kalerkantho


ভিন্নমত

রোগীরা অভিযোগ করবে কার কাছে?

আবু আহমেদ

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রোগীরা অভিযোগ করবে কার কাছে?

প্রায়ই শুনি, পত্রিকায় রিপোর্ট পড়ি রোগীর স্বজনরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ডাক্তারকে মেরেছে। তারা হাসপাতালও ভাঙচুর করেছে।

কোথাও কোথাও এ নিয়ে মামলাও হয়েছে এবং কেউ কেউ গ্রেপ্তারও হয়েছে। ডাক্তারদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের এই বিরোধ হঠাৎ দেখা দেয়নি। আগে এই বিরোধ অনেক কম ছিল, গেল কয়েক বছরে বিরোধ ভায়োলেন্সের রূপ নিয়েছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, ডাক্তার ভুল চিকিত্সা করেছেন, ফলে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথবা রোগীর স্বজনরা বলছে, ডাক্তারের ভুল চিকিত্সা বা অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এবং এই জন্য তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে মারামারির ঘটনা ঘটিয়েছে। রোগীর ভুল চিকিত্সার শিকার হওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। তবে ইদানীং বিষয়টা সংবাদ মাধ্যমের খবর থেকেই বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। আগে এত হাসপাতাল ছিল না, রোগী ও ডাক্তারের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। তবে সবাই ডাক্তার কি না এ নিয়ে অনেকেই আজ প্রশ্ন তুলছে। যে সংখ্যার ডাক্তার উত্পাদন হচ্ছে বিভিন্ন প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ থেকে, তাতে মনে হয়, অনেকে ডাক্তার না হয়েও ডাক্তার সেজে বসে যাবেন। যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে একজন অনুমোদন পাওয়া চিকিত্সককে যেতে হয় বাংলাদেশের চিকিত্সা শিক্ষার অবস্থা দেখে মনে হয় তাতে ধস নেমেছে। মেডিক্যাল কলেজ থেকে সনদ পাওয়া যেখানে সস্তা হয়ে গেছে, সে ক্ষেত্রে সনদ পেলেই ডাক্তার বা চিকিত্সক হওয়া যাবে না—এমন একটি বিধিনিষেধ থাকা দরকার ছিল। আমরা জানি না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিকিত্সা পেশার মানোন্নয়ন ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ এ পর্যন্ত নিয়েছে। শুধু টাকা ব্যয় করলে জনগণ ভালো চিকিত্সা পাবে—এমন ধারণা ভুল।

