kalerkantho

সত্য আজ বড় প্রয়োজন

ড. মাহবুব হাসান

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সত্য আজ বড় প্রয়োজন

কবি আসাদ চৌধুরী তাঁর একটি কবিতায় লিখেছিলেন—‘কোথায় সত্য? সত্য কোথাও নেই। মানে তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না, সে খোয়া গেছে।

সত্য যে কঠিন সেটা বিশ্বের গরিব মানুষেরা সবচেয়ে বেশি জানে, বোঝে। কারণ প্রতিদিন তারা সেই সব সত্যের কামড় খেতে খেতে আশায় বুক বাঁধে আর স্বপ্নের সন্ধানে ব্যয় করে জীবন-যৌবন। তারপর একদিন টুক করে ঝরে পড়ে স্বপ্নময় এই পৃথিবী থেকে আরেক অনন্ত জীবনের সীমায়।

ব্যক্তি থেকে শুরু করে গোষ্ঠী ও সামাজিক মানুষেরা ওই সত্যের সন্ধানে ঘোরে প্রতিদিন। রাষ্ট্র ও তার পরিচালকরাও ঘোরে প্রকৃত সত্য কোথায় লুকিয়ে আছে তা দেখতে ও তার পরশ পেতে। কিন্তু এমন তো নয় যে তার কোনো আকার আছে, না তার কোনো স্থানিক অবস্থান আছে। সে সর্বত্র বিরাজমান। আবার তার স্বরূপ আমরা উপলব্ধি করি, কিন্তু তাকে ধরতে পারি না। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে সত্য কিন্তু প্রকাশ পায়।

যিনি প্রকাশ করেন তিনি হয়তো কল্পনাও করেননি যে এ থেকে কঠিন এক সত্যরূপ প্রকাশ পাবে, যা তার এবং তার দেশের চেহারার ‘স্বরূপ’ বেরিয়ে আসবে।

দিনকয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের যৌথকক্ষের [সিনেট ও হাউস] সভায় তাঁর প্রথম ভাষণে এমনই এক সত্য প্রকাশ করে দিয়েছেন। পৃথিবীর এক নম্বর দেশ আমেরিকায় গরিবি কেমন তার একটি সুরত বেরিয়ে এসেছে সেই সত্য থেকে। ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, দেশের চার কোটি ৩০ লাখেরও বেশি নাগরিক ‘ফুড স্টাম্প’-এর সাহায্যে বেঁচে আছে। অর্থাৎ ওই লোকেরা অর্থনৈতিকভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। মার্কিনি সেন্সাস ব্যুরোর ২০১৫ সালের পরিসংখ্যানেও রয়েছে এর সত্যতা। বলা হয়েছে, চার কোটি ৩১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। সেন্সাস ব্যুরোর মতে, যে পরিবারের সদস্য সংখ্যা চারজন এবং ১৮ বছরের নিচের কোনো শিশু নেই, সেই পরিবারের বার্ষিক আয় যদি ২২ হাজার ৫৪১ ডলারের কম হয়, তাহলে তারা দারিদ্র্য।

ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, দেশে বর্তমানে ৯ কোটি ৪০ লাখ লোক কোনো চাকরি পাচ্ছে না। বাস্তব হচ্ছে আমেরিকানরা চাকরি করতে তেমন উৎসাহী নয়। সে জায়গাগুলো দখলে নিয়েছে ইমিগ্র্যান্টরা। আর বেকারের সংখ্যা সম্পর্কে ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য হচ্ছে, গত জানুয়ারিতে বেকারের সংখ্যা ছিল ৭৬ লাখ। অর্থাৎ ট্রাম্প সঠিক তথ্য দেননি।

সত্য আর মিথ্যার ভেজাল মেশানো ওই ভাষণের বিষয়গুলো নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস সোচ্চার। নিউ ইয়র্ক টাইমসের ‘ফ্যাক্টস চেক’-এ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের সত্য আর বানোয়াট নিয়ে লিখেছেন পত্রিকার সাংবাদিক ডানা গোল্ডস্টেইন। সেখানে দেখানো হয়েছে যে ট্রাম্প সত্য গোপন করেছেন বা বানোয়াট তথ্য দিয়েছেন। বিশেষ করে ৯ কোটি ৪০ লাখ বেকার নিয়ে তথ্যটি সঠিক নয়। সঠিক নয় ট্রাম্পের এই কথাটি যে ‘আমরা অন্য দেশের সীমান্তের সুরক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু নিজেদের সীমান্ত উন্মুক্ত। ’ এ বিষয়ে ডানা লিখেছেন, এটা সত্য যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সীমান্ত উন্মুক্ত, তার মানে এ নয় যে সেই সীমান্ত সুরক্ষিত নয়। ২১ হাজার সীমান্তরক্ষী পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে, প্রায় সমসংখ্যক কাস্টমস ও সীমান্ত কর্মকর্তা সেখানে নিয়োজিত। ৩২৫টি সীমান্ত ফাঁড়ি রয়েছে।

তারা কি সীমান্ত সুরক্ষা দিচ্ছে না, এ প্রশ্ন আমাদের মনে জাগছে। যেমন—খুনখারাবি বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন ট্রাম্প। গত ৫০ বছরের মধ্যে নাকি ২০১৫ সালে সবচেয়ে বেশি মানুষ খুনের শিকার হয়েছে। তথ্যটা নির্ভুল নয়। এফবিআইয়ের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে খুনের ঘটনা ঘটেছে ১৫ হাজার ৬৯৬টি। সেটা ২০১৪ সালের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। তবে ১৯৯১ সালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৭০৩টি। তাহলে সত্য কোনটা? ট্রাম্প যেটা বলেছেন সেটা, নাকি যেটা এফবিআইয়ের অপরাধ পরিসংখ্যানে যা রেকর্ড আছে, সেটা?

