kalerkantho


এপার-ওপার

বিজেপি-ঝড়ে বিরোধী পতন ইউপিতে

অমিত বসু

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ভোট শেষ না হতেই মাঠ ছেড়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা। উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রীই ছিলেন তিনি। তাঁর দায়িত্ব ছিল কংগ্রেসকে টেনে তোলা। দলের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির নেতা, মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের হাত ধরে ডুবতে ডুবতে ডাঙায় উঠতে গিয়ে পিছলেছেন। ডুবন্ত বড় ভাইকে এভাবে ফেলে যাওয়া কি প্রিয়াঙ্কার উচিত হয়েছে! তিনি নিজে কোথাও কৈফিয়ত দেননি। মা সোনিয়া গান্ধী ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত দিল্লিতে থেকেও উদাসীন ছিলেন। ফলাফল না দেখেই দেশ ছেড়েছেন। তিনি কি জানতেন, উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে! এ পতন নয়ন মেলে না দেখে কোথাও চলে যাওয়াই ভালো। সোনিয়া বিদেশে গেলেন কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে। যাওয়ার আগে বললেন, ‘আমার চিকিৎসা করাটা জরুরি। তাই বিদেশ যাচ্ছি।

দু-চার দিনেই ফিরব। ’ সোনিয়া অসুস্থ। মাঝেমধ্যেই চিকিৎসার স্বার্থে বিদেশে যান। এবারও যাওয়ার কারণটা একই। সেটা কি দুই দিন পরে গেলে হতো না! তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন নয়। এমন গভীর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের সভানেত্রী হিসেবে দেশের বাইরে থাকাটা সমীচীন হতে পারে না। হারজিতের মুহূর্তে নেত্রীই যদি পলাতক হন, কর্মীরা ভরসা পাবে কী করে!

উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি-ঝড়ে উড়ে গেল বিরোধীরা। যাওয়ার কথাই ছিল। সময়টা বসন্তের। বসন্তে ফুল গাঁথল বিজেপির জয়ের মালা। সেটা সম্ভব হলো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্যই। লড়াইটা ছিল তাঁর একার। নভেম্বর থেকে মোদির বিরুদ্ধে ঝড় তুলেছিল বিরোধীরা। মোদি ৫০০, এক হাজার টাকার নোট বাতিল করতেই বিরোধী শক্তি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোদির ওপর। মোদি একা ঠেকিয়েছেন। নোট বাতিলের যুক্তি ছিল কালো টাকা নস্যাৎ, দুর্নীতির নির্বাসন। বিরোধীরা সেটা মানেনি। তারা জানত, এটা ভয়ংকর সিদ্ধান্ত। মোদির সিদ্ধান্ত মানতে হলে বিরোধী শক্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মোদি সব দলকে ছাপিয়ে একার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন।

এ মুহূর্তে সব থেকে অসহায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নোটকাণ্ডে মোদিবিরোধী জোট গড়তে রাজ্যে রাজ্যে ঘুরেছেন তিনি। সব অ-বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীকে বুঝিয়েছেন, এখন সব বিরোধীর এক হওয়ার পালা। মোদিকে যেভাবেই হোক উল্টে ফেলতে হবে। তাঁর স্লোগান, বিজেপির পতনে বিরোধীদের জাগরণ। নির্বাচনের আগে মমতা ছুটেছিলেন উত্তর প্রদেশে। প্রাণপণে মোদিবিরোধী প্রচারে রাজ্যটিকে অখিলেশের পাশে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, যাতে মোদিকে মানুষ ছুড়ে ফেলে।

