kalerkantho


জননিরাপত্তার হুমকি বাড়ছে যেভাবে

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জননিরাপত্তার হুমকি বাড়ছে যেভাবে

১ মার্চ দেশের একটি প্রধান বাংলা দৈনিকের হেডলাইন ছিল, সড়কে হত্যার অধিকার, দেশজুড়ে পরিবহন ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্য। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন হঠাৎ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকাল থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করে।

পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ এবং জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুরের ঘটনা ও তাতে একজন শ্রমিকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ৩৬ ঘণ্টার মাথায় ফেডারেশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়। তাতে আপাতত জনদুর্ভোগের লাঘব হয়েছে, এতটুকুই সান্ত্বনা। এরপর সবাই চুপচাপ হয়ে গেছে। তাতে মনে হতে পারে, সমস্যার বোধ হয় সমাধান হয়ে গেল। আসলে সমস্যা সমাধানের কিছুই হয়নি, বরং ৩৬ ঘণ্টার তাণ্ডব ও প্রাসঙ্গিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যে চিত্র ফুটে উঠেছে সেটিকে রাষ্ট্রের জননিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত বললেও কম বলা হবে।

দুর্ঘটনা বা অ্যাকসিডেন্ট শব্দ সম্পর্কে একটা মিথ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাতে মনে হতে পারে, এর জন্য কেউ দায়ী নয়, সব হচ্ছে দৈব ইশারায়। একবিংশ শতাব্দীতে এ কথা মানতে মানুষ রাজি নয়। যা কিছু ঘটে তার পেছনে অবশ্যই কারণ রয়েছে, আর সে কারণ সৃষ্টি করছে মানুষ।

সেই মানুষকে চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান করা সভ্যতা এবং আইনের কথা। তা না হলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না। মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকে না। একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জোরে যেকোনো ঘটনার কারণ নির্ণয় এবং তার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করা অসম্ভব কাজ নয়। শুধু দরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছা। তারা ধর্মঘট ডেকেছে কার বিরুদ্ধে, কী কারণে? সড়ক দুর্ঘটনার দুটি মামলায় সম্প্রতি আদালত দুজন চালককে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দিয়েছেন। প্রথমটি ২০০৩ সালে সাভারে ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রাকচাপা দিয়ে একজন গৃহবধূকে হত্যার দায়ে ঢাকার একটি আদালত ট্রাকচালক মীর হোসেন মিরুকে ফাঁসির দণ্ড প্রদান করেছেন। দ্বিতীয়টি ২০১১ সালে মানিকগঞ্জে আরেকটি দুর্ঘটনায় দেশের প্রথিতযশা দুজন মানুষ নিহত হন, যার মামলার রায়ে বাসচালক জমির হোসেনকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। তাদের ধর্মঘট আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে এবং দুই চালকের মুক্তির দাবিতে।

সড়ক দুর্ঘটনার ফলে জনমানুষের নিরাপত্তা কত ভয়ংকরভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং তা যে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে সে চিত্রটির ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা একবার দেখে নেওয়া থাক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনস্থ সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) গভীর তাত্পর্যপূর্ণ একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি। কাজটি করার জন্য প্রথমেই ওই সংস্থাকে অভিনন্দন জানাই। এ প্রতিবেদন অনুসারে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয় এবং পরে মৃত্যুবরণ করে এমন মানুষের সংখ্যা গড়ে প্রতিদিন ৬৪। ২০১৬ সালে এর মোট সংখ্যা ২৩ হাজার ১৬৬। এর বাইরে সড়ক দুর্ঘটনায় অন দ্য স্পট মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন বের করেছে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই), যেটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে মার্চ মাসের তিন তারিখে। বুয়েটের প্রতিবেদন অনুসারে ১৯৯৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত, ২৩ বছরে মোট ৮৪ হাজার ৪৩৫টি দুর্ঘটনায় অন দ্য স্পট মৃত্যু হয়েছে ৬৪ হাজার ১১২ জনের। বছরে গড়ে দুই হাজার ৭৮৭ জন, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে আটজন। আহত হয়ে পরে মৃত্যুবরণ ও অন দ্য স্পট মৃত্যুবরণ, দুটি যোগ করলে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে মারা যাচ্ছে ২৫ হাজার ৯০৩ জন, তাতে দৈনিক মারা যাচ্ছে ৭১ জন। বুয়েটের প্রতিবেদনে দেখা যায় ১৯৯৪ সালে, এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় অন দ্য স্পট মৃত্যু হয় এক হাজার ৫৯৭ জনের, আর ২০১৬ সালে এসে তা দাঁড়ায় দুই হাজার ৮৪৭ জনে। অর্থাৎ এ কয়েক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় অন দ্য স্পট বছরে মৃত্যুর হার বেড়েছে গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ।

