kalerkantho


সাদাকালো

ওষুধশিল্পে নৈরাজ্য : বিপন্ন জনস্বাস্থ্য

আহমদ রফিক

৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ওষুধশিল্পে নৈরাজ্য : বিপন্ন জনস্বাস্থ্য

এখন সব কিছুই পণ্য, সব কিছুই পুঁজি ও মুনাফাবাজির সহায়ক উপাদান। পুঁজিতে মুক্তি।

মুনাফাবাজিতে শক্তি। কবির ভাষায় বলতে হয়, ‘বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে’। ছোট-বড় সবাই যে যার মতো মুনাফাবাজিতে ব্যস্ত। বাদ যাচ্ছে না শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাত, বিশেষ করে ওষুধশিল্প। শেষোক্ত বিষয়টি বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত ফলের চেয়েও মারাত্মক, সব সময় এর তাত্ক্ষণিক প্রকাশ না ঘটলেও।

বাংলাদেশের ওষুধশিল্প খাত সত্যিই বিপজ্জনক পথ ধরে চলেছে। এ বিষয়ে একজন নিবেদিতপ্রাণ ফার্মাসি-বিজ্ঞানী এই নৈরাজ্যের নানা দিক নিয়ে নিয়মিত নিবন্ধ লিখে চলেছেন দৈনিকের পাতায়। জানি না তা পাঠকমনে কতটা সচেতনতা তৈরি করছে, যে সচেতনতা দরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও। ওষুধশিল্প খাতে জীবিকার গোটা সময়টা ব্যয় করে আমার ভালোমন্দ অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও পূর্বোক্ত অধ্যাপকের লেখার কারণে এ বিষয়ে কলম ধরিনি।

কিন্তু দিনে দিনে এ খাতের অবস্থা ক্রমে বিপজ্জনক হয়ে ওঠার কারণে ও সংবাদপত্রে তার প্রকাশ লক্ষ করে কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করছি। সত্যি বলতে কি, ওষুধশিল্প খাত অনেক দিন থেকেই প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন; বলা চলে যদিও রয়েছে এর নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তর। অধ্যাপক মুনীরউদ্দিন আহমদের নানামাত্রিক লেখাগুলো তাদের চেতনায় প্রভাব ফেলেছে বলে তো মনে হয় না।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কিছু সময় পর সরকার ওষুধ নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তর তৈরি করে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিল। শুরুতে আমার এক মেধাবী সহপাঠী ওষুধ নিয়ন্ত্রক পদে যোগ দিয়ে ওষুধ উৎপাদন খাতকে নীতিনিষ্ঠ করে তোলার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এর কিছুটা সুফলও দেখা গিয়েছিল, বিশেষ করে স্বাধীনতা-উত্তরকালে ব্যাপকহারে নতুন নতুন ওষুধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ঢালাওভাবে বাজারে আসার কারণে। সেখানে ছিল দলীয় প্রভাব, ওষুধ চিকিৎসার ক্ষেত্রে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য, কখনো তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকও হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য নিয়ে মাথাব্যথা সব সময় রাজনীতিকদের মধ্যে দেখা যায় না। দেখা গেলে লিচু বা আম থেকে পেঁপে বা কলায় রাসায়নিক ব্যবহারের বিপজ্জনক ফলাফল নিয়ে শুরু থেকেই ব্যবস্থা গ্রহণের আগ্রহ দেখা যেত। শুধু ফলই নয়, ভোগ্য বহু জিনিসে দেদার বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথার কারণ হতো না। তবু শেষ পর্যন্ত কিছু ফলের ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাতে সমস্যা কিছুটা কমেছে, কিন্তু পুরোপুরি দূর হয়নি।

দুই.

