চুরি দরকার। দু-তিনজন ফিফটির ঘর পার হলেও লাভ হয় না। এটা তো গল টেস্টে সবাই দেখেছেন।

এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় দল আজ ১৫ মার্চ খেলতে নামবে তার টেস্ট ইতিহাসের ১০০তম টেস্ট ম্যাচ কলম্বোর পিসারায়। গলের থেকে পিসারার কন্ডিশন পুরোপুরি ভিন্ন। বাংলাদেশ ১৭ বছরে ১০০টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছে। সুযোগটা কম। টেস্ট ম্যাচ বেশি খেলতে না পারলে এই খেলায় উন্নতি করা কষ্টসাধ্য।

দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও অর্থবহ ক্রিকেট কূটনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্রিকেট বোর্ডের উচিত হবে বাংলাদেশ যাতে নিয়মিতভাবে আগামী ১২-১৩ বছর অনেক বেশি টেস্ট ম্যাচ খেলতে পারে, এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া। পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ সময়ের ক্রিকেটকে ‘রিলিজাসলি’ লালন-পালন করা। নিশ্চিত করা, যাতে সব ক্রিকেটার এই ক্রিকেট খেলার সুযোগ পান, পাশাপাশি দীর্ঘ সময়ের ক্রিকেটে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। তা না হলে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পারবে না ধারাবাহিকতার সঙ্গে ভালো ক্রিকেট খেলতে। দেশের জন্য টেস্ট ক্রিকেট থেকে সুখময় অভিজ্ঞতা দূরেই থাকবে। গত ১৭ বছরে ৯৯ টেস্টে জয়ের স্বাদ মিলেছে মাত্র আটটি টেস্টে (পাঁচটি জিম্বাবুয়ে, দুটি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও একটি জয় শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে)। ড্র হয়েছে ১৫টি। পরাজয় ৭৬টি ম্যাচে। বাংলাদেশ স্বপ্ন্ন দেখে আগামী ১০ বছরের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটেও একটি সমীহ জাগানো দল হিসেবে পরিচিত হতে। ক্রিকেটারদের সেই প্রতিভা ও সামর্থ্য আছে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পনামাফিক উদ্যোগের মাধ্যমে ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করা।

শততম টেস্ট ম্যাচ সামনে রেখে টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে। আমরাও আশা করছি, দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ ভালো করবে। কিন্তু ভালো করতে হলে নিজেদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। আশা করছি, সেটা দেখা যাবে। বাংলাদেশকে জিততে হবেই, এটা কেউ বলছে না। বলা হচ্ছে, একটি দল হয়ে বাংলাদেশ ভালো ক্রিকেট খেলুক। বাস্তবতায় বাংলাদেশ দলের এখন যে ধরনের অবস্থা, পাঁচ দিনের ক্রিকেটে সাহসের সঙ্গে লড়াই করে ড্র করতে পারাটা জয়েরই সমতুল্য। দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশ কিন্তু সুযোগ পেয়েও সেই সুযোগ হারিয়েছে নিউজিল্যান্ড, ভারত, এমনকি শ্রীলঙ্কায় প্রথম টেস্ট ম্যাচে। বিষয়টি শক্ত ছিল, কিন্তু অসাধ্য তো ছিল না।

খেলার সঙ্গে অবশ্যই ভাগ্য জড়িত আছে, এটা ঠিক। দায়িত্বহীন ব্যাটিং বাংলাদেশকে পেছনে ফেলেছে। শুরু ভালো করে শেষ পর্যন্ত সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। একটাও সেঞ্চুরি নেই। প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানরা কিভাবে দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছেন আমরা দেখেছি। তাঁরা খেলাকে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে মুঠোর মধ্যে নিয়েছেন।

বাংলাদেশের তরুণ বোলারদের পারফরম্যান্সকে তারিফ করতেই হবে। তাঁদের হয়তো বুদ্ধি খাটিয়ে আরো ভালো বল করা উচিত ছিল। ফিল্ডিং থেকে তাঁরা সাহায্য কম পেয়েছেন। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও তরুণ বোলারদের কাঁধ-মাথা ঝুঁকে যায়নি। বরং নিজেদের কাজটা তাঁরা করার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। বোলিংয়ে দল অভিজ্ঞ বোলার সাকিবের সেই সার্ভিস পায়নি।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


মন্তব্য