kalerkantho


উপসর্গহীন গ্লুকোমা প্রতিহত করুন

ডা. এম নজরুল ইসলাম

১৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



উপসর্গহীন গ্লুকোমা প্রতিহত করুন

১২-১৮ মার্চ বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ। নীরব অন্ধত্বের কারণ গ্লুকোমা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে ২০১০ সাল থেকে বিশ্ব গ্লুকোমা সমিতি প্রতিবছরই এই সপ্তাহ পালন করে থাকে।

এবারের প্রতিপাদ্য Beat Invisible Glaucoma বা উপসর্গহীন গ্লুকোমাকে প্রতিহত করুন। এতে বোঝানো হয়েছে, গ্লুকোমা দুরারোগ্য ব্যাধি নয়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিত্সা নিলে এ রোগ প্রতিহত করা যায় এবং গ্লুকোমা নিয়েও সারা জীবন ভালো থাকা যায়।

বিশ্বের প্রায় ৭০ মিলিয়ন লোক গ্লুকোমা রোগে ভুগছে। কোনো উপসর্গ ছাড়াই চোখের প্রেসার বেড়ে গিয়ে দৃষ্টিশক্তি হারানোর অন্যতম কারণ গ্লুকোমা। বাংলাদেশে ১০ বছর আগেও ৯৯ শতাংশ লোকই এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত ছিল না। এখন এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন অনেকেই জানেন, এই রোগটি নীরব অন্ধত্বের প্রধান কারণ। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে চোখের অনেক ক্ষতি থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

এ জন্য সময়মতো প্রতিদিন ওষুধ ব্যবহার ও কিছুদিন পর পর চোখের প্রেসার মাপতে হয়। আবার সফল অপারেশন হলে সারা জীবন ড্রপ বা ট্যাবলেট ব্যবহারের প্রয়োজন নাও হতে পারে।

অনেকে মনে করেন, গ্লুকোমা হলেই চোখ অন্ধ হয়ে যাবে এবং এর কোনো চিকিত্সা নেই। এই ধারণায় কিছু সত্যতা থাকলেও পুরোপুরি সত্য নয়। তবে এটা সত্য যে গ্লুকোমা চোখের একটি মারাত্মক অসুখ এবং চিকিত্সার আগে পর্যন্ত যেটুকু দৃষ্টি কমে গেছে সেটা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। তবে যেটুকু দৃষ্টি বিদ্যমান আছে সেটুকু চিকিত্সা দিয়ে রক্ষা করা সম্ভব।

গ্লুকোমা নির্ণয়ের পর রোগী মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়ে। যখন বুঝতে পারে তার চোখের রোগটি স্থায়ী এবং চোখের দৃষ্টিশক্তি ও দৃষ্টির পরিসীমার আর কখনো উন্নতি হবে না, তখন তারা খুবই মানসিক চাপে থাকে। অথচ চিকিত্সকের পরামর্শে নিয়মিত চোখের ওষুধ ব্যবহার করলে এবং চোখের চাপ স্বাভাবিক সীমার মধ্যে রাখতে পারলে ভালো থাকার সম্ভাবনা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। কারো যদি ওষুধে কাজ না হয়, সে ক্ষেত্রে শল্যচিকিত্সা লাগতে পারে। এর ঝুঁকি কিছু বেশি হলেও অন্ধত্ববরণ করার চেয়ে তা অবশ্যই ভালো।

চিকিত্সার জন্য ওষুধ বা ইনসুলিন দিয়ে ডায়াবেটিসে রক্তের শর্করা স্বাভাবিক রাখতে হয়। উচ্চ রক্তচাপের জন্য ওষুধ দ্বারা রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে রাখতে হয়। এ দুটি রোগই সারা জীবনের রোগ। সারা জীবন এর চিকিত্সা করতে হয়। ঠিক তেমনি গ্লুকোমাও সারা জীবনের রোগ। ওষুধ ব্যবহার করে বা শল্যচিকিত্সার মাধ্যমে চোখের চাপ স্বাভাবিক মাত্রায় রাখতে হবে। তিন-চার মাস পর পর চিকিত্সককে দিয়ে চোখের চাপ এবং চোখের ভেতরের অপটিক নার্ভের অবস্থা, দৃষ্টিশক্তির পরীক্ষা করাতে হবে।

