kalerkantho


ক্ষমতালোভী ট্রাম্পের মুসলিম ও ইহুদিবিদ্বেষ

ব্যাডলি বারসটন

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ক্ষমতালোভী ট্রাম্পের মুসলিম ও ইহুদিবিদ্বেষ

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আপনারা চেনেন। তিনি বড় মুখ করে বলে থাকেন, সোজাসাপ্টা কথা বলতে পারা ও দ্রুত অ্যাকশনে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।

তার পরও কিছু কথা ট্রাম্প লুকাচ্ছেন। কারণ তিনি কথাগুলো আমাদের বলতে পারছেন না। আমি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক ও আয়কর ফাঁকির কথা বলছি না। এগুলো তো চাউর হয়ে যাওয়া জিনিস।  

মুসলমানরা অপরাধ করলেই হলো; ট্রাম্প তড়িঘড়ি মুখ খোলেন, কান ঝালপালা করে দেন। বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান হলে ট্রাম্প উঠেপড়ে লাগেন; ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার মাইল দূরে হয়েছে তো হোক। যখনই এমন কিছু ঘটুক, নিন্দা করতেই হবে। ঘটনা যদি আদৌ না-ও ঘটে থাকে তার পরও ট্রাম্পকে নিন্দা করতে হবে। চলতি সপ্তাহেও তিনি রক্ষণশীলদের সিপিএসি সম্মেলনে বলেন, ‘ওখানকার মানুষ ঠিকই আমাকে বুঝতে পারছে।

সুইডেনে কী ঘটছে দেখুন। জার্মানিতে কী ঘটছে দেখুন। খেয়াল করুন ফ্রান্সে কী হয়েছে। নিসে, প্যারিসে কী হয়েছে। ’

আর ইহুদি, মুসলমান কিংবা অশ্বেতাঙ্গ, ননসিটিজেন ভিসাধারীরা ঘৃণাজাত অপরাধের শিকার হলে? ট্রাম্পই আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন কী করতে হবে। মূক ও বধির হয়ে থাকো; যদি না কেউ তোমাকে বাধ্য করে মুখ খুলতে। সোজাসাপ্টা মুখ চালানোর মানুষটিকে এ ক্ষেত্রে যেন চেনাই যায় না।

ট্রাম্প এ ক্ষেত্রে নিশ্চুপ। কারণ তিনি হেইট ক্রাইম তথা ঘৃণাজাত অপরাধকে ঘৃণাজাত অপরাধ বলে ঘোষণা দেওয়ার হিম্মত রাখেন না। বিশেষ করে অপরাধী শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান হলে তো কথাই নেই। কেন ট্রাম্প তা করবেন না? কারণ হেইট ক্রাইম বলে ঘোষণা দেওয়ার অর্থই হচ্ছে তা ‘সিভিল রাইটস’ লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।   অতএব, এ পথে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাত-পা বাঁধা।

আসলে ট্রাম্পের বহু রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো হারানোর হিম্মত তিনি রাখেন না। চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ থেকে অর্থবহ সাফল্য তিনি আনতে পারবেন না। এ পথে গেলে তাঁর জনপ্রিয়তায় ধস নামবে। শক্তিকেন্দ্র কেঁপে উঠবে।

বিভিন্ন জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ ভোটারদের মধ্যে মাত্র ২৭ শতাংশ ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছে। ২৮ শতাংশ দিয়েছে হিলারি ক্লিনটনকে এবং ৪৪ শতাংশ আদৌ ভোটই দেয়নি। এ তো গেল পপুলার ভোট। ইলেকটোরাল কলেজে জয়ের জন্য ট্রাম্পের সব কটি শ্বেতাঙ্গ ভোটের প্রয়োজন ছিল।

গণমাধ্যমে ফলাও করে আসেনি এমন একটি উদ্যোগের কথা আমরা শুনছি। আর তা হচ্ছে প্রশাসন মার্কিন সরকারের একটি কর্মসূচি সংশোধন করতে এবং নতুন নাম দিতে যাচ্ছে। পরিকল্পনাটি নেওয়া হয়েছিল শ্বেতাঙ্গদের সুপ্রিমেসিসহ সহিংস সব আদর্শ নিয়ন্ত্রণ করতে। এই সংশোধনী সত্যি আনা হলে ইন্টার-এজেন্সি টাস্কফোর্স শ্বেতাঙ্গদের বাদ দিয়ে শুধু ইসলামী সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাবে।

