kalerkantho


গণহত্যা দিবস ও আনুষঙ্গিক ভাবনা

ডা. এম এ হাসান

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গণহত্যা দিবস ও আনুষঙ্গিক ভাবনা

২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ বা ‘গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার যে দাবি এতকাল চিন্তায় লালিত হয়েছে, তা আজ বাস্তবতার আলোক দেখছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অঙ্গীকারে। যে যৌক্তিক দাবিটি ক্ষীণকণ্ঠে এতকাল উচ্চারিত হয়েছিল তা সবল, প্রবল ও স্পষ্ট হয়েছে সার্বভৌম সংসদে সংসদ সদস্যদের স্পষ্ট উচ্চারণে। এটি বাস্তবতার ছোঁয়া পায় ১১ মার্চ। জাতীয় সংসদে ঘোষিত হয় ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস।

বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই দিনটি যেমন বিশ্বমানবতার প্রতি চূড়ান্ত এক আঘাতের দিন, স্বাধীন আকাঙ্ক্ষা ধ্বংসের দিন, শুভ-সুন্দর স্বপ্নের ওপর অসুর ও অসুন্দরের প্রভুত্ব স্থাপনের দিন, পরিকল্পিতভাবে একটি জাতি ও গোষ্ঠী বিনাশের দিন, তেমনি তা মৃত্যুঞ্জয়ী অলক্ষ্য স্বপ্নের বীজ বপনের দিন। দৃশ্যমানভাবে ও অনুভবে ওই দিন ছিল লাখো মানুষের মৃত্যু, ধ্বংস ও সর্বোপরি স্বপ্নভঙ্গের দিন। এর প্রভাব রয়ে যায় প্রায় এক কোটি পরিবারের জীবনপ্রবাহে। চূড়ান্ত বিচারে ওই ২৫ মার্চের আঘাতটি ছিল মানুষের জীবনের ন্যায্য অধিকারের প্রতি, মানবমর্যাদার প্রতি, স্বাধীন সত্তাসংশ্লিষ্ট চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার প্রতি নিষ্ঠুরতম আঘাত। দেশে দেশে ঘটে যাওয়া সভ্যতাবিনাশী, মর্যাদাবিধ্বংসী এমন নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের জন্যই ২৫ মার্চের মতো দিনগুলো স্মরণীয় করে রাখা প্রয়োজন। এটি স্মরণ করতে হবে এ কারণে, যাতে এমন দিন আর কোথাও ফিরে না আসে।

পারসেপশনাল অর্থে যাকে আমরা গণহত্যা বলে থাকি, অনেক ক্ষেত্রে তা গণহত্যা নয়।

কম্বোডিয়ায় ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন মানুষের হত্যাকে গণহত্যার সংজ্ঞায় বাঁধা যায়নি। তা বিবেচিত হয়েছে মানবতাবিরোধী খুনের অপরাধ হিসেবে। জেনেভা কনভেনশন ও জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যা বলতে সমষ্টির বিনাশ ও অভিপ্রায়কে বোঝায়। এই গণহত্যা বলতে বোঝায় এমন কর্মকাণ্ড, যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয় এবং এসংক্রান্ত অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজ্যুলেশন ২৬০(৩)-এর অধীনে গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বিশ্বময় প্রতিরোধে সব রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা শুধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ ক্ষেত্রে জাতিগত, গোষ্ঠীগত বা ধর্মগত নিধনের উদ্দেশ্যে যদি একটি লোককেও হত্যা করা হয় সেটাও গণহত্যা। যদি কোনো জাতি, গোষ্ঠী বা বিশেষ ধর্মের মানুষের জন্ম রুদ্ধ করার প্রয়াস নেওয়া হয় বা পরিকল্পিতভাবে বিশেষ জাতি ও গোষ্ঠীভুক্ত নারীর গর্ভে একটি ভিন্ন জাতির জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করা হয় সেটাও গণহত্যা। তবে শেষের বিষয়টিকে ‘জেনোসাইডাল রেপ’ বলা হয়। সব গণহত্যাকেই Organized crime হিসেবে প্রমাণ করতে হয়। আর সভ্যতাবিনাশী এ প্রবণতাকে রোধ করার জন্যই রচিত হয়েছে ‘জেনোসাইড কনভেনশন’।