গ্লুকোমা রোগীদের বছরে অন্তত একবার চোখের যাবতীয় ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা ছাড়াও দৃষ্টির পরিসীমা পরীক্ষা করা উচিত। এ ছাড়া চিকিত্সক প্রয়োজন মনে করলে আধুনিক কয়েকটি পরীক্ষা যেমন রেটিনার রঙিন ছবি, ওসিটি মেশিনের সাহায্যে রেটিনার নার্ভ ফাইবার অ্যানালিসিস, অপটিক ডিস্কের পরীক্ষা ইত্যাদি করাতে পারেন।

গ্লুকোমা চিকিত্সার জন্য প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চোখের নার্ভের যত বেশি ক্ষতি হওয়ার পর রোগ নির্ণয় হয়, ততই চিকিত্সা জটিল হয়। এ জন্য চশমার পাওয়ার পরিবর্তন বা অন্য কোনো কারণে যখনই চক্ষু চিকিত্সকের কাছে যাওয়া হয়, তখনই জেনে নেওয়া উচিত গু্লকোমা আছে কি না বা সন্দেহজনক কোনো উপসর্গ আছে কি না। এক ধরনের গ্লুকোমায় চোখের চাপ বেড়ে ৬০ থেকে ৮০ মিমি মারকারি হয়ে যায়। এসব রোগী চোখে তীব্র ব্যথা, দৃষ্টিশক্তি একেবারেই কমে যাওয়া, চোখ লাল হওয়া—এসব উপসর্গ নিয়ে চিকিত্সকের কাছে আসে। এসব রোগীর অতি দ্রুত চিকিত্সা করতে হবে। দুই-এক ঘণ্টা দেরিতে এসব রোগীর চোখের নার্ভ অনেকটাই খারাপ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং কারো ব্যথাযুক্ত লাল চোখ হলে যত দ্রুত সম্ভব একজন চক্ষু চিকিত্সকের কাছে যাওয়া উচিত। এ জাতীয় গ্লুকোমা রোগীদের শুধু ওষুধে চোখের চাপ স্বাভাবিক হয় না। সে ক্ষেত্রে চোখের চাপ ওষুধের মাধ্যমে যতটা সম্ভব কমিয়ে শল্যচিকিত্সা করতে হয়।  

ছোট শিশুদেরও গ্লুকোমা হতে পারে। জন্মগত গ্লুকোমা থাকলে চোখের আকৃতি, বিশেষ করে কর্নিয়া বা নেত্রস্বচ্ছের আয়তন বাড়তে পারে। চোখ দিয়ে পানি পড়তে পারে, চোখ ট্যারা হয়ে যেতে পারে। এসবের কোনো লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে চিকিত্সা নেওয়া উচিত। শিশুদের গ্লুকোমার চিকিত্সায় ওষুধ দিয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় না, এ জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শল্যচিকিত্সা করতে হয়, যাতে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সফলতা পাওয়া যায়।

গ্লুকোমা হলে দুশ্চিন্তা না করে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিত্সা করালে গ্লুকোমা সঙ্গে নিয়েই প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। নিজের দৃষ্টি যতটুকু ভালো আছে, তা দিয়ে বাকি জীবন ভালোভাবেই বসবাস করা যায়। এ জন্য দরকার দৈনন্দিন জীবনের কিছু নিয়ম ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা।

 

লেখক : অধ্যাপক, ফ্যাকো ও গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশ আই হসপিটাল, ঢাকা

nazrul.islam@hotmail.com

www.profnazrul.com


মন্তব্য