সেটা হলো কোথায়! ঘটল উল্টোটাই। বিরোধীরা তলিয়ে গেল। আরো উজ্জ্বল হলেন মোদি। উত্তর প্রদেশে বিজেপির বিপুল জয় অতিরিক্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার সূচক। সংসদের দুই কক্ষের মধ্যে উচ্চকক্ষে বিজেপি ছিল দুর্বল, লোকসভা আর রাজ্যসভার মধ্যে লোকসভায় ভোট হয় সরাসরি। এটা নিম্নকক্ষ। সেখানে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ। সমস্যাটা উচ্চকক্ষ বা রাজ্যসভায়। সেখানে গরিষ্ঠতা না থাকায় বিজেপি বিপদে। বিল পাস করাতে গিয়ে রাজ্যসভায় আটকাত। রাজ্যসভার নির্বাচন সরাসরি মানুষের ভোটে নয়, সব রাজ্যের বিধানসভার বিধায়করা ভোট দিয়ে নির্বাচন করেন।

উত্তর প্রদেশে বিজেপির জয় মানে বিধায়কসংখ্যা বৃদ্ধি। কিছুদিনের মধ্যেই ইউপির রাজ্যসভার আসনে নির্বাচন। উত্তর প্রদেশের ৩৪টি রাজ্যসভার আসন বিজেপির মুঠোয়। সেই জয়ের খাতিরে রাজ্যসভাতেও বিজেপি গরিষ্ঠতায় পৌঁছে যাবে।

২০১৯ সালে বাংলাদেশের সঙ্গেই ভারতে জাতীয় নির্বাচন। তার জয়-পরাজয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবে। ২০১৪ সালে দিল্লিতে বিজেপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল উত্তর প্রদেশ। রাজ্যের ৮০টি লোকসভা আসনে বিজেপি জিতেছিল ৭৩টিতে। এত আসন না পেলে বিজেপি দিল্লির ক্ষমতা দখল করতে পারত না। এবার বিধানসভা ভোটে উত্তর প্রদেশ থেকে বিরোধীরা নিশ্চিহ্ন হওয়ায় বিজেপি হিমালয়ের মতো মাথা তুলে দাঁড়াল, যেটা টপকানোর ক্ষমতা আর রইল না বিরোধীদের। বিজেপির বিরুদ্ধে জোট বাঁধতেও অসুবিধায় পড়বে।

সর্বভারতীয় নেত্রী হিসেবে মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন মমতা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নও দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন আপাতত ভেঙে চুরমার। মোদির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত। উত্তর প্রদেশে মুসলমান ভোটেরও সিংহভাগ পেয়েছে বিজেপি। বিরোধীদের আহ্বানে তারা সাড়া দেয়নি। দলিতরাও সমর্থন জানিয়েছে বিজেপিকে। দলিত নেত্রী মায়াবতী প্রত্যাখ্যাত। পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী যাদবরাও চলে গেছে বিজেপির পক্ষে। মুলায়ম সিং যাদব আর তাঁর পুত্র অখিলেশ যাদবের ভোট কেড়ে বিজেপির ঝুলি বাড়িয়েছেন ভোটাররা। ১৯৯১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর প্রদেশে শেষবার বিজেপির জয় ছিল রেকর্ড ভোটে। এবার তা-ও ছাপিয়েছে।

পাঞ্জাবে বিজেপি হেরেছে আকালি দলের সঙ্গে জোট বেঁধে। হারের দায় বিজেপির না। আকালির দুর্নীতি জোটকে ডুবিয়েছে। উত্তরাখণ্ডে কংগ্রেসকে হটিয়ে জয় ছিনিয়েছে বিজেপি। মণিপুরেও কাত কংগ্রেস। মণিপুরের কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী ইবোবি সিং দিশাহারা। উত্তরাখণ্ডে কংগ্রেস বিজেপির সামনে মাথা তুলতে পারেনি। পাঁচ রাজ্যে ভোটের পর গোয়ায় বল বিজেপির কোর্টে। কংগ্রেস নিজের পায়ে টানতে পারবে কি না সন্দেহ। একমাত্র গোয়ায় জোরে শট মারতে পেরেছে কংগ্রেস।

 

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য