kalerkantho


তরুণদের সামনে জাতীয় উন্নতির কোনো লক্ষ্য নেই

আবুল কাসেম ফজলুল হক

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



তরুণদের সামনে জাতীয় উন্নতির কোনো লক্ষ্য নেই

পরীক্ষার ফল যারা সবচেয়ে ভালো করে, তারাই কি সবচেয়ে বেশি শিক্ষা লাভ করে? জ্ঞানী হয়? এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই এখন ‘হ্যাঁ’ না বলে ‘না’ বলবেন। সৃজনশীল পরীক্ষাপদ্ধতির ও ২০১০ সালের শিক্ষানীতির কল্যাণে শিক্ষা ও পরীক্ষা সম্পর্কে শিক্ষিত লোকদের ধারণা এখন আর আগের মতো নেই। সরকার অবশ্য পরীক্ষার এ পদ্ধতিকে খুব ভালো বলে বিরামহীন প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লোকে এর মধ্যে ভালো কিছু খুঁজে পায় না। বাস্তবে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া বিভিন্ন স্কুলের ১০০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে যদি ‘ছাত্রজীবন’ কিংবা ‘খেলাধুলা’ কিংবা ‘সংবাদপত্র’ কিংবা ‘কৃষি ও কৃষক’ বিষয়ে এক ঘণ্টায় অনধিক ৩০০ শব্দের মধ্যে একটি রচনা লিখতে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের মধ্যে সেরা পাঁচজনেও কিছু লিখতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ বর্ণনামূলক কিছু লেখায় তারা অনভ্যস্ত। রচনাটি ইংরেজিতে লিখতে দিলে যারা ইংলিশ ভার্সনে পড়েছে তারাও কিছু লিখতে পারবে না। যারা ‘ও’ লেভেল, ‘এ’ লেভেল পড়ে, তারা ইংরেজিতে লিখতে পারবে। গণিত, বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়েও নির্ভরযোগ্য বিদ্যা লাভের প্রমাণ জিপিএ ৫ পাওয়া কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। পাঠক আমার ধারণাকে কি ভুল বলবেন? বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে একটি, দুটি কিংবা তিনটি গ্রুপে বিভিন্ন স্কুলের ১০০ জন করে ছাত্র-ছাত্রীর পরীক্ষা নিয়ে দেখতে পারেন, তাদের বিদ্যার দৌড় কতখানি। শিক্ষিতসমাজের পরীক্ষার ফলের প্রতি আগের আস্থা যে আর নেই, তা নিশ্চিত।

পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, এবারের বইমেলায় ৬৫ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। কোনো কোনো পত্রিকায় ৬৫ কোটির জায়গায় ৭০ কোটিও বলা হয়েছে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও বড়। আমার প্রশ্ন হলো, মেলায় যেসব বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে সেগুলোই কি মেলার সবচেয়ে ভালো বই! বলা কি যাবে যে, যে লেখক যত বেশি জনপ্রিয় সেই লেখক তত ভালো? বইয়ের জগতে ভালোমন্দ বিচারের সূচক কী? কোনো মা-বাবা, কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকা কি কোনো জনপ্রিয় লেখকের কোনো জনপ্রিয় বই হাতে নিয়ে দেশের ছাত্র-তরুণদের উদ্দেশে বলতে পারবেন—এ বইটি সারা দেশে তোমাদের সবারই পড়া উচিত? আসলে জিপিএ ৫-এর যে দশা, জনপ্রিয় বইয়েরও সেই দশা। বই জনপ্রিয় হলেই ভালো হয় না। ভালো বইয়ের জনপ্রিয় হওয়া উচিত। কখনো কখনো তা হয়। কিন্তু এখন তা হচ্ছে না। এখন অবস্থা আগের মতো নেই। ভালোমন্দ বিচারের ক্ষেত্রে একটা শূন্যতা চলছে।

যে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা চলছে তার মধ্যেও হয়তো বিরল ব্যতিক্রম ঘটছে। এর মধ্যে যারা ভালো শিক্ষা লাভ করছে তারা চরম প্রতিকূলতার মধ্যে প্রধানত মা-বাবার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির ও চেষ্টার কারণে তেমনটি করতে পারছে। পাঠ্যপুস্তকের ও শিক্ষাব্যবস্থায় তাতে কোনো অবদান নেই। আমাদের সাধারণ অবস্থাটা দেখতে হবে। সাধারণ অবস্থা এখন অত্যন্ত খারাপ। সরকার শিক্ষার উন্নতির কথা বলে রাতদিন ঢাকঢোল পেটাচ্ছে। টাকাও খরচ করছে। সরকার যে রকম শিক্ষা চায়, সেই রকম শিক্ষাই এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে। সুশিক্ষা নেই, সরকার সুশিক্ষা চায় না। যে রাজনীতি দেশে চলছে তাতে জনগণের অজ্ঞতা ও কুশিক্ষাই সরকারের ক্ষমতার উৎস। জনগণ সুশিক্ষিত হলে এই নীতি, এই ব্যবস্থা মেনে নেবে না। সুশিক্ষা সরকারের জন্য বিপজ্জনক।

