kalerkantho


এপার-ওপার

১১ মার্চ ভোটের ফলের টেনশন

অমিত বসু

৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



উত্তম-সুচিত্রার ‘হারানো সুর’ ছবিটি ভোলার সাধ্য কার। ৬০ বছরের পুরনো ছবি পর্দায় পড়লেই নতুন। গীতা দত্তের গান, ‘একবার শুধু কানে কানে বলো তুমি যে আমার’ শুনলে মন আকুল হবেই। ছবির শেষ দৃশ্যটি কল্পনাতীত। ভুলে যাওয়া সুচিত্রাকে মনে পড়েছে উত্তমের। দিশাহীনভাবে ছুটে যাচ্ছে তার কাছে। মুখে সুচিত্রার নাম ধরে ডাক, ‘রমা রমা’। উত্তম বারবার ডেকেও পারলেন না। পরিচালক অজয় কর বললেন, তোমার ডাকে বেদনার মাধুর্য ফুটছে না। হেমন্তকে দিয়ে সেই ডাক দেওয়ালেন। হেমন্তের গলায় রমা রমা স্বর, পরিবেশটাই পাল্টে দিল।

লিপ দিলেন উত্তম। দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন সুচিত্রার দিকে। সুচিত্রা বিলম্ব না করে ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন উত্তমের বুকে। অজয় কর, শট ওকে করে শুটিং প্যাকআপ করতে বললেন। তৈরি হয়ে গেল উত্তম-সুচিত্রার অবিস্মরণীয় ছবি। শেষটুকু আটকে ছিল কণ্ঠস্বরের জন্য। তাও মিলল। দর্শক দেখতে দেখতে চোখের জলে ভাসল। এখনো ভাসে। প্রেম পূর্ণতা পায়।

কণ্ঠস্বর জুতসই না হলে রোমান্টিক সংলাপেও মন ভেজে না। রাজনীতিকরা কথাটা মনে রাখলে ভালো। নির্বাচনী প্রচারে যেভাবে তাঁরা চিৎকার-চেঁচামেচি করেন, তাতে একমাত্র সত্যজিৎ রায়ের বাবা, সুকুমার রায়ের কবিতার পেঁচা ছাড়া কেউ সহ্য করবে না। পেঁচাই বলবে, ‘পেঁচা কহে পেঁচানি, থামা তোর চেঁচানি। ’ এই একটা কথায়ই পেঁচা-পেঁচানির প্রেম মূর্ত হয়ে উঠেছে। রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো। যেমন ভাষা, তেমন স্বর। শব্দদূষণ ভয়ংকর। বিপদ বেশি বিষয় নির্বাচনে। রাজনৈতিক প্রচারে ব্যক্তি নয়, ইস্যুটাই বড়। প্রতিপক্ষের ভুলটাই তুলে ধরা নিয়ম। তা না করে যদি ব্যক্তির গায়ে কাদা মাখানো হয় তাহলে? কদর্য ভাষায় চরিত্র হননের চেষ্টা হলে তখন?

পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন। উত্তাপ সবচেয়ে বেশি উত্তর প্রদেশে। রাজ্যটায় সব রকম লোকের বাস। চোর, ডাকাত, খুনি, মাফিয়া কেউ বাদ নেই। আবার কবি-সাহিত্যিকের অভাব হয় না। ভারতের বেশির ভাগ প্রধানমন্ত্রী এই রাজ্যের। প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে মানুষ করেছিলেন এ রাজ্যেই। অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার জায়গা এটাই। তাঁর বাবা হরিবংশ রাই বচ্চন এখানেই ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। সংসার চালাতেন সামান্য টাকায়, গরমে যাঁর একটা ফ্যান পর্যন্ত ছিল না। অমিতাভ পড়াশোনার পাট চুকিয়ে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন চাকরির জন্য। সেই প্রত্যাখ্যান আর যন্ত্রণার দিনগুলো এখনো তিনি ভোলেননি।

সমাজবাদী পার্টির সাবেক নেতা অমর সিং নির্বাচনী প্রচারে শেষমেশ টার্গেট করে বললেন সেই অমিতাভকেই। ছিঁড়ে খেলেন তাঁর স্ত্রী জয়া আর পরিবারকে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ১৫ বছর ধরে অমিতাভ মা-বাবা তেজি বচ্চন আর হরিবংশের সঙ্গে জঘন্যতম ব্যবহার করেছেন জয়া। বাধ্য হয়ে মা-বাবাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান অমিতাভ। তাঁদের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী পরিবারের সম্পর্ক ছিল খুব ভালো।

