kalerkantho


বিএনপির রাজনীতি কোন পথে

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিএনপির রাজনীতি কোন পথে

প্রধান নির্বাচন কমিশনার দলীয় লোক, তাঁর অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার, দীর্ঘদিন বাইরে থাকা সংস্কারপন্থীদের দলে টানার উদ্যোগ ও সর্বশেষ জাতীয় ঐক্যের ডাক প্রস্তুতি নিয়ে বর্তমান সময়ে বিএনপির রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। পত্রিকায় এমন সংবাদও রয়েছে সরকারের মেয়াদের ছয় মাস থাকতে আন্দোলনে যাবে দলটি। এখন আন্দোলনে গিয়ে নিজেদের শক্তি নষ্ট করা ও মামলা-হামলার শিকার হতে চায় না তারা। দলটির নিজস্ব ভাবনা প্রকাশ পেলেও ভাবনাকে কাজে লাগাতে কিংবা পরিণত করতে তাদের স্বচ্ছ ও স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা আমাদের চোখে পড়ে না। প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিষ্কার ও সাধারণের কাছে সহজে বোধগম্য কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে দৃশ্যমান নয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্পর্কে তাদের প্রতিক্রিয়া ও মতামত গতানুগতিক। তাদের মেয়াদে তাঁকে ওএসডি করা হয়েছিল, এটাই তাঁর প্রতি আস্থাহীনতার কারণ হতে পারে। কিন্তু তিনি তাদের মেয়াদে কুমিল্লার ডিসির দায়িত্ব পালন করেন। এমন দ্বৈত মনোভাব নিয়ে স্পষ্ট মন্তব্য করা মুশকিল। নির্বাচন কমিশন নিয়ে তাদের মতামত মানসম্মত নয় এই অর্থে তারা এটাও স্পষ্ট করে বলছে না বর্তমান কমিশনের অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে যাবে না। বলছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না।

নিবার্চনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে বেশ কিছু দিন থেকে কথা বললেও এখানেও তাদের বক্তব্য স্পষ্ট নয়। মূলত নিবার্চন কমিশন গঠনের পর থেকে তারা সহায়ক সরকার বিষয়ে নড়েচড়ে বসেছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হিসেবে সহায়ক সরকারের প্রস্তাব করলে তার রূপরেখা জরুরি। কেননা এটি মানা না মানা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর জন্য দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হতে পারে। গত নির্বাচনের আগে নিবার্চনকালীন সরকার বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্কালীন বিরোধী দলের নেত্রীকে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এমন আহ্বানে বিরোধী দলের নেত্রী সাড়া দেননি। বিএনপির জন্য দুর্ভাগ্য, তাদের এখন নিজ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইচ্ছা পোষণ করতে হচ্ছে। সেদিনের আহ্বানে সাড়া দিলে জাতির কাছে তাদের সম্মান অনেক গুণ বেড়ে যেত। কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলেও ভোটার ও জনগণের কাছে বিএনপি সম্পর্কে এক ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হতো।

সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিএনপি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক দেরি করে ফেলছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ অনেক আগেই তাদের সংস্কারপন্থীদের সম্পর্কে ইতিবাচক হয়ে অনেককে মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত দিয়েছে। ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থীদের অবহেলা করার সুযোগ বেশি ছিল, কিন্তু তারা প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দল বিএনপির উচিত ছিল অনেক আগেই তাঁদের দলে ভেড়ানো এবং দায়িত্ব দেওয়া। একটি রাজনৈতিক দল অন্য দলের নেতাকর্মীদের সহজে দলে টেনে নেয় এবং অন্য দলের সঙ্গে জোট বাঁধে। তাহলে নিজ দলের নেতাকর্মীদের আবার দলে আনতে দোষের কী, যদি তাঁরা অন্য দলে যোগ না দেন। বিএনপির এত বেশি সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ তাদের পেছনের দিকে টানছে। জাতীয় ঐক্যের ডাক তাদের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। গত বছর গুলশানের হলি আর্টিজানে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর তারা ঐক্যের ডাক দিয়েছিল। তাদের ডাক হালে পানি পায়নি। তার অন্যতম কারণ তাদের অস্পষ্টতা। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি রাজনৈতিক দল ছোট কিংবা বড় হোক, তার নিজস্ব কিছু বিষয় থাকে। তারা তা বিবেচনায় আনে। আমাদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস থাকায় দলগুলোর সুযোগ-সুবিধার দিকে ঝোঁক থাকার পাশাপাশি আদর্শও কম গুরুত্বের বিষয় নয়। তাদের জাতীয় ঐক্যের ডাক অন্যান্য রাজনৈতিক দল কিভাবে নেবে তা প্রশ্নবিদ্ধ।

