kalerkantho


বহে কাল নিরবধি

থেরেসা মের ওয়াশিংটনে সতর্ক পদার্পণ

এম আবদুল হাফিজ

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



থেরেসা মের ওয়াশিংটনে সতর্ক পদার্পণ

বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সিম্বলিজম’-এর (Symbolism) গুরুত্ব অনেক। এই সত্যকে মাথায় রেখেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের হোয়াইট হাউসে সম্প্রতি সতর্ক পদার্পণ।

তিনিই প্রথম বিশ্বনেতা, যিনি বিতর্কিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সাক্ষাতে মিলিত হলেন। তাঁর এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর লন্ডন ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার অব্যাহত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে একটি পরিষ্কার বার্তা বিশ্বব্যাপী নতুন করে পৌঁছে দিল। এতে এও স্পষ্ট হলো যে কখনো কখনো ব্রিটিশ কূটনীতিকে দোষারোপ করা হলেও তা কিন্তু নীরবে হলেও সঠিকভাবেই অগ্রসর হয়েছে এবং সে জন্য কারো বা কোনো মহলের দূতিয়ালি ছিল নিষ্প্রয়োজন।

সংকল্পবদ্ধ থাকলে থেরেসা মে যে অসাধ্য সাধনে সক্ষম, ব্রিটিশ সরকারের অন্দর মহলের লোকেরা তা ভালোভাবে জানে। ইউরোপে ‘ব্রেক্সিট’সহ ব্রিটেনের মোকাবেলায় তাঁর অবস্থান ও তাঁর কৌশলী পদক্ষেপকে সেখানে সমীহ করা হয়। আর লন্ডন-ওয়াশিংটন সম্পর্ক তো পারিবারিক সম্পর্ক এবং তার ঐতিহ্যের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।

সেখানেই থেরেসা মের বাড়তি সুবিধা এবং সে সুবিধাকে তিনি পুরোপুরি ব্রিটেনের অনুকূলে কাজেও লাগাতে পারেন।

তবু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত সুসম্পর্কে চিড় ধরতে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই—তা সেখানকার ক্ষমতার দুর্গ ক্লিনটন-ওবামারা দখলে নিয়ে থাকুন বা বুশ-ট্রাম্পদের কর্তৃত্বেই থাকুক। কোনো কারণে যুক্তরাজ্যের পেছন থেকে যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্হিত হলে তা হবে ব্রিটেনের চরম দুর্ভাগ্য।

পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহযোগিতা উভয়ের উত্তরোত্তর সামনে এগোনোর পাথেয়। একাধিক সংকটে এই সত্য উভয়ের সম্মুখে উঠে এসেছে।

ব্রিটেনের হাতে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ সন্তোষজনক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে ব্রিটেন এই অস্ত্রগুলো সেখান থেকেই পেয়েছে; যদিও ওয়াশিংটন কদাচিত এ স্পর্শকাতর অস্ত্রগুলো অন্য কোনো দেশকে দেয় বা অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে। শুধু ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধু দেশের সঙ্গেই ওয়াশিংটনের এসব স্ট্র্যাটেজিক অস্ত্রের লেনদেন হয়। ব্রিটেনের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে একীভূত। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে ব্রিটেনের নৈপুণ্য ও নির্ভরযোগ্যতায় আস্থাবান।

প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ কূটনীতিক ও সেনা সদস্যরা যা-ই করছে তার সব কিছুই আটলান্টিকের ওপারে তাদের খুড়তুতো ভাইদের সঙ্গে মিলেমিশেই করছে। ব্রিটেনের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের আকার ও পরিমাণ অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের আকার ও পরিমাণের চেয়ে বেশি। এখন তো উভয়ের মধ্যে আবার Special Trade deal সক্রিয় রয়েছে। এসব কিছুর পরিণামে মের ওয়াশিংটন সফর ১০০ ভাগ সার্থক এবং এতে অভিনবত্ব কিছুই নেই।

১৯৪১ সাল থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টদের দৃষ্টির অন্তরালে থেকেই প্রভাবান্বিত করার চেষ্টা করেছেন। সেটাও কালেভদ্রে যখন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের আচরণ ও বক্তব্য পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল্যবোধ ও ভিত্তিমূলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে। তাঁরা আবার সাহায্যেরও হাত বাড়িয়েছেন যখনই তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। উইনস্টন চার্চিল ফ্রাংকলিন রুজভেল্টের কাছে নতি স্বীকার করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধোত্তর ইউরোপের বিভক্তি মেনে নিয়ে। আবার ইদানীংকালের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার জর্জ বুশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাদ্দাম হোসেনের অপসারণে ইরাক যুদ্ধে একটি মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি সম্ভবত পঞ্চাশের দশকে সুয়েজকে ঘিরে অ্যান্থনি ইডেনের ভাগ্য বিপর্যয় এড়াতে চেয়েছিলেন। তাঁদের অবচেতনে সম্ভবত কাজ করেছিল সুয়েজ সংকটের দৃশ্যপট, যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার একজন পরিত্যক্ত ও অপমানিত অ্যান্থনি ইডেনের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াননি।

তবে পার্ল হারবারের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চিন্তা একই সমান্তরালে থেকেছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনে থেরেসা মে অবশ্যই নতুন এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন, যা তাঁর আগের প্রধানমন্ত্রীদের দেখতে হয়নি। থেরেসা মেকে এমন এক হোয়াইট হাউস—যার গোটা ওয়ার্ল্ড ভিউ আলাদা—তা মোকাবেলা করতে হতে পারে। মৌলিক ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অমিল এখনো ধরা পড়ে না থাকলেও সত্বরই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তা দেখবেন। প্রেসিডেন্টের কিছু বিতর্কিত নীতি, আচরণ ও বক্তব্য এখনো যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনে যাঁরা থাকবেন তাঁদেরও চূড়ান্ত এখনো হয়নি। ফলে অতিথি-অভ্যাগতরা এখনো হয়তো দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুর ওপর এক্ষুনি ট্রাম্প প্রেসিডেন্সির চূড়ান্ত নীতির রূপরেখা অবহিত হতে পারছেন না। যখন তা পারবেন তখন বোঝা যাবে লন্ডন-ওয়াশিংটন সম্পর্কের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের সম্ভাবনা।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দহরম-মহরম ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে তা প্রত্যক্ষ করতে আরো কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক :  সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস


মন্তব্য