বিভিন্ন রকমের দুর্ঘটনার কারণে বছরে দুই লাখ ৪১ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত আহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ। নিহত হওয়া এবং পঙ্গুত্ব বরণের সংখ্যাই বলে দিচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা জননিরাপত্তার জন্য কত বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে, যা কমছে না, বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কি কোনো প্রতিকার নেই? রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা দেখে বলতে হয়, তারা এর জন্য বোধ হয় অমোঘ নিয়তির ওপর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে নিজেরা হাত-পা ছেড়ে বসে আছে। বুয়েটের প্রতিবেদন বলছে, গত ২৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কারোরই তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সাজা হয়নি। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য, যা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, সে মতে দেশে মোট ২৯ লাখ খতিয়ানভুক্ত গাড়ি আছে, যার বিপরীতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা ১৯ লাখ। অর্থাৎ বাকি ১০ লাখ গাড়ি চালাচ্ছে ভূতে। এ কারণেই গত ৩ মার্চ একটি বড় দৈনিকের শিরোনাম ছিল, সাড়ে ১৩ লাখ অবৈধ চালকের হাতে যাত্রীর নিরাপত্তা। প্রকাশিত তথ্য মতে, ১০ থেকে ১৩ লাখ অবৈধ চালক গাড়ি চালাচ্ছে। বেসরকারি হিসাব মতে, অবৈধ চালকের সংখ্যা হবে প্রায় ৪৪ লাখ। কারণ ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ নসিমন, করিমন, লেগুনা, টেম্পো ইত্যাদি নামে দেশব্যাপী কত লাখ গাড়ি আছে তার কোনো সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই। ৫ মার্চ একটি ইংরেজি দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মুহম্মদ বিল্লাল নামের একজন চালক সাত বছর গাড়ি চালাচ্ছেন; কিন্তু তাঁর কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। ২০ বার তিনি পুলিশের কাছে ধরা পড়েছেন এবং প্রতিবারই সামান্য জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেয়ে গেছেন। লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় তাঁকে গাড়ি চালানো থেকে বিরত রাখা যায়নি। এত সময়ের বর্ণনায় যে বিপজ্জনক চিত্রটি পাওয়া গেল সেটি বিবেচনায় রেখে সম্প্রতি গাড়িচালকদের ধর্মঘটের ইস্যুটি বিশ্লেষণ করলে সবাই বুঝবেন মানুষের জীবনকে চার আনা মূল্যও তারা দিতে চায় না।

ওপরের তথ্য-উপাত্তে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়, সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে কোনো না কোনো পক্ষের বা ব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলা, গাফিলতি, দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাব এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তি না হওয়ার কারণে। সুতরাং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শূন্যে গদা ঘোরানোর সুযোগ নেই। সব কিছুর ঊর্ধ্বে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, যা রাষ্ট্রের এক নম্বর প্রধান দায়িত্ব। দুর্ঘটনার বহুবিধ কারণ রয়েছে। তাই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে আদালতের কাছে সোপর্দ করা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। ওপরে বর্ণিত চিত্রই বলে দেয়, তা সঠিকভাবে হচ্ছে না। আদালতের কথাই শেষ কথা। বিচারের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকল্পে এবং কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে সাজা না পায় তার জন্য বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যেই সহজাত অনেক স্তর রয়েছে, চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের ব্যবস্থা আছে। তাই আদালতের রায় মানি না—এ কথা বলার অর্থই হলো রাস্তায় মানুষ মারার স্বেচ্ছাধিকার চাওয়া। আর রাষ্ট্র এই খামখেয়ালির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অর্থ হলো, জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলাকে বড় বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া। যেকোনো আইনের সমালোচনা ও তা পরিবর্তনের দাবিও করা যেতে পারে। তারও একটা নিয়ম-কানুন ও প্রচলিত পন্থা আছে। কিন্তু একটা আইন বলবৎ থাকা অবস্থায় এবং সে অনুসারে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে তাণ্ডব করার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এ সুযোগ কাউকে দেওয়া যাবে না। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকা কেন অবৈধ হবে না, এ মর্মে হাইকোর্ট থেকে একটা রুল জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট আদালতকে অভিনন্দন জানাই। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর তার বিরুদ্ধে জামায়াত ও তাদের বড় মিত্র পক্ষ যে তাণ্ডব চালিয়েছিল তখন এ রকম একটা রুল জারি ও তার নিষ্পত্তি হলে আর কেউ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন ধৃষ্টতা দেখাতে পারত না। তবে কথায় আছে, ভালো কাজ একেবারে না হওয়ার চেয়ে দেরিতে হলেও ভালো। তাই ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে রুলটির দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

তিন বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স নিয়ে ২০১১ সালে বাস চালাচ্ছিলেন আলোচিত প্রথম চালক জমির হোসেন। দ্বিতীয় চালক মীর হোসেন মিরুর বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ২০০৩ সালে ট্রাকচাপা দিয়ে সাভারে একজন গৃহবধূকে হত্যা করেছেন, যার জন্য তিনি ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তাই আলোচিত দুই চালককে আদালত কর্তৃক প্রদত্ত শাস্তির বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকা ও তাঁদের মুক্তি দাবি করার পরোক্ষ অর্থ দাঁড়ায়, লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় এবং সব আইন ভঙ্গ করে নিজেদের ইচ্ছামতো গাড়ি চালাবেন, তাতে দুর্ঘটনা ঘটবে, মানুষ মরবে অথবা শত্রুতাবশত রাস্তায় কারো ওপর গাড়ি উঠিয়ে দেবেন; কিন্তু তার জন্য চালকদের আইনের আওতায় আনা যাবে না, আদালত তাঁদের শাস্তি দিতে পারবেন না। রাষ্ট্রের স্বার্থে এর একটা বিহিত হওয়া জরুরি। তা না হলে জননিরাপত্তার হুমকি দিন দিন বাড়বে ছাড়া কমবে না। তাই নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগকে অত্যন্ত কঠোরভাবে এসব উচ্ছৃঙ্খলতা দমন করার জন্য সব করণীয় দ্রুত করতে হবে।

 

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক,

নিউ অরলিনস, ইউএসএ থেকে


মন্তব্য