১৯৭১ সালের ২৫ থেকে ২৯ মার্চের মধ্যে কুমিল্লা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে প্রায় ৩০০ বাঙালি সেনা ও এক হাজার ৬০০ বেসামরিক লোককে আটক করে পাকিস্তানি সেনারা। লে. কর্নেল মনসুরুল হক হামুদুর রহমান কমিশনে দেওয়া এক সাক্ষ্যে জানান, ইয়াকুব মালিকের অঙ্গুলি হেলনে ১৭ জন বাঙালি কর্মকর্তাসহ ৯১৫ জন মানুষকে জবাই করা হয়। সালদা নদী অঞ্চলে আরো ৫০০ লোককে হত্যা করেছে পাকিস্তানি সেনারা। একাধারে এটা ছিল Crimes against humanity of murder এবং War crimes। সেনানিধনের বিষয়টিকে গণহত্যা বলা না গেলেও সাধারণের এ পরিকল্পিত বিনাশ ছিল গণহত্যার অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে শিক্ষক ও ছাত্ররা হিন্দু বলেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন বলে বিবেচনা করা হয়েছে। ১৯৭১ সালে হিন্দুকে যেমন সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, তেমনি হিন্দু সম্প্রদায় ও বাঙালির গর্ভে পাকিস্তানি ও তথাকথিত সাচ্চা মুসলমান তৈরি করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। প্রয়াত পাকিস্তানি মেজর জেনারেল কে এইচ রাজা তাঁর ‘A Stranger in my Country- East Pakistan 1969-1971’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘Gen. Niazi told his officers to let loose their soldiers on the women of East Pakistan till the ethnicity of the Bengaleies was changed.’

সিলেট অঞ্চলের পাকিস্তানি অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার ও ময়মনসিংহের মেজর ইফতেখার রানা উভয়ই জেনারেল নিয়াজির ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দু সম্প্রদায় বিশেষ করে উচ্চবর্ণের হিন্দু নারীর গর্ভে পাকিস্তানি জন্ম দেওয়ার প্রয়াস চালিয়েছিল। এই জেনোসাইডাল রেপের শুরুটা হয় ২৫ মার্চ রাতে। এটা কালক্রমে তুঙ্গে ওঠে এপ্রিলের শেষ ও মে-তে।

১৬ জুন ২০০৩ তারিখে, WCFFC-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার বলেন, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের শেষে বা ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছিলেন। ওই চিঠিতে কর্তৃপক্ষ জানায় যে শেখ মুজিবের ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান আর্মিতে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হবে এবং তাদের সামরিক স্বার্থ ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হবে। চিঠির শেষ অংশে লেখা ছিল, ‘Therefore the  Army cannot allow Sheikh Mujib to become the Prime Minister of Pakistan.’ ওই চিঠিতে সম্ভবত DMO অথবা DMI-এর স্বাক্ষর ছিল। সেই চিঠিটির প্রসঙ্গ সিদ্দিক সালিকের বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। সিদ্দিক সালিক সেখানে বলেছেন যে ওই সময় একজন জেনারেল এখানে এসেছিল এবং সে গভর্নর হাউসে বলেছিল, ‘Don’t worry, we will not allow these black bustards to rule over us.’

নানা বিচারে ২৬ মে বালাগঞ্জে ৭৬ জন, বুরুঙ্গাতে ১৩৬ জন ও সৈয়দপুরের গোলারহাটে ৪১৩ জন নারী, শিশু ও পুরুষ হত্যাকে গণহত্যা বলা যায়। বুরুঙ্গাতে এক হাজার গ্রামবাসী থেকে বেছে বেছে ৪১ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়। চুকনগর হত্যাকাণ্ডটি মিশ্রিতভাবে পরিচালিত গণহত্যা এবং Crimes against humanity of murder-এর একটি উদাহরণ। Enforced disappearance I Enforced migration-এর অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল।

বাঙালি বিশেষ করে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা ও প্রতিহিংসার শীর্ষ প্রকাশ ঘটেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মধ্য দিয়ে।

শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থ বা রাজনৈতিক অভিসন্ধি নয়, বাঙালির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ২৫ মার্চ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্যতম প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। বাঙালির প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা ও ক্রোধের বিষয়টি Prime perpetrator বিশ্বাসের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল। তাদের শীর্ষ ক্রোধ ছিল বাঙালি জাতিসত্তায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক কর্মী ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ওপর। হত্যা ও গুমের জন্য গেস্টাপো বাহিনীর আদলে ‘আলবদর বাহিনী’ নামক কিলিং স্কোয়াড গঠন করে পাকিস্তান।