আজ স্বাস্থ্য খাতে জনগণের করের টাকা অনেকই ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জনগণ মানসম্পন্ন চিকিত্সা পাচ্ছে কি? হাসপাতালগুলোর তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা শুরু করার কথা। ধরে নিলাম মন্ত্রণালয় লাইসেন্স দিয়েছে এবং লাইসেন্সে অনেক শর্ত বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু তাতে কি হাসপাতালগুলো রোগীর স্বার্থে কাজ করবে? হতেই পারে না। একবার লাইসেন্স দিয়ে চুপ করে বসে থাকলে দেশে শত শত সাইনবোর্ডমার্কা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে, যেগুলো শুধু রোগী নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। রোগীরা অনেক অর্থ ব্যয় করছে, কিন্তু তারা কি অর্থের বিনিময়ে নিশ্চিত সেবা পাচ্ছে? পেলে তো রোগী বা তাদের স্বজনরা অভিযোগ এনে ডাক্তারের ওপর চড়াও হতো না বা হাসপাতালে ভাঙচুর করত না। রোগীরা যেসব কারণে ক্ষুব্ধ তা হলো, ডাক্তার সাহেব অতিরিক্ত ওষুধ প্রেসক্রাইব করছেন, তাঁরা ভুল ওষুধ দিয়ে রোগীর ক্ষতি করছেন। রোগীর সব কথা না শুনে ওষুধের নাম লেখা শুরু করেন, ডাক্তার সাহেব চার ঘণ্টায় রোগী দেখতে পারেন বড়জোর ৮ থেকে ১২ জন, কিন্তু তিনি রোগী দেখছেন ২০ থেকে ৩০ জন। ডাক্তার সাহেব যে ল্যাব টেস্টের প্রয়োজন নেই সেটাও অ্যাডভাইস আকারে রোগীকে করিয়ে আনতে বলছেন। ডাক্তার সাহেব তাঁরই সতীর্থ অন্য ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনকে দুই পয়সার মূল্য দেন না। ডাক্তার সাহেবের কাছে রোগীর মূল্য অপেক্ষা ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধির মূল্য বেশি। ডাক্তার সাহেব অতিরিক্ত পরীক্ষা করিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে মোটা কমিশন পান। এই কমিশনের হার ক্ষেত্র বিশেষে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। আর হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তারা চিকিত্সাসেবা প্রদানের নামে এক নিষ্ঠুর ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে, যেখানে অর্থ আগে চিকিত্সা পরে। হাসপাতালগুলো রোগীকে হাসপাতালের বেডে তুলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী। যে রোগী মরে গেছে বা মরার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে তাকে আইসিইউ, সিসিইউতে রেখে বড় অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের পরিবেশ মোটেই ভালো নয়। নোংরা, মাছি-মশা ভনভন করছে। তা-ও সাইনবোর্ডে লেখা আছে এটা অমুক হাসপাতাল। হাসপাতালের ল্যাব টেস্টের মেশিনের মান সম্পর্কে রোগী বা রোগীর স্বজনরা কিছুই জানে না। তবে যাঁরা জানেন বেশির ভাগ হাসপাতালের যন্ত্রপাতিগুলো অনেক পুরনো। ওরা সংগ্রহ করেছেই পুরনো মেশিন। তার পরের ব্যাপার হলো অনেক হাসপাতালেই ল্যাব টেস্টগুলো করানোর জন্য ওষুধ ও টেকনিশিয়ান নেই। ফলে প্রায় সব রোগীর ক্ষেত্রেই একই ধরনের রিপোর্ট লিখে রোগীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মেশিনগুলো ঠিকমতো চালানোর উপযুক্ত লোক নেই। মেশিনের ইমেজ পড়ার মতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক নেই। ফলে কী এমআরআই রিপোর্ট, কী সিটি স্ক্যান, কী ডিজিটাল এক্সরে—সব রিপোর্টের মধ্যেই একটা ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। রোগী ওসব রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার সাহেব একনজর দেখে বলে দিচ্ছেন ঠিকই তো, নতুবা বলে দিচ্ছে আপনার এই এই ক্ষেত্রে সাংঘাতিক খারাপ অবস্থা। রোগীর হাতে রিপোর্টের কমতি নেই। কিন্তু সত্য হলো, যে ডাক্তার সাহেব টেস্টগুলো করাতে বলেছেন তিনি মনোযোগ দিয়ে সেগুলো দেখার জন্য প্রয়োজনীয় সময়টুকু দিলেন না।   রোগীরা অসহায়। কোথাও অভিযোগ করার তাদের উপায় নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে লাভ নেই। কারণ হলো রোগীর পকেট থেকে বেশি অর্থ বের করার ক্ষেত্রে ডাক্তার ও হাসপাতালের স্বার্থ যেন এক হয়ে গেছে। ডাক্তার ব্যবসায়িক লক্ষ্যে যতই ছুটছেন ততই তিনি রোগীর আস্থা হারাচ্ছেন। অধিকাংশ রোগী রোগ নিয়ে হাসাপাতালে যায়। গিয়ে দেখে সেখানে অমুক অমুক ডাক্তার আছেন। আর যে রোগ সে লাইনে ডাক্তার আছেন মাত্র দুজন। ফলে বাধ্য হয়ে রোগীকে একজনকে সিলেক্ট করতে হয়।