এভাবে সত্য আর মিথ্যায় সাজানো ভাষণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে দেশের সর্বত্র। বিশেষ করে আনডকুমেনটেড ইমিগ্র্যান্টরাই বেশি আতঙ্কিত। ডকুমেন্ট আছে বা গ্রিনকার্ডধারীরাও ভীতসন্ত্রস্ত্র। ওয়েস্ট ইন্ডিজের জ্যামাইকা থেকে আমেরিকান পাসপোর্টধারী দেশে ফেরার পথে ফ্লোরিডার বিমানবন্দরে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হন মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর ছেলে মোহাম্মদ আলী জুনিয়র। সঙ্গে তাঁর মাও ছিলেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে মোহাম্মদ আলীর একটি ছবি থাকায় তিনি হেনস্তার শিকার হননি। কিন্তু ছেলেকে তাঁর নাম ও ধর্ম নিয়ে দুই ঘণ্টা জেরা করে হেনস্তা করেছে। বাই বর্ন আমেরিকার নাগরিককে তার সীমান্তরক্ষী হোমল্যান্ড সিকিউরিটির লোকেরা শুধু মুসলমান হওয়ায় হেনস্তা করবে কেন? কী তার আইনি ভিত্তি আছে? হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সাদা আমেরিকানরা যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করছে, এটা তার এক প্রমাণ। ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই আশ্বস্ত করুন না কেন, তিনি যে বর্ণবাদিতার বীজ উপ্ত করেছেন, তা পরিবাহিত হচ্ছে কর্মরত সাদাদের কাজকর্মে। মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা বর্ণবাদিতা সুযোগ বুঝেই গোখরার মতো ফণা তুলছে।

হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধি রিপোর্টারকে ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে। ফলে ওই সব মিডিয়া তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ট্রাম্প বলেছেন, সাংবাদিকরা করাপটেড এবং তাঁরা ফেক নিউজ করেন।

কোনো কোনো মিডিয়া হয়তো মাঝেমধ্যে বিকৃত সত্যের ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট করেছে। সে দায় তো সেই পত্রিকার ওপর বর্তাবে। তাকে কেন্দ্র করে গোটা সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের ‘করাপটেড’ বলা কতটা ন্যায় মন্তব্য বলে বিবেচিত হবে? আসলে ট্রাম্প নিজের বিকৃত চিন্তার সুতা ধরে যে এমনটা করেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি যে ১৮ বছর কর ফাঁকি দিয়েছেন, সেটার তো প্রতিবাদ করেননি বা বলতে পারেননি যে তিনি ফাঁকি দেননি। তিনি যে জুয়ার বা ক্যাসিনোর ব্যবসায়ী সেটা তো অস্বীকার করেননি। কারণ সেগুলো ডকুমেন্টেড। সেগুলো অস্বীকার করে কথা বললে তিনি আরো খাদে পড়বেন। তাই মিডিয়ার ওপর কালি ছিটিয়ে দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক চরিত্রের মধ্যে পড়ে না। মিডিয়া হচ্ছে রাজনীতিকদের প্রচার-প্রসারের হাতিয়ার। সেই অস্ত্র ভোঁতা করা হলে বা সেই অস্ত্রকে নিরপেক্ষ নয় বললে তো তারা সত্যের সন্ধান করবেই।

ডোনাল্ড জে ট্রাম্পও মিথ্যা বা বানোয়াট তথ্য দিয়ে বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। পত্রিকাগুলো যে মিথ্যা বা ফেক রিপোর্ট করেনি, ট্রাম্পের গায়ে লেগেছে সে কারণেই। সিএনএন বা নিউ ইয়র্ক টাইমস ফেক নিউজ করেনি। তাই সত্যের প্রকাশ আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সত্য প্রকাশ হচ্ছে ধীরে ধীরে। ট্রাম্প যে দুই নম্বরি পথে, মানে রাশিয়ান হ্যাকারদের সহযোগিতায় হিলারিকে হারিয়েছেন, সেটাই বেরিয়ে আসছে। প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটি এর মধ্যেই তদন্তে নেমেছে নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারণা দলের সঙ্গে রাশিয়ার কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে। ওই কমিটিতে থাকা শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা অ্যাডাম স্কিফ এ কথা বলেছেন। কমিটির চেয়ারম্যান ও রিপাবলিকান নেতা ডেভিন নুনেসও তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার আগে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে।

এ বিষয়ে সত্যতা আছে বলেই বারাক ওবামার শেষ সময়ে ৩৫ জন রাশিয়ান কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু রাশিয়া তার প্রতিশোধে কোনো বহিষ্কারের পথে যায়নি।

তদন্তে সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে এলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন বলে মনে হয় না।

 লেখক : কবি, সাংবাদিক, আমেরিকাপ্রবাসী


মন্তব্য