আমাদের আলোচ্য বিষয় অবশ্য ওষুধশিল্প খাতের নৈরাজ্য, অর্থাৎ ভেজাল ওষুধ, নিম্নমানের ওষুধ, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীনতা ইত্যাদি বিষয়। এসব ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ যে কত দুর্বল, তার নজির কম নয়। রিড ফার্মার বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ সেবন করে যে শিশুদের কাফফারা দিতে হলো, দীর্ঘ সময়ের টালবাহানার বিচারে সব ধুয়ে-মুছে যাওয়ার দায় বিচার বিভাগের নয়, দায় তাদের, যারা এ বিষয় নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন পেশ করেছে। সংবাদপত্রের ভাষ্যমতে, অভিযোগপত্র ছিল দুর্বল এবং তা যথেষ্ট তথ্যনির্ভর নয়, যা বিচারে যথাযথ শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে। এ বিষয়ে জব্দ করা আলামত তথা ওষুধের নমুনা নিয়েও সংবাদভাষ্যে অভিযোগ রয়েছে।

প্যারাসিটামল ট্র্যাজেডি তো বড়সড় ব্যাপার, যা নিয়ে সংবাদপত্রে ও সাংবাদিক মহলে আলোড়ন দেখা দিয়েছিল। এ বিষয়ে লেখালেখি কম ছিল না। এ ছাড়া দীর্ঘদিন থেকে ভেজাল ও নকল ওষুধ ও নিম্নমানের ওষুধও সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে, সমাজে কিছুটা হলেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া ওষুধের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, তথা মুনাফাবাজি নিয়ে কিছু লেখালেখিও হয়েছে।

এসব বিষয়ে ওষুধ প্রশাসনের তৎপরতা যথাযথ মাত্রায় দেখা যায়নি বলে এবং সেই সঙ্গে সংবাদভাষ্যে সমালোচনার কারণেই বোধ হয় বিষয়টি সংসদীয় কমিটি পর্যন্ত পৌঁছে। তাদের তদন্ত ও সুপারিশ জনস্বাস্থ্যের পক্ষে গেলেও ওষুধ খাতের দুষ্টপ্রবণতা বন্ধ হয়নি। কিছুসংখ্যক কালো তালিকাভুক্ত ওষুধ কম্পানি সংগোপনে তাদের উৎপাদন চালিয়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত সব রোগের পরিত্রাতা উচ্চ আদালতকে এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হয়েছে। জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। তা সত্ত্বেও ভূতের প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এ বিষয়ে বিশদ বিবরণে না গিয়ে ওষুধশিল্পের সঙ্গে যুক্ত দু-একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির উক্তি উদ্ধার করেও অবস্থা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা করা যেতে পারে। যেমন—এ দেশে যুগান্তকারী ওষুধনীতির অন্যতম প্রধান প্রবজ্ঞা ও গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, ‘ওষুধবিষয়ক জনস্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে, সরকার এই আদেশের কতটা কার্যকর করে। সরকারের উচিত হবে অধিক মুনাফালোভী সব ওষুধ কম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। ’

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক আদালতের প্রাসঙ্গিক রায়ের প্রশংসা করে এর বাস্তবায়ন সম্পর্কে একই রকম মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এখনো অনেক ওষুধ কম্পানি রয়েছে যারা নিম্নমানের ওষুধ তৈরি করে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বিধিবিধান মানে না। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি।

এ প্রসঙ্গে তৃতীয় মতামতটি সম্ভবত অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনৈক কর্মকর্তা সঙ্গোপনে বলেন যে নানা মহলের চাপে কোনো কোনো কম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না, কৌশলে তা এড়িয়ে যেতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদক একটি কম্পানির বিরুদ্ধে নিম্নমানের ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ উৎপাদনের জন্য ব্যবস্থা নিতে না পারার কথা উল্লেখ করেন ওই কর্মকর্তা। অর্থাৎ শর্ষের মধ্যে ভূত। দুর্নীতির এ ভূত তো সমাজের সর্বত্র বিরাজমান।

এ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনুরূপ নৈরাজ্যের উল্লেখ করেছে আরেকটি সূত্র। তাই নিয়ে রাঘব বোয়াল আইনজীবীদের সওয়াল-জওয়াবেরও কমতি ছিল না। এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন আমার মনে খচখচ করে, পেতে চাই এর সদুত্তর। তা হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নৈতিকতার শপথ গ্রহণের যে ব্যবস্থা রয়েছে, আইনি পেশায় কি তেমন কিছু আছে, যেখানে ‘এথিকস’ অর্থাৎ নৈতিকতা আইনজীবীদের পেশা নিয়ন্ত্রণ করবে? যা বলবে, তাঁরা জেনেশুনে কোনো অন্যায় বা অবৈধ কার্যক্রমের পক্ষে আইনি লড়াই চালাবেন না! বিশেষ করে জনস্বার্থবিরোধী কোনো মামলা!

