kalerkantho


মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করতে হবে

ড. হারুন রশীদ

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করতে হবে

‘নিজের জীবন বাজি রেখে চেয়েছিলাম সঙ্গে থাকা আনসার ও পুলিশ সদস্যদের রক্ষা করতে। সে জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১৪ রাউন্ড রাবার গুলিও করেছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। তারা আমাদের এক আনসার সদস্যসহ এক সহযোগীকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। শুনেছি, একজনকে মেরে ফেলেছে তারা। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে, নিজের প্রাণটা গেলেও এত দুঃখ লাগত না। ’ এ কথাগুলো ফেনীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানার।

গত বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ফেনীর ফুলগাজীর ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবারিদের ধারালো অস্ত্রের কোপে আহত হন তিনি। বর্তমানে তিনি ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দীর্ঘদিন ধরে জেলার ফুলগাজীর বদরপুর সীমান্তের খানাবাড়ী এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে মাদকসহ নিষিদ্ধ ড্রাগস ঢুকছিল। এ খবর ছিল প্রশাসনের কাছে।

মাদক কারবারিদের ধরতে রাতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু স্পটে প্রবেশের আগেই ভারতীয় সীমান্তে ওত পেতে থাকা মাদক কারবারিরা ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা এবং তাঁর সঙ্গে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা গুলি ও ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে ১৪ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুড়লেও রক্ষা পাননি এক আনসার ও এক সহযোগী। ফুলগাজীর বদরপুর সীমান্তে মাদক কারবারিদের ধরতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানকালে মাদক কারবারিদের হামলায় নিহত হন আনসার সদস্য নওশের আলী। এ সময় আহত হয়েছে পুলিশ সদস্যসহ আরো ১০ জন।

এ ঘটনা প্রমাণ করছে মাদক কারবারিরা বর্তমানে কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা প্রশাসনকে পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করছে। এমনকি প্রশাসনের লোকদের হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। এ ধরনের পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নয়। মাদক কারবারিদের এই ঔদ্ধত্যের স্পষ্ট জবাব দিতে হবে প্রশাসনকে। মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর থেকে আরো কঠোর হতে হবে। যেকোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এই অপতত্পরতা।

মাদক কারবারিদের এই অপতত্পরতা নতুন নয়। নিষিদ্ধজগতে অস্ত্রের পর মাদকই সবচেয়ে লাভবান ব্যবসা। বিশেষ করে ফেনসিডিল ও ইয়াবা সহজলভ্য ও বহনযোগ্য বলে এর বিস্তার দেশজুড়ে। সত্যি বলতে কি, দেশের এমন কোনো এলাকা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে মাদকের থাবা নেই। দেশজুড়ে এক বিশাল জাল বিস্তার করে আছে এ মরণনেশার ভয়াবহ সিন্ডিকেট। আন্তর্জাতিক অপরাধীচক্র মাফিয়াদের সঙ্গে রয়েছে এদের শক্ত ও গভীর যোগাযোগ।

মাদক চোরাচালানের জন্য রয়েছে বিভিন্ন রুট। বিমানবন্দর থকে শুরু করে স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর, সীমান্ত এলাকায় মাদকের ছড়াছড়ি। এর কিছু ধরাও পড়ে। বাকিটা চলে যায় মাদকসেবী ও কারবারিদের কাছে। এ ছাড়া কারাগারেও রয়েছে মাদকের জমজমাট ব্যবসা। রাজধানীর উপকণ্ঠে সম্প্রতি স্থানান্তরিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে অভিনব কায়দায় মাদক ও বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছে। কারাগার কর্তৃপক্ষ এ ধরনের অপতত্পরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও অনেক সময় চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক ঢোকে কারাগারে। মোবাইল ফোন দিয়ে কারাগারে বসে শীর্ষ পর্যায়ের অপরাধীদের মাদক কারবার ও চাঁদাবাজিসহ অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণের খবরও অজানা নয়।

নিষিদ্ধ বস্তু হওয়ায় মাদক পাচারকারীরা অভিনব সব পন্থা অবলম্বন করে পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য। কারা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সম্প্রতি তাঁর ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর স্ট্যাটাসে তিনি টিফিন ক্যারিয়ারের ভেতর বিশেষ কায়দায় মোবাইল পাচার, জুতার সোল ও শুকনো খাবারের ভেতর গোপনে মাদকপাচার হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া পরিধেয় শার্টের কলার ও হাতায়, প্যান্টের কোমরের অংশে এবং টিফিন বক্সের ভেতরে করে মোবাইল, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ নিষিদ্ধ পণ্য কারা অভ্যন্তরে নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অপতত্পরতা বন্ধে কারা কর্তৃপক্ষকে নজরদারি বাড়াতে হবে। কারাগার হচ্ছে সংশোধনাগার। সেখানে যদি মাদক ঢোকে, তাহলে অবস্থা কী হবে একবার ভাবা যায়!