বাংলাদেশে কী পরিমাণ লোক যে রোগী হয়েছে তা হাসপাতালগুলোতে রোগীর স্রোত দেখলেই বোঝা যায়। কোনো হাসপাতালেই রোগীর কমতি নেই। রোগী আর রোগী। এত রোগী এলো কিভাবে! না আমাদের হাসপাতালগুলো, ডাক্তার ও ওষুধ কম্পানিগুলো মিলে রোগী উত্পাদনের বিরাট এক কারখানা খুলে বসেছে। আমার তো মনে হয়, আমাদের চিকিত্সাব্যবস্থাই বেশি বেশি লোককে রোগী বানাচ্ছে। ভুল চিকিত্সা, অপচিকিত্সা, সুস্থ লোককে রোগী বলে ওষুধ দেওয়া—এগুলো হলো অনেক লোককে রোগী বানানোর প্রক্রিয়া। আমরা সবাই আগের তুলনায় অনেক বেশি খাচ্ছি। কিন্তু কী খাচ্ছি, আমাদের খাওয়াই তো আমাদের চিকিত্সার পেছনে ছুটতে বাধ্য করছে। আমরা সবাই আগের তুলনায় অনেক বেশি ওষুধ সেবন করছি। কিন্তু আমরা কি সুস্থ আছি! একটা মিথ্যা ভাবনা আমাদের পেয়ে বসেছে। সেটা হলো বেশি ওষুধ খেয়ে বেশি ভালো থাকা। এর থেকে ভুল জ্ঞান আর হতেই পারে না। বরং অবস্থানটা হওয়া উচিত ছিল এই—কম ওষুধ, কম ডাক্তার, কম হাসপাতাল। তাহলেই শুধু আমরা কিছুটা হলেও সুস্থ থাকতে পারব। হাসপাতাল ও ডাক্তারি সেবাকে রেগুলেট করার জন্য আমাদের দেশে কোনো স্বাধীন কর্তৃপক্ষ নেই, রোগীরা তাদের অভিযোগ কোথাও পেশ করতে পারে না বলেই আইন নিজ হাতে তুলে নিচ্ছে। সরকারের তো উচিত একটা উপযুক্ত অভিযোগ শোনা ও তদন্ত কর্তৃপক্ষ গঠন করা। সেটা করতে হলে আলাদা আইন দ্বারা কমিশন বা অথরিটি (Commission or Authority) গঠন করতে হবে। সে কমিশন বা কর্তৃপক্ষের কাজ হবে হাসপাতাল ব্যবসা ও ডাক্তারি পেশার জন্য লাইসেন্স দেওয়া। নিজ উদ্যোগে তদন্ত ও তদারক করা। রোগীদের অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। প্রস্তাবিত কমিশন বা অথরিটি হবে নিরপেক্ষ ও কোয়াসি জুডিশিয়াল। অন্যান্য দেশ হাসপাতাল ও চিকিত্সকদের পেশাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে সেটাও দেখা যেতে পারে। আমাদের দেশে যেভাবে অবাধে এই ব্যবসা চলছে তাতে শুধু রোগীরাই নির্যাতিত হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সব কিছু মুক্তভাবে চলে না। এটা চলতে দিলে যাঁরা ডাক্তার নন তাঁরাও ডাক্তারি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দোকান খুলে বসে যাবেন। শুধু একজন উপযুক্ত চিকিত্সকই বলতে পারেন কোনটা ভুল চিকিত্সা, কোনটা অপচিকিত্সা। আর এ জন্য প্রস্তাবিত কমিশনে উপযুক্ত ডাক্তারও নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে যাঁদের কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকবে না। রোগী যখন দেখবে তার অভিযোগ শোনার জন্য একটা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ আছে তখন রোগী বিপদগ্রস্ত হলেও মারমুখী হবে না। ডাক্তারের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়া বা হাসপাতালে ভাঙচুর করা সমস্যার কোনো সমাধান নয়। সমাধান হলো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ গঠন করে হাসপাতালগুলোকে তদারকির আওতায় আনা এবং রোগীর অভিযোগ তদন্ত করে আমলে নেওয়া। তাহলে আজ যে বলা হচ্ছে ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে, সেই ঘটনা অনেক কমে যাবে। কারণ হলো অবহেলা প্রমাণ করার জন্য তখন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ থাকবে, যারা ত্বরিতগতিতে অবহেলা হয়েছে কি হয়নি বা ভুল চিকিত্সা হয়েছে কি হয়নি তা দেখবে। ডাক্তারি পেশা মহান একটি পেশা। এই পেশায় অতীতে অনেক বিখ্যাত লোক কাজ করে গেছেন, যাঁরা অর্থের জন্য কোনো দিনই লালায়িত ছিলেন না। এই পেশাকে সম্মানের স্থানে এনে প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই পেশাকে একটা জবাবদিহি ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে।

 

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য