বইয়ের জগতে ব্যবসায়িক দিক দিয়ে যে লেখকরা খুব সফল, তাঁদের বিদ্যাবত্তার ওপর কি আস্থা সৃষ্টি হওয়ার কোনো কারণ আছে? বইকে সর্বাধিকসংখ্যক ক্রেতার কাছে ক্রয়যোগ্য করে তোলাই তাঁদের রাতদিনের সাধনা। ভাবতে বিস্ময় লাগে, জনপ্রিয়তার জন্য কত রকমের কৌশল জনপ্রিয় লেখকরা অবলম্বন করেন। একসময় দেখতাম ‘হলুদ হিমু কালো র‌্যাব’ লেখা ফেস্টুন হাতে নিয়ে জনাপঞ্চাশেক তরুণ কালো-হলুদ কাপড় পরে বইমেলার ভেতরে মৌন মিছিল করে বেড়াত। এটাও দেখা গেছে যে কোনো কোনো লেখক, কোনো কোনো লেখিকা নানা কৌশলে প্রচার করতেন যে ধর্ম বিষয়ে কিংবা নারী বিষয়ে তাঁর বইয়ে এমন কথা আছে, যা নিয়ে মৌলবাদীরা বিতর্ক সৃষ্টি করে সংঘাত বাধাতে পারে। তাঁরা কোনো কোনো বইয়ের দোকানে পুলিশ ডেকে আনতেন। বিক্রি বাড়ানোর কৌশল এসব। এখন দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো মন্ত্রী, কোনো কোনো নেতা তাঁদের দলের শতাধিক লোক সঙ্গে নিয়ে মেলায় আসেন এবং তাঁদের বইয়ের বিক্রি বাড়ানোর আয়োজন করেন। বইয়ের বিক্রি বাড়ানোর জন্য ফেসবুকেও কৌশলমূলক প্রচার চালানো হয়। এসবই বিজ্ঞাপনের নানা ধরন। তাঁরা সরলভাবে কোনো তথ্যই প্রকাশ করেন না। ১০০ বছর আগে প্রমথ চৌধুরী বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে লিখেছিলেন :

“অতিবিজ্ঞাপিত জিনিসের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অতি কম। কারণ মানবহৃদয়ের স্বাভাবিক দুর্বলতার ওপর বিজ্ঞাপনের বল এবং মানবমনের সরল বিশ্বাসের ওপর বিজ্ঞাপনের ছল প্রতিষ্ঠিত। যখন আমাদের একমাথা চুল থাকে তখন আমরা কেশবর্ধক তেলের বড় একটা সন্ধান রাখিনে। কিন্তু মাথায় যখন টাক চকচক করে ওঠে তখনই আমরা কুন্তলবৃষের শরণ গ্রহণ করে নিজেদের অবিমৃষ্যকারিতার পরিচয় পাই এবং দিই। কারণ তাতে টাকের প্রসার ক্রমেই বৃদ্ধি পায় এবং সেই সঙ্গে টাকাও নষ্ট হয়। বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য আমাদের মন ও নয়ন আকর্ষণ করা। বিজ্ঞাপন প্রতি ছত্রের শেষে প্রশ্ন করে, ‘মনোযোগ করেছেন তো?’ রাজপথের উভয় পার্শ্বের প্রাচীর মিথ্যা কথা তারস্বরে চিৎকার করে বলে। ”

এ লেখা ১৯১২ সালের। এর মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। এখন ইন্টারনেটের যুগে মিথ্যার ও মিথ্যা প্রচারের শক্তি অনেক বেড়েছে। উৎপাদন ও বৈষয়িক সম্পদ যত বাড়ছে মানুষের নৈতিক পতনও তত বেশি হচ্ছে। আমরা কথা বলছিলাম বইমেলা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। দুটির বেলায়ই দরকার প্রচারে আত্মহারা না হয়ে বিশ্লেষণমূলক ও বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভালোমন্দ বিচার করা এবং অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।