গণহত্যা নির্ধারণের মূল বিষয়টি হলো অভিপ্রায় ও পূর্বপরিকল্পনা। এতে চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন পরিকল্পকদের পরিচয় এবং স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন সম্প্রদায়ভিত্তিক বিনাশের পরিকল্পনাটি। এটি কার্যকর করার পদ্ধতি ও বাস্তবায়নের প্রমাণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট তাদের অধিনায়ক লে. কর্নেল তাজের নির্দেশে প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্যকে রাজারবাগে হত্যা করলেও তাকে গণহত্যা হিসেবে প্রমাণ করা যাবে না। পাকিস্তান তাকে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন হিসেবে উপস্থাপন করবে এবং তা চূড়ান্ত বিচারে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে যদি রায় বাংলাদেশের পক্ষে যায়। একই কথা প্রযোজ্য পিলখানায় ইপিআর নিধন, চট্টগ্রামের ইবিআরসিতে প্রায় হাজার সেনা হত্যাকাণ্ড ও কুমিল্লা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ময়নামতিতে ৯০০ সেনা ও ১৭ কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে।  

অন্যদিকে জগন্নাথ হলে যে গণহত্যা সাধিত হয়, তাতে দেখা যায় যে নিহত ৪১ জনের মধ্যে ৪০ জনই হিন্দু। ওই স্থানে ৩২ পাঞ্জাবের অধিনায়ক কর্নেল তাজের আগমন, তার ও তার সঙ্গীদের কার্যকলাপ প্রমাণ করে তাদের জাতিগত ও ধর্মগত বিদ্বেষ ও হিন্দু নির্মূল অভিপ্রায়কে। এমন অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছে Prime perpetrator পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের নানা বয়ানে। এ ক্ষেত্রে তাদের নানা Hate message-গুলো প্রণিধানযোগ্য। তাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করে সেই অভিপ্রায় ও পরিকল্পনা, যা গণহত্যার সমার্থক।             

পাকিস্তান থেকে কারামুক্ত হয়ে দেশের মাটিতে নামার আগেই ৮ জানুয়ারি লন্ডনের মাটিতে বঙ্গবন্ধু বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন, ‘পাকিস্তান জঘন্য খেলায় মাতিয়াছিল। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে যে গণহত্যা হইয়াছে তাহার বিচার হইবে। ’—এনা

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনসংক্রান্ত তদন্ত শুরু হয় তৎকালীন পুলিশের ডিআইজি মঞ্জুরুল ইসলামের নেতৃত্বে। ১০ মে এনা জানায়, ‘দেড় হাজার পাকিস্তানি সামরিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ গঠিত হয়েছে। ’

বঙ্গবন্ধুর অকালপ্রয়াণে দৃশ্যপট বদলে যায়। থেমে যায় জাতীয় স্বার্থ, পরিচয় ও মর্যাদার সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা উদ্যোগ। ১৯৭৫ সালের পরবর্তী ঘটনাবলি তথা বিচারহীনতা বা ন্যায়বিচার প্রতিরোধে ১৯৭৫ সালপরবর্তী সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ ভয়াবহ বর্বরতার নিদর্শন হয়ে আছে। সেই সঙ্গে ১৯৭১ সালের স্মৃতি ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাগুলো শুধু একটি মসিলিপ্ত অধ্যায় হিসেবে থাকেনি, তা কয়েক জেনারেশন বাংলাদেশিকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দিয়েছে।

২৫ মার্চের কৃষ্ণরাতে জমাট হয় যে আকাঙ্ক্ষা, তা স্বাধীনতাসংগ্রামে অসামান্য শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এটাকে সামনে এনে আলোকোজ্জ্বল করতে হবে জাতির আত্মপরিচয় ও মূল্যবোধ নির্মাণের জন্য। কাজটি করতে পারেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই জ্বালাতে পারেন মানবতা ও মানবমর্যাদার আলোক দীপ। এই আলোকই আলোকিত করবে জাতির আত্মপরিচয়।

লেখক : আহ্বায়ক, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস্ ফাইন্ডিং কমিটি


মন্তব্য