মাদক পাচারকারীরা আশ্রয় নেয় বিভিন্ন পন্থা ও কৌশলের। মানবশরীরের ভেতর, গোপনাঙ্গে মাদকপাচারের পন্থা পুরনো হয়ে গেছে। এমনকি কফিনের ভেতরে মাদকপাচারের ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সাপুড়েদের সাপ রাখার বাক্স থেকে, বড় মিষ্টি কুমড়ার ভেতর, মিষ্টির বাক্স, দরজার চৌকাঠের ভেতর বাক্স করে ফেনসিডিল বহনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তা ধরা পড়ে।

অ্যাম্বুল্যান্স বা কফিনে করে মাদক বহন করলে অনেক সুবিধা। এতে অনেকের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়। যানজটে পড়লে সাইরেন বাজিয়ে উল্টো পথেও চলে যাওয়া যায়। র‌্যাব-পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশিতেও পড়তে হয় না। কারণ কফিনবাহী একটি অ্যাম্বুল্যান্সকে সাধারণত কেউ সন্দেহের চোখে দেখে না। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় যে মাদক কারবারিরা মাদকপাচারের জন্য অ্যাম্বুল্যান্সের মতো একটি জরুরি ও স্পর্শকাতর পরিবহন ব্যবহার করছে। এতে কোন অ্যাম্বুল্যান্সে সত্যিকারের রোগী বা কফিনের ভেতরে আসলে লাশ না অন্য কিছু আছে, এ নিয়ে সন্দেহ দেখা দেওয়াটা স্বাভাবিক। এ নিয়ে অর্থাৎ পুলিশ ও অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবহারকারী উভয় পক্ষকেই বিড়ম্বনায় পড়তে হবে। আর এ সুযোগই নেয় মাদক কারবারিরা। এ জন্য অবশ্যই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

এটা খুবই আশঙ্কার বিষয় যে বাংলাদেশে দিন দিন মাদকসেবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদক কারবারের ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ; যার সর্বশেষ নজির দেখা গেল ফেনীতে। এ জন্য একজন আনসার সদস্যকেও জীবন দিতে হলো। এই অবস্থায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করতে হবে। মাদকদ্রব্য কোনো অবস্থায়ই যাতে দেশের ত্রিসীমায় ঢুকতে না পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে যেকোনো মূল্যে।

শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। তার বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও অমিত সম্ভাবনা। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের অবক্ষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতা, হতাশা ও মূল্যবোধের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাদক তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তরুণসমাজের প্রতি। বেকারত্বও মাদকের বিস্তারে সহায়ক—এমন কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা। এই মরণনেশার বিস্তারে সমাজে একদিকে যেমন অপরাধ বাড়ছে, তেমনিভাবে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শৃঙ্খলা। এই অবস্থা চলতে থাকলে একটি সমাজের অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে মাদকদ্রব্যের প্রাপ্তি সহজলভ্য যাতে না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে মাদকের অনুপ্রবেশ। দেশেও যাতে মাদকদ্রব্য উৎপাদন হতে না পারে সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে। দুঃখজনক হচ্ছে, মাঝেমধ্যে মাদকের চালান ধরা পড়লেও তাদের মূল কুশীলবরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, সমাজের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে মাদক সিন্ডিকেট যতই শক্তিশালী হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতারও কোনো বিকল্প নেই। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতার উন্মেষ ঘটাতে হবে। যারা এরই মধ্যে মাদকাসক্ত হয়েছে তাদেরও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সুস্থধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বাড়াতে হবে মাদক নিরাময়কেন্দ্রের সংখ্যাও। সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করে যার যার অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করে এই যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে।

 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com


মন্তব্য