তিন.

স্বাস্থ্য রক্ষায় চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। এ বিষয়টি অনুরূপ বিষয়ের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে এর সঙ্গে মানুষের জীবন, অর্থাৎ বাঁচা-মরার নিকট সম্পর্ক রয়েছে। একটি ভেজাল ওষুধের ইনজেকশন একটি মূল্যবান প্রাণ হরণ করতে পারে। এ ধরনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জীবন রক্ষার প্রয়োজনে জীবনদায়ী ওষুধ উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ, যা ওষুধশিল্পে ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল’ তথা মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নামে পরিচিত, কঠিন ও কঠোর নিয়মে বাঁধা থাকা উচিত। তেমনি ভালো উৎপাদনব্যবস্থা বা প্রক্রিয়া সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

বেশ কয়েক দশক আগের কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ওষুধের একটি মাননিয়ন্ত্রক প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছিল বাংলাদেশে প্রস্তুত ওষুধের মান যাচাই-বাছাইয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে। তারা নামকরা বেশ কয়েকটি কম্পানির তৈরি ওষুধের নমুনা বাজার থেকে সংগ্রহ করে কোপেনহেগেনে পাঠিয়েছিল সেগুলোর সার্বিক মান যাচাইয়ের জন্য। মাত্র চারটি কম্পানির ওষুধ এ পরীক্ষায় পাস করতে পেরেছিল। তখন অবশ্য বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদনপ্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে উচ্চমানসম্পন্ন হয়ে ওঠেনি। বিশ্ববাজারে সুনামও তৈরি হয়নি।

কিন্তু এখন এ বিষয়ে সুনামের পাশাপাশি দুর্নাম, খ্যাতির পাশে কুখ্যাতিও কম নয়। ওষুধ ব্যবহারের গুরুত্ব বিবেচনা করেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ওষুধ উৎপাদন, মূল্য নির্ধারণ ও বাজারজাতকরণের উপযোগী বিধিমালা তৈরি করে থাকে। ইউরোপের উন্নত দেশগুলো সে পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালামাফিক স্থানীয় ওষুধ তৈরি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। উদ্দেশ্য জনস্বাস্থ্য রক্ষা। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রে এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অথরিটি)। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশেও ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এটা বিশেষভাবে তাদের স্বদেশের জন্য। বিদেশে ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে এ কঠোরতা কতটা বজায় রাখা হয়, তা নিয়ে কারো কারো মতে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে।

থাক বিদেশের কথা। বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা ও অবস্থা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ যথেষ্ট। বিশেষ করে ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের ওষুধ নিয়ে। তাই সংবাদপত্রে ‘নিম্নমানের ভয়ংকর ওষুধ উৎপাদন!’, ‘ওষুধশিল্পের টিউমার অপারেশন’ বা ‘স্বাস্থ্য খাতে চলছে একচেটিয়া ব্যবসা’ এবং অনুরূপ শিরোনাম দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে।

দুশ্চিন্তার কারণ যেমন ওষুধের উৎপাদন-মান তেমনি ভেজাল ওষুধ ও ওষুধের যুক্তিহীন নিয়মিত মূলবৃদ্ধি, এমনকি দাপুটে ওষুধ কম্পানিগুলোর পরীক্ষা ব্যতিরেকে অবাধ বিপণন। খুশিমতো মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এরা নায়ক, মহানায়ক। ব্র্যান্ড নামের আড়ালে চিকিৎসক ও ভোক্তা সব মহলে এগুলোর অবাধ গতি। এরা তোয়াক্কা করে না ওষুধ নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তরকে। অনায়াসে হাতে রাখে মান যাচাইয়ে সরকারি সংস্থাকে। এখানেও শ্রেণিবিভাজনের ভূত। যত বড় কম্পানি নানা মাত্রায় তত বেশি ছাড়। এরা একসময়কার বিদেশি বহুজাতিক কম্পানিগুলোর চরিত্র অর্জন করে বসে আছে। যে মুনাফাবাজির জন্য বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতাড়ন, সেই অনাকাঙ্ক্ষিত চরিত্র নিয়ে স্বদেশি রাঘব বোয়াল ওষুধ কম্পানিগুলোর সদর্প দাপট।

চার.