মার্কিন প্রশাসনে একটি বিশেষ প্রতিনিধি পদ রয়েছে, যা সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল ইহুদিবিদ্বেষজাত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। শোনা যাচ্ছে, এই পদও তুলে দেওয়া হবে। অজুহাত হিসেবে বলা হচ্ছে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে অন্যান্য উদ্যোগে কাটছাঁট করার কথা। আর এমন এক সময় এ ধরনের খবর আসছে যখন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিবিরোধী সহিংসতা বেড়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এই যে অ্যান্টি-সেমিটিজম বেড়ে যাচ্ছে এ নিয়ে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে ধরেছিলেন সাংবাদিকরা। ট্রাম্প সোজা অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেন, কোথায় যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিবিদ্বেষ বাড়ছে? সব বাজে কথা, আমার শত্রুদের অপবাদ।

মুসলমান বা ইহুদি তথা ধর্মীয় পরিচয় নয়, ভৌগোলিক সূত্র ধরেও হামলার লক্ষ্য করা হচ্ছে এবং ট্রাম্প তা দেখেও দেখছেন না। কানসাসে ভারত থেকে আসা একজন বিমান প্রকৌশলীকে হত্যা করা হলে নিন্দা জানানোর ক্ষেত্রে নিরুৎসাহ ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এ হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন ৫১ বছর বয়সী একজন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি, যে গুলি করার আগে চিৎকার করে বলেছিল, ‘তুমি টেররিস্ট, আমাদের দেশ থেকে বের হয়ে যাও। ’ সে গুলি চালিয়ে আরো একজন ভারতীয়কে আহত করে।

একজন ভারতীয়র খুন হওয়ার ঘটনাটি ট্রাম্পকে আলোড়িত করেনি। তিনি তখন ব্যস্ত রক্ষণশীলদের সঙ্গে সম্মেলন করা নিয়ে। ঘটনার নিন্দা জানানোর বদলে ট্রাম্প সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা ইসলামী চরমপন্থী সন্ত্রাসীদের যুক্তরাষ্ট্রছাড়া করবই করব। ’ ট্রাম্প যখন এই বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তদন্তকারীরা ব্যস্ত টাম্পা ফ্লোরিডায় একটি মসজিদ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা তদন্তে। মুসলমান কর্মকর্তারা বলছেন, হেইট ক্রাইম অর্থাৎ জাতিগত ঘৃণা থেকেই মুসলমানদের উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

আর এর সবই যে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সঙ্গে হুবহু মিলে যায় তা সেদিন ধরা পড়েছে হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি সিন স্পাইসারের কথায়। মসজিদে হামলার সূত্র ধরে সাংবাদিকরা তাঁকে বলেছিলেন, ট্রাম্প ক্যাম্পেইনের প্রভাবে অ্যান্টি-মুসলিম হেইট গ্রুপের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে তিন গুণ বেড়ে গেছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে। স্পাইসার জবাবে বলেন, কেউ যুক্তরাষ্ট্রে এসে আমাদের দেশ বা মানুষের ক্ষতি করবে, পাল্টা আঘাত তো আসবেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প কি এজাতীয় হামলা থেকে নন-হোয়াইট, নন-ক্রিশ্চিয়ান আমেরিকানদের রক্ষা করবেন না? উত্তর হচ্ছে, ‘সম্ভবত না’। ট্রাম্প কিছুতেই তাঁর ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে আঁচড় লাগতে দেবেন না। তাদের সমর্থন ক্ষমতায় আসার জন্য  প্রয়োজন ছিল, ক্ষমতায় থাকার জন্যও প্রয়োজন।

লেখক : ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত মার্কিন সাংবাদিক, হারেত্জ ডটকমের কলামিস্ট ও সিনিয়র এডিটর


মন্তব্য