এখনো অমিতাভ থাকেন ‘প্রতীক্ষা’য়। জয়া থাকেন ‘জলসা’ বাংলোয়। অভিষেক আর ঐশ্বরিয়ার বাস অন্য একটি বাংলোয়। ঐশ্বরিয়ার সঙ্গেও মানাতে পারেননি জয়া। রেখার সঙ্গে অমিতাভের অঘোষিত প্রেম নিয়ে অশান্তি ঘুরপাক খেয়েছে সংসারে। অমিতাভের রাষ্ট্রপতি হওয়ার খুব ইচ্ছে বলে জানিয়েছেন অমর সিং। এসব কথা বলার অর্থ একটাই—সমাজবাদী পার্টির বর্তমান নেতৃত্বকে খাটো করা। বচ্চন পরিবার শাসকদলের ঘনিষ্ঠ। জয়া এখনো সমাজবাদী পার্টির এমপি। তার জোরে তিনি অনেকটাই রাজনৈতিক ক্ষমতা উপভোগ করতে পারেন। একসময় দলে যথেষ্ট দাপট ছিল অমর সিংয়ের। এখন ক্ষমতা হারিয়ে একেবারেই অসহায়। মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব তাঁকে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলেছেন। ব্যক্তি আক্রমণে অমর নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চাইছেন। কাজটা নীতিবিরুদ্ধ।

অমিতাভ বচ্চন সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন বন্ধু রাজীব গান্ধীর অনুরোধে। এলাহাবাদ থেকে লোকসভার কংগ্রেস প্রার্থী হয়েছিলেন। জিতে সংসদেও গেছেন। ব্যস, ওই একবারই। তিনি জানিয়েছিলেন, মানুষের জন্য কিছু করতে পারছেন না। তাই রাজনীতি ছাড়তে চান। রাজনীতি ছেড়েও ছিলেন। তার পর থেকে রাজনীতিতে আর নয়। জয়া সমাজবাদীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে রাজনীতিতে রয়েছেন। সংসদে সোনিয়া গান্ধীর মুখোমুখি হলে মুখ ফিরিয়ে নেন। কথা বলেন না।

এসব অত্যন্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। অমর সিং যা করলেন তাতে তাঁর রুচি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। রাজনীতি করতে হলে সংস্কৃতি বাদ দিতে হবে কেন।

কংগ্রেস নেত্রী শীলা দীক্ষিত বারবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দু কেজরিওয়ালের উত্থান না হলে তিনি হয়তো আরো কিছুদিন রাজত্ব করতে পারতেন। দিল্লি ছেড়ে আপাতত তিনি উত্তর প্রদেশে। কংগ্রেস তাঁকে সামনে রেখেই নির্বাচন লড়েছে। তাঁর মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো এমন কথা, যাতে বিরোধীরা সুবিধা পেয়ে গেল। শীলা সাংবাদিক বৈঠক ডেকে জানিয়ে দিলেন, দয়া করে মনে রাখবেন, রাহুল এখনো পরিণত হয়ে ওঠেননি। বয়স তাঁকে পরিপক্ব হতে দেয়নি। রাহুল এখনো কাঁচা। ব্যস, কথাটা লুফে নিল বিজেপি। দলের নেত্রী যদি রাহুলকে অপরিণত মনে করেন, বিরোধীরাই বা সেটা মানবেন না কেন। প্রকাশ্যে রাহুলের সমালোচনা করাটা কি শীলার উচিত ছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি রাহুলকে পছন্দ নাও করতে পারেন। তাই বলে প্রকাশ্যে সেটা জানাবেন?

প্রতিপক্ষের ভুলে বিজেপির রাজনৈতিক জমি অনেকটাই শক্ত। মহারাষ্ট্রে পৌর নির্বাচন আর ওড়িশায় গ্রামীণ ভোটে বিজেপির বিশাল জয় তাদের মনোবল আরো বাড়িয়েছে। পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনের ঠিক আগে এই জয়ের বাইরে বিজেপি উজ্জীবিত। অন্য দলও ছেড়ে কথা বলছে না। তারা জানিয়েছে, রাজনৈতিক ছবিটা সব রাজ্যে এক নয়। মহারাষ্ট্র, ওড়িশায় বিজেপি জিতল বলেই বাকি পাঁচটি রাজ্যেও জয়ের নিশান ওড়াবে, তার কোনো মানে নেই। রাজনৈতিক দলের কথা শুনে লাভ নেই। মানুষ কী বলছে সেটাই শোনার। ১১ মার্চ মানুষের রায় শোনা যাবে। ইভিএম থেকে ছিটকে বেরোবে জনমত। আপাতত মুখে যে যা-ই বলুক, টেনশনে সব দল।

 

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক

 


মন্তব্য