kalerkantho


যোগাযোগ মাধ্যম ও শিক্ষা

জুরানা আজিজ

১৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আমি খুব সচেতনভাবে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে ছাত্রদের পড়াই। এটি সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব পদ্ধতি। আমরা যখন শিক্ষার্থীদের পড়াই, আমরা নানা রকম পদ্ধতি অবলম্বন করি। যেহেতু আমার বিষয় ভাষা শিক্ষা, ভাষা শিক্ষণের ফলপ্রসূ ও সর্বাধিক প্রয়োগকৃত পদ্ধতিগুলোই আমরা বেছে নিই। মজার বিষয়, প্রত্যেক শিক্ষকেরই নিজস্ব কিছু পাঠদান পদ্ধতি রয়েছে। ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত সর্বাধিক জনপ্রিয় পদ্ধতি যোগাযোগ উপযোগী ভাষা শিক্ষা বা Communicative Language Teaching। এই পদ্ধতিতে একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং শিক্ষার্থীদের জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করেন। বিষয়টির মধ্যে মূল যেটি লক্ষ্য থাকে তা হলো দ্বিতীয় ভাষা ব্যবহারের সময় যেন যোগাযোগ বিষয়টি প্রাধান্য পায়। আমাদের ছাত্ররাও ‘যোগাযোগ স্থাপন’ বিষয়টি মাথায় রাখে। আজকাল এই যোগাযোগ স্থাপনে আমরা নির্ভর করি ডিজিটাল পদ্ধতির। ব্যাপারটি এ রকম, এই যোগাযোগকে শতভাগ ফলপ্রসূ করতে আমরা ব্যবহার করি কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া, আরো কত কী?

বিষয়টি নিয়ে কিছু গবেষণা শুরু করলাম।

আমার নিজের নেওয়া ২৪টি ক্লাসের ১২টিতে ব্যবহার করলাম মাল্টিমিডিয়া, প্রজেক্টর। আর ১২টিতে করলাম পুরনো পদ্ধতি—সেই যে আমরা ছোটবেলায় দাদা-দাদি, নানা-নানি, কিংবা মায়ের মুখে পরম মমতায় যখন গল্প শুনতাম, মনে পড়ে? সেই সময়ের একটি প্রাচীন পদ্ধতি। এই ১২টি ক্লাসে আমি ছাত্রদের বোঝালাম, আমি যা বুঝি, যেটি আমি বুঝতে সক্ষম হয়েছি ওই নির্দিষ্ট বিষয়ে। আশ্চর্য, যখন এই পরের ১২টি ক্লাসের শেষে শিক্ষার্থীদের ওই বিষয়টি অনুধাবনের পর্যায়টি পরীক্ষা করলাম, দেখলাম তাদের স্কোর (Score) অনেক বেশি।

কিভাবে হলো এটা? আমরা হয়তো এর উত্তরও জানি না। সত্যি কি ডিজিটাল যুগে এই প্রযুক্তির বর্ণিল ব্যবহার আমাদের শিক্ষায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর যোগাযোগ ঘটাতে পারছে?

মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ কি অন্য কোনো মাধ্যমে সর্বোচ্চ সম্ভব?

আমরা যেসব ডিজিটাল মিডিয়া শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করি, সেগুলো শিক্ষার্থীদের কোনো একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ করে ফেলে বলে মনে হয় আমার। সত্যি কথা হলো, রবীন্দ্রনাথ পড়তে গিয়ে দুটি লাইনে আমার মনে যে মনচ্ছবি তৈরি হলো এসব ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়ায় সেটি কিভাবে সম্ভব? অথবা জীবনানন্দের কোনো এক শীতের রাত? এসব সুন্দর মনচ্ছবির মৃত্যু ঘটেছে ডিজিটাল মিডিয়ারই কল্যাণে।

একসময় আমরা বই পড়তাম, বই পড়তে পড়তে কল্পনার একটি চমত্কার জগৎ তৈরি হতো। মনে আছে ‘বীরপুরুষ’ কবিতা পড়তে গিয়ে আমি ভাবতাম, ইস্! যদি মাকে আমিও এভাবে বাঁচাতে পারতাম। নিজেকে দেখতাম দিগ্বিজয়ী নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যখন আমাদের প্রিয় ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার Romanticism বা পোস্ট-মডার্নিজম পড়াতেন, আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম স্যার কী বলছেন। আজকাল মাল্টিমিডিয়া নিয়ে এত এত লেকচার সুন্দর ডিজাইন করে তৈরি করে নিয়েও ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে সেই মুগ্ধতা লক্ষ করি না। আমার মতো আর কেউ কি এটি খেয়াল করেছেন?