গণতন্ত্র, রাজনীতি, নির্বাচন ও উন্নয়নকে কোনো অর্থেই আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সমালোচকরা আওয়ামী লীগ সরকারের যত সমালোচনা করুন না কেন, এ কথা বলতে বাধ্য হবেন যে সরকার দেশকে উন্নয়নের সড়কে উঠাতে সক্ষম হয়েছে। ভারী ভারী তাত্ত্বিক প্রত্যয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য নয়, তারা ভাবতেও চায় না। আর আমরা যারা তথাকথিত শিক্ষিতজন তারা এ প্রত্যয়গুলো নিয়ে নিজেরা দলীয় ও নির্দলীয় বলয়ে দীর্ঘ আলোচনা করি এবং টিভি টক শোতে রীতিমতো ঝড় তুলি। যে যা করি না কেন, উন্নয়ন হচ্ছে এবং হবে, একে থামানোর চেষ্টা করা যেতে পারে, তবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

দেশ উন্নয়নের এমন এক লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটলে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে সম্ভাবনার বাংলাদেশ। ফলে এখনকার রাজনৈতিক দলগুলোকে গত্বাঁধা রাজনৈতিক বুলি আওড়ানোর পরিবর্তে স্পষ্ট ও উন্নয়নের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করতে হবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি বড় তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের বর্তমান অগোছালো অবস্থা তারা কতটুকু সামলাতে পারবে ও সমর্থন ধরে রাখতে পারবে তা বলা মুশকিল। অনুমান করছি তাদের জনসমর্থন রয়েছে; কিন্তু উন্নয়নের বর্তমান সরকারের সমর্থনের মধ্যে যে চিড় ধরছে না তা কি বলা যায়? আবার আমাদের রয়েছে নিরপেক্ষ জনগণ। তারা নিশ্চয়ই উন্নয়নকে বড় অর্থে বিবেচনা করবে। এ কথা সত্য, ক্ষমতায় না থাকলে জনগণের জন্য বেশি কাজ করা যায় না। ফলে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পথ তো তৈরি করতে হবে। কার্যত আপনি জনগণের জন্য কী করবেন তা স্পষ্ট হওয়া চাই। নইলে জনগণ কেন রায় দেবে। সরকার উন্নয়নের যে রোডম্যাপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তা আরো বড় করতে পারলে তা হবে বিএনপির জন্য অশনিসংকেত। নিজেদের ভুলের জন্য হরতাল ও অবরোধের মতো বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ফলে সরকার স্বস্তি পায় তার উন্নয়ন কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে জনগণ উন্নয়নকেই বড় হিসেবে দেখছে, কেন ও কিভাবে হলো সেদিকে তাকাচ্ছে না। চীনের এক অর্থনীতিবিদের এক মন্তব্য দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। বিড়াল সাদা কি কালো, তা বড় বিষয় নয়, আসল কথা হলো, বিড়াল ইঁদুর মারল কি মারল না। আমরা কি তার কথার দিকেই হাঁটছি?

 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com


মন্তব্য