অবস্থা যেমন দেখা যাচ্ছে তাতে জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা খুঁজে পাওয়া যায় না। লোকের ধারণা এই যে পরিবর্তন হলে অবস্থা সামনে আরো খারাপ হবে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রিয়াকলাপে জনগণ আশা করার কিছু পায় না। অন্যায়-অবিচার ও জুলুম-জবরদস্তি ক্রমাগত বাড়ছে। ছাত্র-তরুণরা লক্ষ্যহীনভাবে চলছে। তাদের সামনে জাতীয় উন্নতির কোনো লক্ষ্য নেই। মেধাবী, উদ্যোগী, পরিশ্রমী ছেলে-মেয়েরা বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণে উদগ্রীব। তারা জন্মগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হলেও পছন্দগতভাবে অন্য দেশের নাগরিক—বাংলাদেশ পরিচালনায় ও জাতীয় নীতি নির্ধারণে তারাই নীতিনির্ধারকের ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চলে গেছে। পাশাপাশি আছে ভারত। বাংলাদেশকে রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার ও শক্তিশালী করার কোনো প্রচেষ্টা নেই। রাজনীতি হয়ে আছে বৃহৎ শক্তিবর্গের দূতাবাস অভিমুখী। একদিকে চালানো হচ্ছে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষা করার আয়োজন, আর অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে বিকাশমান বাংলা ভাষাকে বিলীয়মান ভাষায় পরিণত করে ইংরেজি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার আয়োজন। বিলীয়মান ভাষাকে যে রক্ষা করা যায় না—এটা কেউ বুঝতে চায় না। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বাংলা ভাষা অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু সেই অগ্রগতির ধারা এখন আর নেই। পাকিস্তান আমলে বাংলা উন্নয়ন বোর্ড উচ্চপর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে ও অনুবাদকর্মে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিল।

বাংলাদেশ আমলে বাংলা উন্নয়ন বোর্ডকে বাংলা একাডেমিতে বিলীন করে দেওয়া হয়। বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করার পর বাংলা একাডেমি আর সেই ধারায় এগোচ্ছে না। অবিলম্বে বাংলা উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা দরকার। ইংলিশ ভার্সনকে সফল করার জন্য সরকার চেষ্টা চালাচ্ছে। মাদরাসাপন্থীদের সঙ্গে আপসে গিয়ে সরকার তাদের সব রকম সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। বিসিএস পরীক্ষার জন্য আগামী পরীক্ষা থেকে ইংরেজি মাধ্যমও চালু করা হয়েছে। দ্বৈত নাগরিকদের কর্তৃত্ব বাড়ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ কী? চলমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন কি এমন কোনো ব্যাপার যে তাতে জাতিরাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়ে যাবে? আমার মনে হয়, বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রকৃতি হবে ফেডারেল এবং তাতে জাতিরাষ্ট্র, জাতি, জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় ভাষা বিলুপ্ত হবে না—বিকাশমান থাকবে। বিশ্ব সরকারের কাছে আন্তর্জাতিক কিছু বিষয়ের ক্ষমতা থাকবে মাত্র। এই অবস্থায় আমরা আমাদের রাষ্ট্র হারিয়ে কী অবস্থা লাভ করব? আমাদের প্রতি লোভের হাত প্রসারিত করে আছে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে ভারত। আমরা কোনটার দিকে যাব, নাকি আমরা স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সত্তা নিয়ে চলব?

এসবই গুরুতর বিবেচ্য প্রশ্ন। কিন্তু এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা নেই। বইমেলার একটা চাপ দেশের শাসক শ্রেণির ওপর আছে। তা হলো বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে রক্ষা করে উন্নত করতে হবে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে রক্ষা করারও চাপ আছে। বইমেলার এই চাপটুকু না থাকলে এত দিনে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ ক্ষয়ের দিকে অনেক দূর এগিয়ে যেত।

শাসক শ্রেণি যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করতে সচেষ্ট হবে, তা মনে করার কারণ দেখি না। জনগণের অজ্ঞতাই শাসক শ্রেণির ক্ষমতার উৎস। এই অবস্থায় রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে ভালো কিছু আশা করা যায় না। রাজনীতির মান উন্নত হলেই শুধু শাসক শ্রেণি শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করার কথা ভাববে। আপাতত সে আশার গুড়ে বালি।

আমাদের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কাজে দেশের লেখকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সভ্যতার ধারায় বড় রকমের পরিবর্তন সাধনে পৃথিবীর সব জাতির মধ্যেই প্রগতিশীল লেখকরা অগ্রযাত্রীর ভূমিকা পালন করেন। আমাদের দেশে কবি-সাহিত্যিকরা সরকার উত্খাতের ও ক্ষমতা দখলের আন্দোলনে সব সময় সংঘবদ্ধ হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ রকম ভূমিকার কথা আমি বলছি না। আমি বলতে চাইছি, লেখার মাধ্যমে সৃষ্টিশীল, প্রগতিশীল লেখকের ভূমিকায় থেকে জাতিকে ভেতর থেকে উন্নততর চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা দিয়ে জাগিয়ে তোলার কথা। প্রগতিশীল লেখকরা জাতির পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। বাংলাদেশে আজ এমন এক অবস্থা হয়ে আছে যে এখানে কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি, কেউ মুক্তিযোদ্ধা, কেউ রাজাকার। এই অবস্থায় মানুষের বড় অভাব। এই অভাব দূর করার কাজে অন্তত কিছু লেখক স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে মানবতার পতাকা হাতে এগিয়ে চলতে পারেন। কাজটা কঠিন, অসম্ভব নয়।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য