বিশ্বের এগিয়ে যাওয়ার গতিটি আজ এত দ্রুত যে আমরা সব সময় একটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। এই প্রতিযোগিতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমগুলো অবশ্যই অতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু আমার মনে হয়, এই প্রযুক্তিই কোথায় যেন আমার বুদ্ধিদীপ্ত শিক্ষার্থীদের বাধাগ্রস্ত করছে সত্যিকার শিক্ষা গ্রহণে, জ্ঞান অর্জনে, জ্ঞান অনুসন্ধানে ও জ্ঞানের প্রয়োগে। একজন শিক্ষার্থী যখন মাল্টিমিডিয়ায় তার সমগ্র চেতনা একীভূত করে, তখন সে তার কল্পনা করার ক্ষমতাটি হারায়। তার নিজস্ব অভিজ্ঞতাগুলোকে সে কাজে লাগাতে চায় না। সে তখন ওই মিডিয়াতেই সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে।

ডিজিটাল মিডিয়াগুলো আমার অপ্রিয় নয়। কিন্তু সত্য হলো, যখন আমি খুব কঠিন কোনো বিষয় একজন ছাত্রকে খুব যত্ন করে পড়াই অবাক হয়েই লক্ষ করি, তার বোঝার মধ্যে কোনোই সমস্যা হচ্ছে না। তার চিন্তার জগিট খুলে যাচ্ছে। সে হয়তো পরবর্তী সময়ে আরেকটি নতুন জগৎ আবিষ্কার করে ফেলেছে।

ডিজিটাল মিডিয়া কোনোভাবেই এই জগতের চিন্তাশীলতাকে ধারণ করতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। একটি মজার উদাহরণ দিই, বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন ড্রয়িং শিক্ষকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি চমত্কার একটি বর্ণনা দিলেন। তাঁর শ্রেণিতে ছয় বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের তিনি বসন্তকে আঁকতে বলেছেন। তিনি একপর্যায়ে বললেন, বাচ্চারা, বসন্তের উপাদান হলো সবুজ ঘাস, প্রজাপতি, মেঘমুক্ত আকাশ, ফুলের সমারোহ, নানা রঙের খেলা। এখন আঁকো। দেখা গেল, ১৪ জন ১৪টি বসন্তের ছবি এঁকেছে। হয়তো সবাই সব উপাদান তাদের ছবিতে ধারণ করতেও পারেনি। কিন্তু যখন আমি দেখলাম একটি শিশু এঁকেছে ফুল, একজন রংধনু, একজন সবুজ গাছ—মনে হলো সত্যি তো, মানুষের মনোজগতের কত জানালা। একেকটি জানালা খুললেই একেকটি জগৎ।

কেন যেন আমার মনে হয়, আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের এই শত শত জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। তাই শিক্ষার্থীরা শেখার আগ্রহটাও হারিয়ে ফেলছে। ড্রয়িং শিক্ষকের বর্ণনা শুনে আমি চমত্কৃত হয়েছিলাম। আমার মনে হয়, তিনি শিক্ষায় যোগাযোগের বিষয়টি চমত্কার ও সুনিপুণভাবে প্রয়োগ করেছেন।

প্রযুক্তির কম ব্যবহার মানুষকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিখন ও শিক্ষণের সুযোগটিকে বাড়িয়ে দেয় বলেই আমার মনে হয়। জ্ঞানের পরিবেশন কখনোই সাত-আটটি স্লাইডে যতটা না বিশদভাবে উপস্থাপন সম্ভব, একটি গোটা বই পড়ে শিক্ষার্থী আরো বেশি বুঝতে পারে। শিক্ষকের কাজ জ্ঞান অর্জনে শিক্ষার্থীর মধ্যে আগ্রহ তৈরি। আর সেই আগ্রহ তৈরির জন্য একজন শিক্ষকের প্রয়োজন তাঁর শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট প্রেষণা ও অনুপ্রেরণা দান। সত্যি কথা হলো, আমরা এই আধুনিক যুগে কয়জন শিক্ষক পেরেছি আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহী করে তুলতে?

সত্যি কথা হলো, আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা শিক্ষার প্রয়োগ করতে পারছি, কিন্তু আমাদের ছাত্রদের চিন্তাশীলতা ও সৃজনশীলতার কতটুকু উন্নয়ন ঘটাতে পারছি সে বিষয়টি ভাবতে হবে।

আমরা যতটা না প্রযুক্তিনির্ভর হব, তার চেয়ে অনেক বেশি ভাবতে হবে শিক্ষার্থীর মনোজগতের দরজাগুলো কোন পদ্ধতিতে পাঠদান করলে উন্মোচন করতে সক্ষম হব। শিক্ষক হবেন এমন একজন, যিনি শিক্ষার্থীর অন্ধকার জগৎ আলোকিত করার প্রয়াস গ্রহণ করবেন। তাই শিক্ষার সঙ্গে, তার চিন্তার জগতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করতে হবে। শুধু প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে নয়, কেননা এই প্রযুক্তি আমাদের অন্যতম একটি চিন্তারই ফলাফল।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ভাষা শিক্ষা বিভাগ

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য