ওষুধশিল্প খাতের বিশালায়তন উৎপাদন ও বিপণন খাতে সমস্যাও কম নয়, বরং বহুমাত্রিক। ওষুধ প্রশাসন এদের নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। কারো মতে, রাজনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তৈরি করেছে। কিন্তু যেখানে বিষয়টি মানুষের জীবন-মরণ ও স্বাস্থ্য রক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সে ক্ষেত্রে ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনের নিয়ন্ত্রণ জনস্বাস্থ্যের খাতিরে কঠোর ও নিরপেক্ষ হওয়া দরকার। প্রশাসনের সততা সে ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে বিদেশে প্রচলিত মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এ দেশে বড় একটা লক্ষ করা যায় না। বরং বাংলাদেশের বৃহত্তর জনসমাজ স্বাস্থ্য খাতে, চিকিৎসা খাতে বঞ্চনার শিকার। বিত্তবানদের কথা আলাদা। চিকিৎসাসেবা খাতেও শ্রেণিচেতনা ও শ্রেণিস্বার্থের বিভাজক প্রভাব কম নয়। ব্যবস্থা ও মুনাফাবাজি স্বাস্থ্য খাতেও লক্ষ করার মতো। অধ্যাপক রেহমান সোবহান ঠিকই বলেছেন, ‘দেশে স্বাস্থ্য খাতে চলছে একচেটিয়া ব্যবসা। ওষুধের দামও বেশি। কিন্তু দরকার নিরাপদ, কার্যকর ও কম মূল্যের ওষুধ, যার সরবরাহ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের জন্য জরুরি। ’

কম দামের ওষুধ প্রসঙ্গে দুটি কথা বলা দরকার। প্রথমত, প্রতিযোগিতামূলক স্বল্পমূল্যে ওষুধ সরবরাহের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো জেনেরিক নামে ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন। তা না হলে ব্র্যান্ড নামে জনপ্রিয়তার সুযোগে উচ্চ মূল্য নির্ধারণের প্রবণতা বাড়ে, মুনাফাও বাড়ে। বহুজাতিক কম্পানিগুলো পাকিস্তান আমলে ব্র্যান্ড নামের গুণগান গেয়ে, প্রচার করে যে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে, সেই পথ ধরেছে শীর্ষস্থানীয় দেশি কম্পানিগুলো। তারা হয়ে উঠেছে নব্য বহুজাতিক কম্পানি।

কিন্তু বিদেশি বহুজাতিক কম্পানির মতো নতুন নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণাগার (রিসার্চল্যাব) তৈরি করেনি, মৌলিক গবেষণার কোনো কার্যক্রম হাতে নেয়নি। অথচ ওষুধ গবেষণা ও নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের সুযোগ এ দেশে অনেক রয়েছে। এখানে রয়েছে বহু রকম ঔষুধি, যেগুলো নানা রোগে টোটকা চিকিৎসায় ব্যবহূত হয়ে থাকে। তাতে সুফলও মেলে। শীর্ষস্থানীয় গুটিকয় ওষুধ কম্পানি অনায়াসে ওষুধ গবেষণার প্রকল্প হাতে নিতে পারে, ব্যয় করতে পারে বিপুল মুনাফার সামান্য কয়েক শতাংশ।

তাতে কম্পানির খ্যাতি বাড়ে, অধিকতর মুনাফার সুযোগও তৈরি হয়। অন্যদিকে বিদেশে স্বদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। ওষুধশিল্প খাতে বিদেশি কম্পানির নীতি অনুসরণে দেশি কম্পানি এজাতীয় গবেষণাকর্ম হাতে নিতে পারে। নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করে যেমন রোগীর উপকার করা সম্ভব হতে পারে, তেমনি ওষুধ কম্পানির সুনামও তাতে তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু মুনাফার প্রবল টানে এজাতীয় গবেষণা-সংস্কৃতি বাংলাদেশের ওষুধশিল্প ভুবনে গড়ে ওঠেনি। এটা দুর্ভাগ্যজনক, জাতীয় পর্যায়েও দুঃখজনক ঘটনা। ওষুধশিল্প নিয়ে বারান্তরে আরো কিছু কথা বলার ইচ্ছা রইল।

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

 


মন্তব্য